শুকনা পাতার মতো ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থীরা

পুলক রাজ
বিনামূল্যে পাঠ্যবই, উপবৃত্তিসহ সরকারের নানা উদ্যোগে গত কয়েক দশকে শিশুদের স্কুলমুখী হওয়ায় সাফল্য এলেও করোনাভাইরাস মহামারীর অভিঘাতে সেই অর্জন এখন হারানোর শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এদিকে করোনার সময়ে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা থমকে যাওয়ার জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অর্থনৈতিক দুর্দশার শিকার হয়ে কাউকে কাউকে বই-খাতা ছেড়ে বসতে হয়েছে বিয়ের পিঁড়িতে, কেউ কেউ যাচ্ছে কল-কারখানায়, কেউ গাড়ির হেলপারি করছে। এছাড়া দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধের কারণেও লেখাপড়া ছেড়ে ঘোরাঘুরি-খেলাধুলা ও আড্ডায় মেতেছে অনেক শিশু-কিশোর।
সংক্রমণ বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করা ছাড়া বিকল্পও ছিল না। তাই প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রধানত যে চারটি মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সক্রিয় রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো টেলিভিশন, অনলাইন, বেতার ও মুঠোফোন। অনির্ধারিত বন্ধ আমাদের ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচিত ও অভ্যস্ত হওয়ার সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে, এটা যেমন ঠিক, তেমনি কঠিন বাস্তবতা হলো, এই দুয়ার সবার জন্য খোলা এখনো সম্ভব হয়নি। সেখানেই দুর্ভাবনা, সেখানেই দুর্যোগের ঘনঘটা।
প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার প্রায় ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। নিরবচ্ছিন্নভাবে চললে এই ১৮ শতাংশকে আরও লাগামের মধ্যে নিয়ে আসা সম্ভব হতো, কিন্তু সেটি এখন বিশাল ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। দ্বিতীয়ত, ছেলেমেয়ে সবার ক্ষেত্রে শিশুশ্রম বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আয়-নিরাপত্তা ও খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ার কারণে বিরাট জনগোষ্ঠী বাধ্য হয়ে তাদের সন্তানদের শিক্ষার বদলে শিশুশ্রমে নিযুক্ত করছে। আগের বছরগুলোর চেয়ে এবার ঝরে পড়ার হার নিশ্চিতভাবেই বাড়বে বলছেন পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষকরা। শিক্ষার্থীদের যারা করোনাকালে কাজে যুক্ত হয়েছে তাদের অনেকেই আর স্কুলে ফিরবে না। আবার অনেকে স্কুলে ভর্তি হলেও ক্লাসে অনুপস্থিতির হারও বাড়বে।
সুনামগঞ্জ শহরের শিক্ষার্থী জিতু বর্মন বলেন, গতবছর থেকে করোনা ভাইরাসের দোহাই দিয়ে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। পৌর ডিগ্রী কলেজ থেকে এইচএসসি অটো পাশ করেছি। নামে মাত্র পাশ করা, এরকম পাশ করে আমি খুশি না। গত এক বছর ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলবে খুলছে করে করে এখনও খুলেনি। আমার মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা মহাবিপদে আছি। না পারতে একটা জব নিয়েছি। কবে যে বই হাতে নিয়েছিলাম ভুলে গিয়েছি। পড়াশোনায় মন আর বসে না। এদিকে যে প্রতিষ্ঠানে জব নিয়েছি সে প্রতিষ্ঠান থেকেও বলে দিয়েছে করোনার জন্য ব্যবসা কম হচ্ছে। অন্য একটা জব খোঁজার জন্য।
হাফিজুর রহমান বলেন, সব কিছুই খোলা আছে কিন্তু করোনা ভাইরাসের নাম বলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এ কেমন নিয়ম বুঝতে পাড়ছি না। আমি সরকারি কলেজ ইংরেজি বিভাগে ৩য় বর্ষে পড়াশোনা করছি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে পড়াশোনা এখন আর হচ্ছে না বলেই চলে। পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন মা-বাবা। আমারতো কিছু করা দরকার। এরকম সেশনজট থাকলে কি ভাবে পড়াশোনা করবো। আমার এতদিনে গ্র্যাজুয়েশন শেষ হয়ে যেতো। ভালো জবও নিতে পারতাম। কিন্তু যে অবস্থা শুরু হয়েছে। কি করবো বুুঝতে পারছি না। তারপরও টুকটাক টিউশনি করে চলার চেষ্টা করি। পার্টটাইম কাজ পেলে করি। এরকম আর কতদিন চলবো, আপাতত পড়াশোনা বাদ দিয়ে একটা চাকরী খুঁজছি।
