শুদ্ধ হবে, সুন্দর হবে, শীঘ্র হবে

আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন
আমাদের সময়ে শিক্ষকরা ছিলেন খাঁটি মানুষ গড়ার কারিগর। তাদের সকলের কাছেই আমি ঋণী। আমি আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি এটা তাদেরই অবদানের ফল। আমার অর্জিত বিদ্যায় তাদের অংশ রয়েছে। আমাদের সময়ে শিক্ষকতা পেশায় যারা নিয়োজিত হতেন তারা সমাজের চোখে ছিলেন উঁচু মর্যাদা সম্পন্ন। ব্যক্তিগতভাবে তারা ছিলেন প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী এবং মহান ব্রত পালনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ একেক জন উদ্যমী মানুষ। তারা শিক্ষকতাকে নেহায়েত মামুলি চাকরি বিবেচনা করতেন না। শিক্ষকতাকে তারা পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন। ফলে তাদের হাতের ছোঁয়ায় কাদা মাটিও সোনা হয়ে যেত।
যেহেতু আমার শিক্ষা জীবনের শুরুটা হয়েছিল পিতামাতার হাতে সে হিসাবে তারা আমার প্রথম শিক্ষক। এরপর স্কুলে যাওয়ার বয়স হওয়ার আগেই অভ্যাস হওয়ার জন্য বাড়ির পাশের স্কুলে  (মক্তব) যাতায়াত শুরু হয়। আমার প্রাথমিক শিক্ষা ঐ স্কুলেই হয়েছিল। এটির নাম কে.বি. মিয়া মক্তব (এখন এটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়)।
১৯৫৭ সালে আমি সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী হাই স্কুলে ৪র্থ শ্রেণীতে ভর্তি হই। ১৯৬৪ সালে এস.এস.সি. পাশ করে বের হই, সে স্কুল থেকে। আমি মনে করি আমার জীবন গঠনের মূল শিক্ষাটা এ স্কুল থেকেই আমি পেয়েছিলাম। যে জন্য আমি গর্বিত। এবং একই কারণে কৃতজ্ঞ আমার শিক্ষক ম-লির কাছে। যারা সে সময় আমার শিশু-কিশোর মানস গঠনে সঠিক পথটি বেছে নিতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমি আমার সময়ে স্কুলে শিক্ষক হিসাবে যাদেরকে পেয়েছিলাম তারা হলেন সর্বজনাব তফাজ্জল হোসেন, আব্দুল গনি, আব্দুল ওয়াহিদ চৌধুরী, মোহাম্মদ আলী, আবুল হোসেন, সমছু মিয়া কাজী, শফিকুল হক চৌধুরী, রেবতি রমন ভট্টাচার্য্য, জৈন উদ্দিন আহমদ, রেজান আলী, ভূবনেশ্বর ভট্টাচার্য্য, ধীরেশ আচার্য্য, আলতাবুর রহমান, কামিনী কুমার সিংহ, হরিচরণ দাশ তালুকদার, চেরাগউদ্দিন চৌধুরী, শামসুদ্দিন আহমদ, মাওলানা নূরুল ইসলাম, মক্রম আলী পীর, মদরিছ খান, আব্দুর রহীম, আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরী, আব্দুল মন্নান, আব্দুল জলিল, কামরুল ইসলাম প্রমুখ। দু:খিত এ মুহূর্তে আর কোন নাম মনে আসছে না। তাদের মধ্যে প্রথম দু’জন ছিলেন প্রধান শিক্ষক। মোহাম্মদ আলী স্যার ছিলেন সহকারী প্রধান শিক্ষক। তিনি ছিলেন বহু গুণে গুণান্বিত একজন মানুষ।
আমাদের সময়ে শিক্ষকরা সমাজের চোখে উঁচু স্তরের মানুষ হিসাবে গণ্য হতেন। এরা রাস্তা দিয়ে হেটে গেলে মানুষ সমীহ করে এদের জন্য পথ ছেড়ে দিত। এদের কথা বেদবাক্য বিবেচনা করা হত। এদের অনেককে নিয়ে অনেক গল্প ছাত্র মহলে প্রচলিত আছে। যা আজো তাদের ছাত্ররা একত্রিত হলে স্মরণ করেন।
