শিক্ষক সংকটসহ নানা প্রতিকূলতা মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান শিক্ষার্থীর হার কমছে

বিশেষ প্রতিনিধি
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে সুনামগঞ্জে বিজ্ঞান শিক্ষার্থীর হার দিন দিন কমছে। গত ৩ বছরে সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকার বেশিরভাগ স্কুলেই বিজ্ঞান শিক্ষার্থী কমেছে। শিক্ষক সংকটসহ নানা সংকটের কারণে সুনামগঞ্জের মাধ্যমিক স্তরে বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষার পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়েছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হাজী লাল মামুদ উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০১৪ সালে ১১০ জন এসসিসি পরীক্ষার্থীর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগের পরীক্ষার্থী ছিল ১২ জন, ২০১৫ সালে ১২৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগে ছিল ১০ জন এবং ২০১৬ সালে ১১০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে বিজ্ঞানের ছিল ৭ জন।
জামালগঞ্জের বেহেলী উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০১৪ সালে ৪৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগের ছিল ১০ জন, ২০১৫ সালে ৪৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগের ছিল ১২ জন এবং ২০১৬ সালে ৪৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগের ছিল ১৬ জন।
কেবল এই দুটি বিদ্যালয় নয়। প্রত্যন্ত এলাকার বেশিরভাগ বিদ্যালয়েই এই অবস্থা। এমনিতেই শিক্ষার্থীর তুলনায় বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পরীক্ষা দেয় কম শিক্ষার্থী। অন্যদিকে প্রতি বছরই কমছে বিজ্ঞান শিক্ষার্থী। অবশ্য. সুনামগঞ্জ শহরের সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ে এই বছর ২৪০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৪০ জন বিজ্ঞান শিক্ষার্থী। এর আগের বছর গুলোতে অনুপাত এই  ভাবেই ছিল। সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে এই বছর ২৪০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষা দেবে ১২০ জন। আগের বছরগুলোতে বিজ্ঞান শিক্ষার্থীর হার এভাবেই ছিল।
শিক্ষকরা বলেছেন,‘অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার পাশাপাশি সামাজিক প্রতিকূলতা, বিজ্ঞানমনস্কতার অভাব, বিজ্ঞান শিক্ষকের অপ্রতুলতা, ত্রুটিযুক্ত অসামঞ্জস্য শিক্ষাদান পদ্ধতি, ভারসাম্যহীন সিলেবাস ইত্যাদি কারণে প্রত্যন্ত এলাকায় বিজ্ঞান শিক্ষার্থী কমছে।
সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শেখ রাফিদ ইসলাম বললেন,‘বিজ্ঞান শিক্ষায় মনোনিবেশ করতে হবে নিজের মধ্যে মুক্তচিন্তার বিকাশ ঘটানোর জন্যই। কিছু ধর্মীয় গোড়ামি থেকেও মুক্ত থাকার জন্য বিজ্ঞান জানতে হবে। যেমন গ্রীকরা এক সময় ধারণা করতো দেবতার ক্রোধের জন্য বজ্রপাত হয়। অন্যরা তাই মেনে চলতো। কিন্তু আসলে এটি সত্য নয়। বিজ্ঞানের কল্যাণে গ্রীকরাই পরে আবিস্কার করলো মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলে বজ্রপাত হয়।’
বেহেলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রতি রঞ্জন পুরকায়স্থ বলেন,‘প্রত্যন্ত এলাকার সকল স্কুলেই বিজ্ঞান শিক্ষকের অভাব। আমার বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন বিজ্ঞান শিক্ষকই ছিলেন না। দেড় বছর আগে ১ জন বিজ্ঞান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি তিনিও অব্যাহতি নিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। এখন বিজ্ঞান শিক্ষকই নেই। যে কয়েকজন শিক্ষার্থী বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষা দিচ্ছে তারা আমাদের চাপাচাপিতে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে। বিজ্ঞান শিক্ষক না থাকায় স্কুলে বিজ্ঞানের ক্লাস নেন অন্য শিক্ষকরা। প্রাইভেট পড়ারও কোন ব্যবস্থা নেই। বিজ্ঞান শিক্ষকতো নেই-ই। অন্য যারা আছেন, তারাও উপজেলা সদর থেকে এসে ক্লাস করেন। এই অবস্থায় বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগ ধরে রাখাই কঠিন হচ্ছে।’
সদর উপজেলার হাজী লাল মামুদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন,‘এলাকায় সচেতন ব্যক্তি কম। অনেকে কঠিন মনে করে পড়ে না।’
সুনামগঞ্জ সরকারী সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুভাষ চন্দ্র দাস বলেন,‘বর্তমান সময় বিজ্ঞানের বিশালতার সময়। এই যুগে মানুষের বুদ্ধিমত্তা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে নৈতিকতার সমন্বয় সাধনের জন্য বিজ্ঞান শিক্ষা জরুরি। যুগের চাহিদা পূরণ, মুক্তচিন্তার পরিপূর্ণতা আনতেও বিজ্ঞান শিক্ষা জরুরি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এগিয়ে যাওয়ার পেছনে বিজ্ঞান শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে’।
সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সিলেট অঞ্চলের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন,‘বিজ্ঞান শিক্ষকের অভাব, অভিভাবকদের অসচেতনতা, সহজেই পাস করে নেওয়ার প্রবণতার কারণেই প্রত্যন্ত এলাকায় বিজ্ঞান শিক্ষার্থী কমছে’।
শিক্ষকরা বললেন,‘ভয় পেয়ে বিজ্ঞান না পড়লেও বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরাই ভাল ফল করে থাকে’।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নিজাম উদ্দিন বলেন,‘‘সারা দেশের তুলনায় সুনামগঞ্জে বিজ্ঞান শিক্ষার্থী কম। প্রত্যন্ত এলাকার একেকটি বিদ্যালয়ে এক’শ থেকে দেড়’শ শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। অথচ বিজ্ঞানে পড়ে ৮ থেকে ১০ জন। এটি ক্রমশ কমছে। মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও মেয়েরা একেবারেই বিজ্ঞানে পড়তে চাচ্ছে না। সুনামগঞ্জ জেলায় এটি আশংকাজনক বিষয়। আমি যে স্কুলেই ভিজিটে যাই ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বলে থাকি ‘তোমরা এসএসসিতে বিজ্ঞানে পড়। না পারলে এইচএসসিতে গিয়ে বাণিজ্য বা মানবিকে পড়তে পার। কিন্তু তাতে লাভ হচ্ছে না। আসলে অভিভাবক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধিসহ সকলে এই বিষয়টি নিয়ে না ভাবলে এক সময় এটি উদ্বেগের কারণ হবে’’।