শহরে মাদকসেবীদের দৌরাত্ম

শহীদনূর আহমেদ
শহরের মাদকসেবীদের দৌরাত্ম বেড়ে গেছে। সন্ধ্যার পর পরই বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার মোড়ে মাদক সেবীদের তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। স্থানীয় লোকজন হামলা-উৎপাত ও লোক লজ্জায় ভয়ে এসব মাদকসেবীদেরকে কিছু বলেন না ও প্রতিবাদ করতে চান না।
মাদক দ্রব্য গ্রহণ ও নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের নানা প্রদক্ষেপ গ্রহণ করলেও থামানো যাচ্ছে না মাদক ব্যবসায়ী ও মাদক সেবীদের। দিন দিন বেপরোয়া হচ্ছে শহরের মাদকসেবীরা।  গোপনে ও প্রকাশে হরদম চলছে মাদক সেবন। যার মধ্যে রয়েছে মদ,গাঁজা,হেরোইন ইয়াবা সহ একাধিক মাদক দ্রব্য। তবে মদ ও  গাঁজা সেবিদের সংখ্যা চোখে পড়ার মত। পিছিয়ে নেই ইয়াবা ও হেরোইন সেবীরাও। শহরের বিভিন্ন পয়েন্ট, বাজার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে মাদক সেবীদের স্থায়ী অস্থায়ী আস্তানা। রাতের বেশি ভাগ সময়ে সেখানে চলে মাদক সেবীদের কার্যক্রম। এলাকার স্কুল-কলেজ পড়–য়া যুবকরা রয়েছে মাদকসেবীদের তালিকায়। মাদকসেবীদের এমন অসামাজিক কার্যকলাপে সাধারণ মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে আতঙ্ক।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য মতে, পৌর শহরের বড়পাড়া, পশ্চিম তেঘরিয়া ময়নার পয়েন্ট,আমপাড়া,আরপিননগর, মুক্তার পাড়া, হাছনগর, ঘোলঘর, ধোপাখালি, কালিপুর, মল্লিকপুরসহ বিভিন্ন এলাকায়    মাদক ব্যবসায়ী ও সেবীদের কার্যক্রম বেশ সক্রিয়। বড় পাড়ার বস্তি, নদীরপাড় ও পশ্চিম তেঘরিয়া ময়নার পয়েন্ট এলাকায় রয়েছে মাদকসেবীদের ৫ থেকে ৬ টি আস্তানা। প্রতি রাতে সেখানে মাদক সেবীদের আড্ডা বসে। গাঁজা-মদ সেবন করে তারা। আড্ডা শেষে চলে মাতলামী। নির্দিষ্ট একাধিক স্থানে পাওয়া যায় মাদক দ্রব্য । তবে দোকানিরা পরিচিত মাদকসেবী ছাড়া অপরিচিত কারো কাছে মাদকদ্রব্য বিক্রি করেন না। দু’একটি আস্তানায় ইয়াবা সেবীদের দেখা যায়।
বড়পড়ার এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মতলিব বলেন,‘দিন দিন বড় পাড়ার অবস্থা শোচনীয়। আমার একটা ছেলে মাদকাসক্ত। প্রতি রাতে পাড়ার বাজে ছেলেদের সাথে মদ গাঁজা খেয়ে আসে। অনেক সময় নিজের ঘরেও আড্ডা দেয়। আমি বৃদ্ধ মানুষ, বাধা দিলে আমাদের মারধর করে। ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র বিক্রি করে মদ-গাঁজা খায়। পাড়ার অনেক জায়গায় এই সব খারাপ জিনিস কিনতে পাওয়া যায়।’
পশ্চিম শহরের আমপাড়া ও আরপিনগর এলাকায় মাদক সেবীদের দৌরাত্ম্য আরো বেশি। মাদক সেবীদের অধিকাংশরাই তরুণ। রাতের প্রায় সময়ই কয়েকটি নির্দিষ্ট দোকান ও মোড়ে দেখা যায় মাদক সেবীদের জটলা। মাদকদ্রব্য গ্রহণের সাথে সাথে চলে হই হুল্লুড় আর অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি ও মাতলামী। পথচারিদের অনেক সময় পড়তে হয় বিব্রতকর অবস্থায়। পথিমধ্যে অনেক সময় তাদের সাথে অশোভন আচরণও করতে দ্বিধা করছে না মাদক সেবীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্চুক পশ্চিম তেঘরিয়ার এক বাসিন্দা বলেন, ‘বাজার থেকে আসার পথে প্রতিদিনই পুকুর পাড়, আম পাড়ার মোড় এলাকায় মাদক সেবীদের দেখা যায়। রাস্তা চলা ফেরা করতে সমস্যা হয়। রাস্তায় মাতলামি করে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে তারা।
এদিকে মধ্য শহরের পশ্চিম বাজার, পৌরমার্কেট, রিভারভিউ, লঞ্চঘাট এলাকায় প্রায় সময়ই দেখা যাচ্ছে মাদক সেবীদের। রাতের আঁধারে রাস্তায় কিংবা নির্জন স্থানে দেখা যায় মাদক সেবীদের মাদক গ্রহণ করতে। শহরের অবস্থিত বিভিন্ন মেসে নিয়মিত বসে মাদক সেবীদের আড্ডা।
শহরের একটি মেসে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্র বলেন, ‘মেসে বড় ভাইয়েরা প্রায় সময়ই বাহিরের লোকদের নিয়ে এসে মদ খায়। বাহিরের লোকেরা নাকি বড় বড় ছাত্র নেতা। তাই প্রতিবাদ করতে সাহস পাই না।’
এদিকে সন্ধ্যার পর পরই সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে মাদক সেবীদের আড্ডা বসে। মাদক সেবীদের অনেকেই শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র নেতা বলে জানিয়েছেন স্থানীয় একাধিক লোকজন। স্থানীয়রা জানান, ধূমপান ও গাঁজা সেবন করতে দেখা যায় তাদের।
অপরদিকে শহরের কালীপুর ও মল্লিকপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মাদক সেবীদের আরো বেপরোয়া আড্ডা চলে বলে জানা গেছে। কালীপুরে স্থানীয় লোকদের দেয়া তথ্য মতে কালীপুরে রয়েছে ৩ থেকে ৪ টি মাদক সেবী আস্তানা। নির্দিষ্ট কিছু স্থানে কিনতে পাওয়া যায় মাদক দ্রব্য। চিহ্নিত কিছু ব্যবসায়ীকে প্রশাসন গ্রেফতার করলেও কিছু দিন কারা ভোগ করার পর তারা আবার ফিরে  এসে শুরু করে একই কর্ম।
কালীপুর এলাকার বাসিন্দা তাজুল ইসলাম বলেন,‘কালিপুরের কয়েকটি স্থানে রাতে মাদক সেবীদের আড্ডা বসে। একেক দিন আড্ডার স্থান পরিবর্তন হয়। এদের প্রভাবে এলাকার যুব সমাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’
জেলা মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ের পরিদর্শক সোয়েব আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা মাদক নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় আছি। পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় মাদক ব্যবসায়ী ও মাদক সেবীদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।’
সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি হারুনুর রশীদ চৌধুরী বলেন,‘মাদক সেবী ও ব্যবসায়ীদের নির্মূল করতে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। আমাদের নিজেস্ব সোর্স ও সাধারণ লোকজনের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনা করছি। মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও হয়েছে। ভবিষ্যতে আরো জোরালো ভূমিকা রাখার জন্যে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।’