আমি যখন স্কুলে ভর্তি হই  তখন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছিলেন আব্দুল ওয়াহিদ চৌধুরী। আমি সরাসরি তার কাছে মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে ভর্তির জন্য বিবেচিত হয়েছিলাম। তিনি আমাকে যতগুলো প্রশ্ন করেছিলেন, আমি নির্ভয়ে সবগুলো প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পেরেছিলাম। নির্ভয়ে উত্তর দেয়ার কারণ হলো আমার আব্বা আমার সাথে ছিলেন। আর আব্দুল ওয়াহিদ চৌধুরীকে আগে থেকেই আমাদের বাড়িতে যেতে দেখতাম। তিনি আমার চাচাতো ভাইদের মামা হতেন সম্পর্কে। তাই তাকে ভয় পাইনি। যদিও তিনি ছিলেন জাঁদরেল শিক্ষক। পরে তিনি সিলেট পাইলট স্কুলে বদলি হয়ে যান। তাকে সরকার সম্মানসূচক তমগায়ে খেদমত পদবীতে ভূষিত করেছিল।
এরপর আমাদের প্রধান শিক্ষক হয়ে আসেন জনাব তফাজ্জল হোসেন সাহেব। তার প্রখর ব্যক্তিত্ব, কৌশল ও দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থার কারণে আমাদের স্কুল শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা অর্থাৎ সকল দিকে উন্নতি প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়। এর রেশ অনেক দিন পর্যন্ত স্কুল ধরে রেখে, সে সুনাম বয়ে বেড়াতে পেরেছিল। এরপর আসেন জনাব আব্দুল গনি সাহেব। তার আমলেই আমি স্কুলকে  বিদায় জানাই ১৯৬৪ সালে। এস.এস.সি. পরীক্ষার মাধ্যমে।
আমাদের সময়ে স্কুলে লেখাপড়ার পাশাপাশি ছাত্রদের যার যার ধর্ম কর্ম পালনে উৎসাহিত করা হত। দুপুরে জোহরের নামাজে মুসলিম ছাত্রদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে মসজিদে রোল কল করা হত। শিক্ষকরা ছাত্রদের নামাজ পড়া লক্ষ্য করতেন। ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিতেন। স্কুলে খেলাধুলার জন্য সকল ছাত্রদের বিভিন্ন দলে বিভক্ত করা হত। যেমন লাল, নীল, সাদা ও সবুজ প্রভৃতি। সকল প্রকার খেলাধুলা হত। স্কুলের সামনের মাঠের এক পাশে ছিল টেনিস খেলার কোর্ট। মাঝখানে ছিল ভলিবল, আরেক পাশে ছিল বাস্কেট বল খেলার কোর্ট। স্কুল ছিল জমজমাট। স্কাউটিং, ফুটবল, এ্যাথলেটিক্স। কী যে দিন ছিল আমাদের ছাত্র কাল তা বলে বুঝানোর মত নয়।
স্কুলে নাটক হত। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত। মিলাদ হত। সরস্বতী পূজাও হত। স্কুলের রেডিওতে টেস্ট খেলার ধারাবর্ণনা শুনতে পাওয়া যেত। প্রতি সপ্তাহে ছাত্রদের স্কুল লাইব্রেরী থেকে বই দেয়া হত। বিকালেও লাইব্রেরী খোলা থাকত। স্কুল থেকে বার্ষিকী প্রকাশিত হত। স্কুল জীবনে আমরা স্কুল ব্যাংকিং শিখেছি। পাবলিক লাইব্রেরীতে ভর্তি হয়েছি। বই পড়তে শিখেছি। এর ফল স্বরূপ আমাদের স্কুলের ছাত্ররা প্রতিবছর বোর্ডে  মেধা তালিকায় স্থান পেত। বিভাগীয়, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে পুরস্কৃত হত। এতে শিক্ষকদের অবদান হাতে নাতে প্রমাণিত হত। আমাদের স্কুলের নাম শুনলে মানুষ ছাত্র হিসাবে আমাদেরকেও সমীহ করতো। সমাজের সর্বস্তরের বহু আলোকিত ও প্রতিষ্ঠিত মানুষ তৈরীতে রয়েছে এ স্কুলের বিরাট অবদান। যার বিবরণ এ ক্ষুদ্র লেখায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
