শাহেদ সাবরিনাদের ধরা পড়াকে অর্থপূর্ণ করুন

স্বাস্থ্যখাতের মাফিয়া ডন শাহেদ সাবরিনাদের গ্রেফতার ও দ্রুত সাজা নিশ্চিত করার সাথে সবচাইতে জরুরি প্রশ্ন হলো এর মধ্য দিয়ে কি স্বাস্থ্য খাতের সমুদ্র চুরি পর্বের ইতি ঘটবে? অতীতে বহু রাঘব বোয়াল ধরার ঘটনা আমরা দেখেছি কিন্তু দেখিনি দুর্নীতির বিন্দুমাত্র হ্রাস ঘটতে। উগ্র বামপন্থায় একসময় গলা কাটা রাজনীতির চল ছিল। নকশাল আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে রীতিমতো চমক সৃষ্টি করেছিলো। দলে দলে যুবক তরুণরা ওই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। নকশাল আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিলো শ্রেণিশত্রু খতম করা। সমাজের জন্য ক্ষতিকর জোতদার, মহাজন, দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে তারা হত্যা করত। তারা মনে করত শ্রেণিশত্রুদের খতম করলেই সমাজে সাম্যাবস্থা ফিরে আসবে। এই আন্দোলন নিয়ে খোদ কমিউনিস্ট শিবিরেই দ্বিমত বহুমত ছিলো। বিরুদ্ধবাদীরা বলতেন, শোষণ বা দুর্নীতি হলো একটি আর্থ রাজনৈতিক ব্যবস্থার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। ওই ব্যবস্থাকে বহাল রেখে শুধু কয়েকজন শ্রেণিশত্রু খতমের মাধ্যমে শোষণমূলক সমাজ ব্যবস্থার উচ্ছেদ সম্ভব নয়। এক শ্রেণিশত্রু খতম হলে আরেকজন এসে ওই জায়গা পূরণ করবে। পাশাপাশি শোষণমূলক ব্যবস্থার রক্ষক রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দমন পীড়নের শিকার হবে এই আন্দোলনে জড়িত মহৎপ্রাণ সর্বস্ব হারানোর পণ করা লড়াকু বিপ্লবীরা। অচিরেই তার প্রমাণ মিলল। কয়েকজন শ্রেণিশত্রু খতম করে পশ্চিমবঙ্গের অসাম্যের দেয়ালে এক চুল চিড় ধরানো যায়নি কিন্তু নকাশালিস্টরা সমূলে ধ্বংস হয়ে গেলো। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত বা যেকোনো খাতের দুর্নীতি রোধে ব্যক্তিবিশেষের ধরা খেয়ে যাওয়াটা ওই নকশাল আন্দোলনের শিক্ষার মতই একই বাস্তবতা আমাদের সামনে হাজির করবে। শাহেদ সাবরিনার পরিবর্তে নতুন কেউ ওই জায়গায় চলে আসবে। ব্যক্তিবিশেষ এই দুর্নীতি ব্যবস্থাপনায় খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়, ব্যক্তি ওই ব্যবস্থাপনার অধীনে এক একজন কুশিলব মাত্র। তাই যতবার যত জায়গায় যত বড় দুর্নীতিবাজ ধরা পড়েছে তার কোথাও সুনীতি প্রতিষ্ঠা পাওয়ার নজির নেই। ব্যক্তি দুর্নীতিবাজকে আটকানোর সাথে যদি দুর্নীতির দুষ্টচক্র গুড়িয়ে দেয়ার রাজনৈতিক ইচ্ছার মিলন ঘটত তাহলে আশান্বিত হওয়ার কারণ থাকে। নতুবা সবই সাময়িক উচ্ছ্বাস মাত্র। গণমানুষের ভাবাবেগ নিয়ে খেলার সুনিপুণ এক প্রয়াস ছাড়া একে আর কোনো ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব নয়।
দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন, দুর্নীতির মাধ্যমে জনগণের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে অর্থ উপার্জন আমাদের আর্থ রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার বৈশিষ্ট্য। এই ব্যবস্থা দুর্নীতিকে পৃষ্ঠপোষকতা করে। কোনো কারণে কেউ আলোচনা সমালোচনার পাদপ্রদীপের সামনে চলে আসলে তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়। সাবরিনা শাহেদ এখন সেরকম ছুঁড়ে ফেলা এক একটি চরিত্র মাত্র। এর মধ্য দিয়ে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি বন্ধ হবে না। দুর্নীতি বা লুণ্ঠনপর্ব দূর করতে পুরো সমাজ ব্যবস্থায় হাত দিতে হবে। প্রয়োজন গণমুখী রাজনৈতিক প্রকল্পের বাস্তবায়ন। এমন এক আর্থ রাজনৈতিক ব্যবস্থা আমাদের কাম্য যেখানে ব্যক্তিবিশেষ ভুলেও দুর্নীতির চিন্তা করবেন না। কারণ ওই ব্যবস্থা কোনো ধরনের দুর্নীতি বা লুণ্ঠনকে সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা করে না। তবেই শাহেদ সাবরিনাদের আটকের ঘটনা অর্থবহ হয়ে উঠবে।
আমরা একাত্তর সনে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম একটি বৈষম্যহীন ন্যায়ানুগ সাম্যের বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্য নিয়ে। কিন্তু সেই লক্ষ্য আজ মহাসাগরের অতলে নিক্ষিপ্ত হয়েছে আর অবৈধ পথ অবলম্বন করে লক্ষ লক্ষ বিলিয়নিয়ার তৈরি করেছে। প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য পানে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। শাহেদ সাবরিনাদের আটকে তারা খুশি হন ওই জন্যই। মানুষের এই উপলব্ধি ও চাহিদাকে ধারণ করে একটি ন্যায়নিষ্ঠ বাংলাদেশ গড়ে তোলা আজকের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালন করাটাই হলো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের আশু কর্তব্য। তবেই বারবার শাহেদ সাবরিনাদের জন্ম হবে না। বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে কোনো অক্সিজেন ছাড়াই এইজন্য লাখ টাকা বিল গুণতে হবে না।