অনিক রজক বলেন, বিগত দেড় বছর যাবত করোনা ভাইরাসের কারণে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে। এইচ.এ.সি অটো পাশ করেছি। এটা নিজের কাছে খারাপ লাগে। অনেক ছাত্র ছাত্রীরা খুশী অটো পাশের জন্য, কিন্তু শিক্ষার হার তো কমে যাবে। এরকম হলে পড়াশোনা আর কেউ করবে না। শিক্ষার্থীদের মনে একটাই কাজ করবে পড়াশোনা করে লাভ কি। অটো পাশ দিয়ে দিবে সরকার। অটোপাশের আশায় আর পড়াশোনা হচ্ছে না। এ কারণে আমাদের মতো শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা থেকে বের হয়ে কর্মসংস্থানের জন্য বিভিন্ন দোকানে ঢুকছে টাকা উর্পাজনের জন্য। মেধাবী শিক্ষার্থীরা এভাবেই ঝড়ে পরছে শুকনা পাতার মতো। কর্মসংস্থানের জন্য পড়াশোনা রেখে ঘুরছে। তাই আমার আবেদন করোনা ভাইরাস এর কারণে ঘরে বসেই শিক্ষা কার্যক্রম যাতে সঠিক ভাবে পালন করা হয়। কোনো শিক্ষার্থীরা যেন ঝড়ে না পড়ে তার দায়িত্ব সরকারের। আমিও চাকুরি করি। যা শুরু হয়েছে, মনে হচ্ছে পড়াশোনা বাদ দিয়েই দিতে হবে।
প্রিয়াঙ্কা কর প্রিয়া বলেন, সরকারি কলেজ দর্শন বিভাগের ২য় বর্ষে পড়াশোনা করছি। করোনা ভাইরাসের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে প্রায় দেড় বছর যাবত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য সব প্রতিষ্ঠান খোলা। লকডাউন দিলেও খোলা থাকে। সব সমস্যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা বাদ দিয়ে নানা ধরনের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেছে। আমি নিজেই পড়াশোনা বন্ধ করে অনলাইনে ব্যবসা করছি। কবে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলবে তার কোন খবর নাই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারনে দেশের বড় ক্ষতি হতে পারে।
জিহান জোবায়ের বলেন, মহামারি করোনা ভাইরাসের জন্য ২০২০ সালের ১৮ মার্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিলো। একন দেশের সব কিছুই চলছে কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আজ অব্দি বন্ধ রয়েছে। মনে হয় যেনো দেশের আর কোন জায়গায় করোনা ভাইরাস নেই, শুধুমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রয়েছে। খবরের কাগজ-সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যায়, দেশের কোন জায়গাতে পুরোপুরি স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছেই না। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি বলতে চাই, শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড কিন্তু সেই মেরুদন্ডে যদি বাঁকা হয়ে যায় এবং তাতে ঝং ধরে যায়, তাহলে সেই মেরুদন্ড পুরোপুরি সোজা করা কঠিন। যারা অনার্স-ডিগ্রি ফাইনাল ইয়ারে আছেন, তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ফাইনাল পরীক্ষা দিতে পারছেন না। দেখা যাচ্ছে যে, তাদের চাকরির বয়স চলে যাচ্ছে। অনেকেই এখন বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, কিন্তু সঠিক সময়ে না হওয়ায় তাদের প্রস্তুতি বিঘœ হচ্ছে। বাংলাদেশে সবসময়ে বেকারত্তের হার বেশি এবং এই অবহেলার জন্য হার বেড়ে গেছে। অনেক শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না খোলায় তারা বিভিন্ন কাজে লেগে গেছে কারণ তাদের পরিবারকে আর্থিক ভাবে ভরসা দিতে হচ্ছে। তাছাড়া স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা একদম পড়াশুনা থেকে ঝড়ে পরছে। কলেজ লেভেল পর্যন্ত একজন শিক্ষার্থী তার শিক্ষাজীবনের বেসিক জ্ঞান অর্জন করে বাকি স্ট্যান্ডার্ড জ্ঞান অর্জিত হয় স্নাতক-উচ্চ শিক্ষার মাধ্যমে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে সেইসব ছাত্র-ছাত্রীরা সম্পূর্ণভাবে বেসিক জ্ঞান থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। একদিকে যেমন বেকারত্তের হার বাড়ছে, তেমনি দেশের দারিদ্রতার হারও বাড়ছে। যদি সবক্ষেত্র স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারে, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা কেনো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারবে না?