শিক্ষকদের আন্তরিকতা ও ভালবাসাই পারে শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করতে

ইয়াসমিন নাহার রুমা
উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সুনামগঞ্জ সদর
শিশুরাই দেশ, সমাজ, জাতির ভবিষ্যত, ভবিষ্যতের কর্ণধার। আমরা জানি উদ্দীপনার মাঝে শিশু বেড়ে উঠলে সে আত্মবিশ্বাসী হতে শেখে। আর এই আত্মবিশ্বাস তাকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে জীবনের বন্ধুর পথ বেয়ে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। ভাববার সময় এসেছে কীভাবে শিশুদের মাঝে আত্মবিশ্বাস জাগানো যায়। যেহেতু শিশুরা অনুকরণপ্রিয় তাই তার চারপাশের পরিবেশ তার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। পাঁচ বছর বয়স থেকেই শুরু হয় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা। এরপর প্রথম শ্রেণি থেকে প্রাথমিক পর্যায় শুরু হয়। ছয় বছরের মধ্যে তাদের মস্তিস্ক পূর্ণতা পায়। এই বয়সের মধ্যে সে যা কিছু দেখে, শোনে এবং বোঝে, পরবর্তী জীবনে তার প্রতিফলন ঘটে। স্বার্থপরতা অথবা উদারতা, মায়া-মমতা এগুলো শিশুরা আমাদের দেখেই শেখে, অথবা শেখে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকার কাছ থেকে। তাই প্রাথমিক পর্যায় থেকেই তাদের শেখাতে হবে নিয়ম-শৃঙ্খলা, সৌন্দর্যবোধ, গুছিয়ে রাখা, নষ্ট না করা, কোনটা করা উচিত এবং কোনটা উচিত নয় ইত্যাদি। উদ্দীপনা সৃষ্টির কাজটি করতে হবে শিক্ষকদেরকেই। শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষকের প্রাণবন্ত উপস্থাপনা,সপ্রতিভ চিত্তাকর্ষক বাচনভঙ্গি, বিষয়ের গভীরতা ও স্নিগ্ধ হাসিই সকল শিশুকে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। তাদের আন্তরিকতা ও ভালোবাসা ছাড়া শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করা সম্ভব নয়।
শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষক যখন পাঠদান করেন শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি থাকে শিক্ষকের দিকে। শিক্ষকগণ পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে ক্লাসে আসলে, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করলে, শিশুদের আনন্দদানের মাধ্যমে পাঠদান করলে শিশুরা অবশ্যই শ্রেণিকক্ষে মনোযোগী হবে। তাই শিশুদের ভালোবাসার বিকল্প নেই। নিজেদের সন্তানদের জন্য শিক্ষার পরিবেশ যেমন চাই, তেমন শিক্ষার পরিবেশ শ্রেণিকক্ষে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান আনন্দদায়ক করার জন্য নিম্নোক্ত কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে ঃ
* শ্রেণিকক্ষে ঢুকার আগে সকল শিশুকে আনন্দের সাথে স্বাগত জানানো
* খেলার ছলে বর্ণ ও অক্ষর পরিচিতি শেখানো
* শ্রেণি অনুযায়ী বিভিন্ন বর্ণ ও শব্দের খেলা
* নিয়মিত ছড়া, ছড়া গান, আবৃত্তি, ছবি আঁকা, গল্প বলার চর্চা করা
* গল্প শুনিয়ে ইতিহাস সম্পর্কে জানানো
* অন্যের প্রশংসা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা
* প্রতিদিন সকল শিশুকে কিছু জিজ্ঞেস করা ও উত্তর দেয়ার কৌশল শেখানো
* বাধ্যতামূলকভাবে খেলাধুলার জন্য সময় রাখা
* প্রতিদিন নৈতিকতার বিষয়ে প্রচলিত বাণীগুলি বলে বলে চর্চা করানো
* শ্রেণিকক্ষের উচিত ব্যাক্তিগতভাবে প্রতিটি শিশুর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে শিশুদের সুবিধা-অসুবিধাগুলি জানা
* শিশুদের মধ্যে পারস্পরিক সুস্থ প্রতিযোগিতার আবহ তৈরী করা
* শিশুতোষ চলচ্চিত্র দেখানো ( সপ্তাহান্তে)
* শিক্ষা উপকরণ হিসেবে কোন খরচ ছাড়াই বা খুব কম খরচে নিত্যদিনের ব্যবহার্য জিনিস দেখানো
* স্কুল ড্রেস, চুল, নখ, জুতা ও চারপাশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে প্রতিদিন বুঝিয়ে বলা
প্রতিদিন শিশুরা যা দেখে, যা শুনে, যা স্পর্শ করে তাই ধীরে ধীরে তাদের ভিতর গ্রোথিত হয়। তাই শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। পাঠদানের সময় প্রথমে শিক্ষক নিজে বলবেন পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের দ্বারা বলাবেন। একটা বিষয় বারবার শ্রবণ করলে এটা শিশুরা ভুলে যায় না। ছোট ছোট প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে পুরস্কারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিনা খরচে পুরস্কার হতে পারে- ধন্যবাদ, কাগজের ফুল, নৌকা , ব্যাগ, হাতে তৈরী কার্ড, খাতায় আঁকা ফুল, ছবি, কার্টুন ইত্যাদি। সামান্য খরচে পুরস্কার হতে পারে- কলম, পেন্সিল, ইরেজার, সার্পনার, খাতা, গল্পের বই, পেন্সিল বক্স, টিফিন বক্স ইত্যাদি।
শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করার জন্য সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার প্রায় সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষসহ অন্যান্য শ্রেণিকক্ষ সুসজ্জিত করা হয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু কর্ণার ও মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার। দেশপ্রেমের চেতনা জাগ্রত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তাদের জানাতে হবে। বই পড়ায় উৎসাহী করতে হবে। এছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষে স্থান পেয়েছে অনেক বিখ্যাত মনীষী, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিকদের ছবি। তাদের সাথে শিশুদের পরিচয় করাতে হবে, তাদের সম্পর্কে শিশুদের বলতে হবে, তাদের জীবনের গল্প, তাদের সৃষ্টি সম্পর্কে শিশুদের শোনাতে হবে। শিশুদের মাঝে অনুসন্ধিতসু মানসিকতা জাগ্রত করতে হবে। ফুল, পাখি, কবিতা, গান, নদী, ঝর্ণা,পাহাড় ইত্যাদির গল্প তাদের বলতে হবে। আকাশ আর সমুদ্রের বিশালতার সাথে তাদের পরিচয় করাতে হবে। তাহলেই তারা উৎসাহিত হবে, উদ্দীপনা খুঁজে পাবে। শিশুদের স্বপ্ন দেখাতে হবে, কীভাবে স্বপ্ন দেখতে হয় শেখাতে হবে। তাদেরকে প্রাণশক্তিতে ভরপুর ও আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়তে হলে বড় মনের অধিকারী হবার পথ প্রাথমিকেই দেখাতে হবে। সুন্দর ও বড় মনের অধিকারী হলেই কেবল সত্যিকারের বড় মানুষ হওয়া সম্ভব। আর এই বিশাল দায়িত্ব পালন করতে পারেন আমাদের সম্মানিত শিক্ষকগণ। তাদের সদিচ্ছা, আন্তরিকতা ও ভালবাসাই পারে শিশুদের ঝরে পড়া রোধ করে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি শতভাগ নিশ্চিত করতে।