কেউ কাউকে জোর করে শিক্ষা দিতে পারে না। শিক্ষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করাই শিক্ষা প্রদানের মুখ্য উদ্দেশ্য। আমাদের শিক্ষকদের এ প্রচেষ্টাই আমাদেরকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে বলে বিশ্বাস করি। শিক্ষকরা এক ধরনের Mentor । এরা ছাত্রদের মনোভঙ্গি সৃষ্টিতে সাহায্য করেন। তাদের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ছাত্র তার ভবিষ্যৎ কর্ম সম্পর্কে ধারণা করতে শিখে।  আমাদের শিক্ষকরা আমাদের জীবন গঠনে যে অমূল্য অবদান রেখেছেন সে ঋণ শোধ হওয়ার নয়।
আমাদের সকল শিক্ষকই এজন্য শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয়। তবে এদের মাঝে অনেকের অবদান ছাত্রদের অবুঝ মনে যে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে রেখেছে তা এ পরিণত বয়সে এসেও আমাদের তাড়িত করে। আমাদের শিক্ষকদের অন্যতম জনাব আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরী শিক্ষকতার পাশাপাশি সাহিত্য চর্চার জন্য লেখালেখি করতেন। বাংলা বানান সংস্কার সম্পর্কে স্যারের একটি পুস্তিকা ছিল। স্যার ক্লাশে পাঠাপুস্তকের পাশাপাশি নভেল, নাটক পড়াতেন এবং তা পড়তে ছাত্রদের উৎসাহিত করতেন। আমরা স্কুল জীবনেই এজন্য সাহিত্য পাঠে অভ্যস্ত হয়ে উঠি। স্যার শুধু উৎসাহ দিয়েই ক্ষান্ত হতেন না। তিনি নিজের জীবনেও তা করে দেখিয়েছিলেন। তিনি চাকরি ও সংসার জীবনের পাশাপাশি লেখাপড়া চালিয়ে পরিণত বয়সে বি.এ., এম.এ. ইত্যাদি ডিগ্রি অর্জন করে পথ দেখিয়ে গেছেন।
আজ স্যারের কথা দিয়েই শেষ করতে চাই। স্যার ক্লাশে ঢুকেই চক দিয়ে বোর্ডে খাতার মার্জিনের মত রোল টেনে উপরে লিখতেন ‘শুদ্ধ হবে, সুন্দর হবে, শীঘ্র হবে’। ছোট বেলা অতশত বুঝতাম না। মনে করতাম এগুলো স্যারের খেয়ালিপনা। আজ পরিণত বয়সে এসে বুঝি স্যারের এ কথাগুলো নেয়াহেত কথা ছিল না। এগুলো ছিল শ্লোকের মত। একজন লেখা শুরু করার আগে যদি স্যারের ও কথাগুলো মাথায় রাখে তা হলে বুঝতে পারবে স্যার কী বুঝাতে এ কথাগুলো বলেছেন।
লেখক যা লিখছেন তা অবশ্যই শুদ্ধ হতে হবে। অশুদ্ধতা পরিহার করার জন্য এ সাবধান বাণী উদ্দীপনার কাজ করবে। কারণ ভুল লিখা বা ভুল ভাবে লেখার কারোর কোন অধিকার নেই। ফলে আমি যা লিখছি তা শুদ্ধ হচ্ছে তো (?) এ প্রশ্ন চিহ্ন লেখককে অশুদ্ধতা পরিহার করে শুদ্ধ ভাবে লিখতে সাহায্য করবে।
এরপর লেখক যখন যা লিখবেন তা তার সাধ্যমত সুন্দর হাতের লেখা যুক্ত হতে হবে। যাতে অপরজন এ লেখার প্রশংসা করে। ন্যূন পক্ষে তা যেন সে বুঝতে পারে। বুঝাবার জন্য লেখককে নেহায়েত ডেকে আনার প্রয়োজন যেন না হয়।
সারাজীবন বিশেষ করে ছাত্র জীবনে শীঘ্র লেখার কোন বিকল্প নেই। লিখতে বিলম্ব হলে সে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না। ফলে হাতের লেখায় দ্রুত গতি আনা জরুরী। যা পরিচর্যা দ্বারা অর্জন করা সম্ভব। ফলে স্যারের এ বাণী কতই না উদ্দীপক।
অন্যান্য শিক্ষকদের রয়েছে অন্যান্য বিশেষ বিশেষ গুণ। যা আমাদের জীবনে এখনো ক্রিয়াশীল। সময় এবং সুযোগ পেলে তাদের কারো কারো সম্পর্কে বারান্তরে আলোচনা করার ইচ্ছা রইল।  
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী।