ইকবাল কাগজী
আজ শাহ আবদুল করিমের প্রয়াণদিবস। এই দিন আমাদের জন্য তাঁকে সশ্রদ্ধ তর্পণের দিন।এই মুহূর্তে আমরা তাঁকে স্মরণ করছি, স্মরণ করছি পরম শ্রদ্ধাভরে।
আবদুল করিম যে কোনও মানুষের নাম হতে পারে, এরমধ্যে বিশেষ কোনও বিশেষত্ব আছে বলেও মনে হয় না এবং এমনটাই হওয়া স্বাভাবিক। আবদুল করিম একজন মানুষের নাম। কিন্তু এই আবদুল করিম কোনও এক অখ্যাত পাড়াগাঁর রাখাল বালক থেকে শাহ আবদুল করিম হয়ে গেলে সেটা আর আপতিক কোনও ঘটনা তো থাকেই না এমনকি সাধারণও থাকে না বরং অসাধারণ হয়ে উঠে একটা অনন্যসাধারণ ইতিহাস সৃষ্টি হয়। এবং শেষ পর্যন্ত বলতেই হয়, শাহ আবদুল করিম একজনই। আর কোনও আবদুল করিম পৃথিবীতে জন্মাবে না। যেমন জন্ম হবে না একজন শেক্সপিয়র, রবীন্দ্র, নজরুল কিংবা সুকান্তের। এইসব মানুষেরা পৃথিবীতে অনন্য এই জন্য যে, তাঁরা প্রত্যেকেই তাঁদের স্বস্বক্ষেত্রে এমন বিরল অবদান রেখে গেছেন, যা বিশ্ব ইতিহাসে আর কেউ করে যেতে পারেনি। মানবজাতির কল্যাণ ও প্রগতির যাত্রাপথ, যে পথ অন্ধতমসার প্রতিবন্ধকতায় সমাচ্ছন্ন, সেই দুর্গম পথ অতিক্রম করার সময় এইসব মহামনিষীদের কর্মপ্রয়াস তাঁদের উত্তরসূরিদের চলার পথে চিরদিন আলোকবর্তিকার কাজ করে চলেছে। এইভাবেই মানবজাতির গৌরবের ইতিহাস সৃষ্ট হয়েছে কালে কালে। মানবজাতির যে-সব প্রতিনিধিরা নিজের জীবনযাপনের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করার সময় পৃথিবীতে অনাগত মানুষের সুখ, শান্তি ও প্রগতি তথা সামগ্রিক অর্থে বিশ্বকল্যাণ সাধনে কোনও না কোনও পাথেয় রেখে যান নিজের কাজের মাধ্যমে, ইতিহাসে অমর হয়ে থাকেন তাঁরাই, মানুষের মাঝে বেঁচে থাকেন মৃত্যুর পরও । সেটা হতে পারে রাজনীতি করে, যুদ্ধ করে, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করে, শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীত করে । আবদুল করিম সেটা করেছেন সঙ্গীতের একটা বৃত্তে বিচরণ করতে করতে গান রচনা করে ও গান গেয়ে। সেটা তিনি করেছিলেন, বলতে গেলে, একরকম প্রকৃতিগতভাবে।
বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চল, বিশেষ করে সুনামগঞ্জ প্রকৃতিপ্রদত্তভাবেই এমন একটি অঞ্চল, প্রাজ্ঞজন অনেকেই বলে থাকেন, এখানকার মানুষের জীবন জীবনের স্বাভাবিক গতিতেই চলতে চলতে জীবনেরই গভীর তাগিদ থেকে সঙ্গীতানুরাগিতার অধিকারী হয়ে উঠে। তাঁদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে জারি, সারি, আরি, ভাটিয়ালি, বাউল, ধামাইল ইত্যাদি কতশত রকমের বিচিত্রসব গান আর গান। হাওরাঞ্চলে একদিকে হেমন্তে দিগন্তবিস্তৃত সবুজক্ষেত, জাঙালের বন, নতুন ফসলের স্বপ্ন এবং অন্যদিকে বর্ষায় জলে টইটম্বুর হাওরে হাওরে জলের সমতলে বিক্ষুব্ধ ঢেউয়ের মাতলামি, বন্যার করাল প্রলয়, ফসলহানির দুর্গতি। প্রকৃতির এইসব উদারতা-উন্মত্ততার সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে থাকা হাওর-বাঁওড়-বিলের ফাঁক-ফোঁকরে গ্রাম-লোকালয়ে জলজঙ্গলের যে অনবদ্য শ্যামলিমা তৈরি হয়, তার মাথার উপরে উদার আকাশ। প্রকৃতির এই সমাবেশেই এখানে জন্ম নিয়েছেন রাধারমণ, হাসন, দুর্বিণ শাহর মতো বিরল প্রতিভারা। আমরা জানি, বাঙলা সাহিত্যে তাঁদের অবদান অম্লান হয়ে আছে, থাকবে চিরকাল। করিম তাঁদেরই একজন। বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান অম্লান হয়ে থাকবে তাঁর সৃষ্টির অনন্যসাধারণ বৈশিষ্ট্যের জন্য।
সুনামগঞ্জ প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই জলজঙ্গলের দেশ। বলা বাহুল্য, এখন আর আগেকার জঙ্গলের বিশাল বিস্তৃতি ও গভীর নিবিড়তা নেই। সুনামগঞ্জের উত্তরে খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়। এর অব্যবহিত দক্ষিণ-পাদদেশে টাঙ্গুয়ার হাওর। এই হাওরটিতে এক কোটি বিশ লক্ষ বছরের পুরনো প্রাকৃতিক প্রতিবেশ এখনও বজায় আছে বলে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা মনে করেন। কিংবদন্তি বলে, কালিদহ সাগর ভরাট হয়ে এখানে জলজঙ্গলের ডাঙ্গা জেগে উঠেছে, যে-ডাঙ্গায় গড়ে উঠেছে সুনামগঞ্জের গ্রাম-গঞ্জ-জনবসতি। এখানে জমি এক ফসলা। হেমন্ত শেষে শীত-বসন্তের সময়ে এখানকার জলের তলের জমি ভেসে উঠলে তাতে কৃষকেরা ধান ফলানোর কাজে নামে। এই কয়েক মাস ফসল ফলানো ও সে ফসল ঘরে তোলার কাজের ব্যস্ততার পরে বর্ষার প্রায় ছয়মাসাধিক কাল কর্মহীনতার জীবন কাটাতে অভ্যস্ত সুনামগঞ্জের মানুষ, বলা যায়, প্রাচীন কাল থেকে (তবে অধুনা সে সনাতন অবস্থাটা কীছুটা হলেও পরিবর্তিত হয়েছে, সে প্রসঙ্গ এখানে আলোচ্য নয়)। প্রকৃতিনির্দিষ্ট এই প্রতিবেশে যাপিত জীবনে, অর্থাৎ বৎসরের অর্ধেক কালজুড়ে জলবেষ্টিত উৎপাদনকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন, শ্রমবিমুখ বন্দিত্বের জীবন যাপন করতে গিয়ে এখানকার মানুষ প্রেমচর্চার বাইরে সঙ্গীতনির্ভর হয়ে উঠেছে আপন গতিতেই। এখানকার মানুষের মন হয়ে উঠেছে সমুদ্রের সঙ্গে সমিল বিশাল হাওরের ঢেউয়ের মতো উত্তাল আর মাথার উপরে অসীম নীল আকাশের মতো উদার । কোনও মানুষের কবি হয়ে উঠার জন্যে আর কী চাই। হাওরের যে কোনও জনপদে তসকিরের মতো