রোকেস লেইস
আমার বাসা আর সতীশ চন্দ্র গার্লস হাই স্কুল যেনো একই আঙ্গিনা। আমার বেড়ে উঠা শৈশব কৈশোর দুরন্ত যৌবন আর ষাটে এসেও গার্লস স্কুল, সেই একই শ্রদ্ধাবোধে বেঁধে রেখেছে। এ স্কুলের একজন আপাতঃ রাশভারী প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শিক্ষিকা আমার বড় ফুফু করিমুন্নেছা খাতুন। অতএব, ঐ স্কুলের প্রতি সেই কিশোর বেলাতেই সমীহ সম্মানের এক অনন্য অনুভূতি বেড়ে উঠে মন মননে। বড় ফুফু’র টিফিন পিরিয়ড প্রায়ই আমাদের বাসায় কাটতো। চা নাস্তা, খাওয়া, নামাজ এরপর বাকী সময় যাঁর হাতে দেখতাম বই। উনার বাসাতেও সেই একই চিত্র, যখনই দেখতাম বড় ফুফু একজন মনোযোগী পাঠক। বড় ফুফু’র সূত্র ধরে আরেকজনকে চিনতে শিখি, যিঁনি আমার প্রতিবেশী কিরন বালা দেবী। উঁনি স্কুলের শিক্ষিকা সেজন্য দিদি; আর পাড়ার মাসিমা, তাই উঁনাকে সম্বোধন করতাম ‘কিরন বালা দিদি মাসিমা’। উঁনিও সতীশ চন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা, বড় ফুফু’র মতোই বই নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করতে দেখতাম। দু’জন মাঝেমধ্যে আমদের বাসায় এলে শুনতাম উনাদের আলোচনার বিষয়ও থাকতো বই কেন্দ্রীক, বেশী অংশেই। সেই শ্রদ্ধা ব্যক্তিক, পারিবারিক সীমানা পেরিয়ে প্রতিষ্ঠান/বিদ্যাপীঠ এর প্রতি সৃষ্টি করে সম্মানবোধের। সেই থেকেই নৈতিক সম্মান আর শ্রদ্ধাবোধের আসনে অধিষ্ঠিত সতীশ চন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়। পাশাপাশি পরিবারের চাচাতো ফুফুতো বড় বোনেরা পর্যায়ক্রমিক সতীশ চন্দ্র বিদ্যালয়ের শুভ্রবসনা বালিকাদের ভীরে মিলেমিশে আছে, এই বোধটুকু অন্য এক মাত্রায় দেখতে শিখায় ঐ স্কুলটিকে। সেই দুরন্ত কৈশোর থেকে আজ অবধি শুভ্রবসনা সকলেই ছিলো আছে শ্রদ্ধায় স্নেহে। ছোট ফুফু লুৎফুন্নেছা খাতুন স্কুলের প্রধাণ শিক্ষিকা হয়ে স্কুল কোয়ার্টারে বসবাসের সুবাদে ছুটির দিন কাটতো ঐ আঙ্গিনায়। ষাটের দশকের মাঝামাঝি রাজগোবিন্দ মধ্যবঙ্গ শহর প্রাথমিক বিদ্যালয় পেরিয়ে নিজেও সাদা স্কুল ড্রেসের ঐতিহ্যে জুবিলীয়ান হই। মাঝে মধ্যেই দায়িত্ব পরতো সতীশ চন্দ্রে এসে সহপাঠী’র ক্লাশে বেতন দিয়ে যাওয়ার। এ দায়িত্ব পালনে বোনের প্রতি ভাইয়ের কর্তব্য পালনের পরিতৃপ্তি ছিলো। শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের নির্দেশ পালনে কতোবার স্কুল টাইমে যেতে হয়েছে সতীশ চন্দ্র বিদ্যালয়ে। ঐ সময়েই আপন ছোট বোনও স্কুলে পড়ে অতএব উপলব্ধিতে যোগ হয়েছে অন্যমাত্রা । একে একে আপন চার বোন স্কুলের আঙ্গীনা পেরিয়ে যেতে যেতে আবার শিক্ষয়িত্রী হয়ে এলেন ফুফুতো বোন, অল্পদিন পর মেঝো বোনটাও যোগ দিলো শিক্ষয়িত্রী হয়ে। সতীশ চন্দ্র বিদ্যাপীঠ এর প্রতি দায়িত্ববোধে এলো ভিন্ন অনুসঙ্গ। মেঝো বোন সেজো বোন প্রায় একই সময়ে ছাত্রী। ক্যারম বোর্ড, টেবিল টেনিস খেলা শিখাতে স্কুলে যেতে হয়েছে,ক্রীড়া শিক্ষিকার ডাকে। আর যাদের শিখিয়েছি বার্ষিক প্রতিযোগিতায় ঐ বোনেরাই যখন প্রথম দ্বিতীয় হতো, সে তৃপ্তি যথার্থই ছিলো বিরল। আর, বোনদের পালা শেষ হতে হতে বড় মেয়ে স্কুলে যেতে শুরু করলো। এবার যেতে হয় বাবা হয়ে; গার্জিয়ান হয়ে, ক্লাশের পড়ার পর আলাদা কোচিং হবে কি হবে না, এ নিয়ে স্কুল কমিটির আমন্ত্রণে গার্জিয়ান সমাবেশে। বক্তব্য
দিয়ে বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম, আলাদাভাবে কোচিং না করিয়ে ক্লাশে নজরদারি বাড়ানোর। আর সত্যি পরিতৃপ্ত হয়েছিলাম, যখন শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণ আর্থিক সুবিধা পরিহার করে এবং কিছু কিছু একগুঁয়ে মনোভাবের গার্জিয়ান যুক্তি মেনে, আলাদা কোচিং করানোর দাবি থেকে সরে এসেছিলেন। ঐ বছরে স্কুলের রেজাল্টও যথেষ্টই
ভালো হয়ে ছিলো। বড় মেয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে ছোট মেয়ে ঢুকলো, ছোট বোনের মেয়ে ঢুকলো, আর এ’বছরই ওদেরও স্কুলের শেষবর্ষ, আগামী
ফেব্রুয়ারিতে এস,এস,সি। দিন আপন গতিতে চলে; পিছনে রেখে যায় স্মৃতি, বেদনা-আনন্দ। সতীশ চন্দ্র বালিকা বিদ্যালয় পালন করছে হীরকজয়ন্তী, সর্বাঙ্গ সুন্দর হোক শুভ্রবসনা বালিকাদের স্মৃতি অন্মেষণ আর উপভোগের দু’টি উৎসব দিন।


