শহীদ আবুল হোসেনের স্ত্রীকে গৃহ নির্মাণের আশ্বাস

আকরাম উদ্দিন
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেনের স্ত্রীকে ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে গৃহ নির্মাণ করে দেবার আশ্বাস দিলেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে শনিবার সকাল ৯ টায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেনের স্ত্রী রহিমা খাতুনের পরিবারের খোঁজ-খবর নেয়া এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। পরে উপহার সামগ্রী ও মিষ্টি প্রদান করা হয় রহিমা খাতুনকে। এসময় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ, পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান ও সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইয়াসমিন নাহার রুমা উপস্থিত ছিলেন।
মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আবুল হোসেনের স্ত্রী রহিমা খাতুন জেলা প্রশাসকের কাছে পরিবারের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
জেলা প্রশাসক এসব কথা শুনে সাংবাদিকদের জানান, এই পরিবারের ভরণপোষণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে এক একর জমি দেওয়া হয়েছে।
আবুল হোসেনের স্ত্রী রহিমা খাতুন যুদ্ধদিনের কিছু ঘটনার কথা উল্লেখ করে এই প্রতিবেদককে বলেন,‘আমার বাবা শহরতলীর ইব্রাহীমপুর থেকে গৌরারং ইউনিয়নের অচিন্তপুরে বিয়ে দেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের ৭ বছর আগে আমার বিয়ে হয়। ১ ছেলে ২ মেয়ের মা আমি। আমার স্বামী ছিলেন দেশপ্রেমিক। দেশ স্বাধীনের আগে তিনি ছিলেন আনসারের পিসি কমান্ডার। আবুল হোসেন প্রায়ই রেডিও’র খবর শুনে বলতেন দেশে যেকোনো সময় যুদ্ধ লেগে যাবে। আমি বলতাম যুদ্ধ কী? তিনি বলতেন, পাকিস্তানীদের সাথে যুদ্ধ, দেশ স্বাধীনের যুদ্ধ।
রহিমা খাতুন বলেন, ‘১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ, আবুল হোসেন বাজার করে বাড়ি ফিরবেন বলে বের হন। আমি অপেক্ষা করছি স্বামীর জন্য। নদীরপাড়ে এসে দেখি মানুষ শহর থেকে সুরমা নদী পার হয়ে অচিন্তপুরে আসছে। জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে। সবাই বলেন শহরে যুদ্ধ চলছে পাঞ্জাবীদের সাথে। পরে খবর পেলাম আমার স্বামী আবুল হোসেন সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। পাঞ্জাবীদের বুলেটের আঘাতে মাথার খুলি উড়ে গেছে। খবর শুনে আমার দেহ মন অচেতন হয়ে পড়ে। কথা বলতে পারছি না। আমি প্রায় পাগল হয়ে গেছি। আমার সকল স্বপ্ন যেন নিমিষেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।’
চারিদিকে মানুষ দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যেতে ছুটাছুটি করছে। পাঞ্জাবীর ভয়ে আমি সুনামগঞ্জ ছেড়ে পালিয়ে যেতে চাইনি। আমার অবুঝ ৩ সন্তানকে নিয়ে প্রথমে বিশ্বম্ভরপুরে যাই। পরে আবার ইব্রাহিমপুর গ্রামে বাবার বাড়িতে ফিরে আসি। আমার আত্মীয় স্বজনেরা ভরনপোষণ দেন। এক পর্যায়ে আমি মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের খাগুড়া গ্রামে গিয়ে আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে থাকি। পরে দেশ স্বাধীন হয়।
দেশ স্বাধীনের পরে আমার পরিবারের ভরনপোষণে অনেক সংকটে পড়ি। কিন্তু আমি বিয়ে করতে চাইলেও পারি নি। আমার স্বামী দেশের জন্য ও দেশের মানুষের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য যুদ্ধ করেছেন, প্রাণ হারিয়েছেন। আমার স্বামীর মর্যাদা রক্ষা করতে আমি বিয়ে করতে চাই নি। পরিবারের সংকট মুহূর্তে শহরের দেওয়ান ওবায়দুর রাজা, হোসেন বখত, আলফাত উদ্দিন মুক্তার সাহেবসহ অনেকে আমার সন্তানদের খাবার দিয়েছেন এবং খবর নিয়েছেন। আমার পরিবারের প্রতি লক্ষ্য রেখেছেন তাঁরা। আমি তাঁদের শ্রদ্ধা জানাই।
এক সময় আমার ৩ ছেলে-মেয়েকে নিয়ে শহরের শওকত মিয়ার বাড়িতে এতিম খানায় আসি। দীর্ঘদিন থাকার পর শওকত মিয়ার বাড়ি থেকে এতিমখানা চলে আসে কালীবাড়ি স্কুলে। সেখানে গিয়ে থাকি আরও কিছুদিন। এরপর কালিবাড়ি এতিমখানা থেকে দায়িত্বশীলগণ আমার পরিবারকে নিয়ে যান সিলেটের রায়নগর রাজবাড়ি এতিমখানায়। সেখানে ছেলে মেয়েদের স্কুলে ভর্তি করি আমি। একই স্থানে লেখাপড়া করে আমার দুই মেয়ের সরকারী চাকুরি হয়েছে। বিয়েও হয়েছে ভাল জায়গায়। ১ম মেয়ে রুনি আক্তারের বিয়ে হয়েছে কক্সবাজারে। সেখানে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে চাকুরি হয়েছে তাঁর। ২য় মেয়ে শামীমা আক্তার নোয়াখালির মাইজদী শহরে বিয়ে হয়েছে। সে চাকুরি করে সুনামগঞ্জের ছাতকে হাসপাতালে। ছেলে রেজাউল করীম। বিয়ে করেছিল। বেকার থাকায় স্ত্রী চলে যায়।
রহিমা খাতুন বলেন, গত দেড় বছর আগে আমাকে সরকার থেকে ১ একর খাস জমি দেয়া হয়েছে বসতভিটা করার জন্য। আমার নিজেরও আছে ৭ শতাংশ বসতভিটার জায়গা। ঘর না থাকায় এখন বাবার ভিটে বসবাস করছি। প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাই। রেশনও পাই। তা দিয়ে আমার সংসার চলে আমার।