স্বভাবকবির আবির্ভাব হওয়াই তো একান্ত স্বাভাবিক, সুনামগঞ্জ তো প্রকৃতপ্রস্তাবে এক বাউলের দেশ, কবির দেশ। এখানকার প্রকৃতি আর সে প্রকৃতির পরিসরে গড়ে উঠা আর্থসামাজিক পরিসরে অভাব অনটনের ফেরে সিংহভাগ সাধারণ মানুষের কষ্টের জীবন, শ্রেণিবৈষম্যের যাঁতাকলে মথিত মানুষের দঙ্গল হতে করিমের মতো মহান মানুষের কিংবা কবি বাউলের জন্মই তো প্রকৃতির অবশ্যম্ভাবী অনিবার্যতা। যে বাউল কবির কাব্যনির্মাণের জীবনব্যাপী যজ্ঞ মরমিয়ার ভাববাদী সাঙ্গীতিকতা থেকে ক্রমবিবর্তনের পথ ধরে শ্রেণিসংগ্রামের বস্তুবাদী সাঙ্গীতিকতায় গিয়ে উত্তরিত হয়। করিমের কবিত্বের এই উত্তরণ করিমকে কালোত্তীর্ণ করেছে, বাংলা সাহিত্যের জগতে করেছে অনন্য সাধারণ উচ্চতায় সমাসীন।
অনাদিকালের মানুষ করিমকে বিবেচনা করবে সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলের লোকায়তিক সঙ্গীতগুরু রূপে। তিনি যখন বলেন, ‘বাউল আবদুল করিম বলে/ শোষিতগণ বাঁচতে হলে/ করতে হয় মিলে সকলে/ জীবন বাঁচার লড়াই ॥’ তখন যে-কারও সঙ্গতকারণেই মনে হতে পারে, তিনি স্ব রাজনীতিক চেতনা ও গানকে বিশ্বব্যাপী শ্রমিকশ্রেণির পুঁজির দাসত্ব থেকে মুক্তির ধ্রুপদী আওয়াজের সঙ্গে সমান্তরাল করে তোলেছেন। জানা কথা, পুঁজিবাদী ও সা¤্রাজ্যবাদী শোষণের নিপীড়ন থেকে মুক্তির যে বিশ্বজুড়া সংগ্রাম এখন চলমান এবং বলা বাহুল্য, দিনে দিনে আরও জটিল ও তীব্র হচ্ছে, সে সংগ্রামের রাজনীতি সচেতন শীর্ষবুলি হলো, ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’। এই বিখ্যাত বুলিটি আমরা তিনপতাকার তলে শাসিত এদেশের প্রাচীরপৃষ্ঠা, প্রচারপত্র, পুস্তিকা, পুঁথিতে প্রচুর পড়েছি। করিমের গান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যিনিই পড়বেন, তিনিই বলতে বাধ্য হবেন যে, শুরুর দিকের মরমিয়া ঘরানার ভাববাদী পারলৌকিকতার বিমুগ্ধ ধূসরতা অতিক্রম করে ‘শোষিতগণ বাঁচতে হলে/ করতে হয় সকলে মিলে’-য়ের রাজনীতি সচেতন ইহজাগতিকতার ভাবব্যঞ্জনাকে করিম তাঁর গানে সম্পৃক্ত করেছেন নির্দ্বিধায়, অবলীলাক্রমে, সহজ সাবলীল ভঙ্গিতে। চূড়ান্তে তিনি গানে গানে শ্রেণিসংগ্রামের রাজনীতিকে সঞ্চালন করে দিয়ে ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গীতকে একাত্ম করে দিয়ে নিজেকে বস্তুবাদিতার লাল পতাকার রঙে রাঙিয়ে দিয়েছেন আর সেই সঙ্গে নিজেকে জগতের যত লাঞ্ছিত বঞ্চিত নিপীড়িত মানুষের মানুষের সঙ্গী করে তোলেছেন। এখানেই দেখা যায় কী চমৎকার করিমের বাউলামির বাহার! আহা! দেখ বা হে, কী চমৎকার !


