পলাশ পি. চিছাম
আজ খ্রিষ্ট বিশ্বাসীদের জন্য এক আনন্দের দিন। আমাদের ত্রাণকর্তা যীশু খ্রিষ্টের জন্ম দিন। শুভ বড়দিন। প্রতি বছর এ দিনকে ঘিরে সারা বিশ্বে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যথাযথ মর্যাদায় গুরুত্বের সাথে খ্রিষ্ট বিশ্বাসীরা এ দিনকে পালন করে থাকেন। খ্রিষ্ট বিশ্বাসীদের ধারণা এ দিনেই যীশু খ্রীষ্ট এই পৃথিবীতে মানুষরূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এক দরিদ্র কুমারীর গর্ভে পবিত্র আত্মার শক্তিতে। পবিত্র বাইবেলে মথি ১:২০ পদে বলা আছে তখন প্রভুর এক দূত স্বপ্নে তাঁকে দেখা দিয়ে বললেন, “যোসেফ, দায়ূদের সন্তান, মরিয়মকে তোমার স্ত্রীরূপে গ্রহন করতে ভয় করো না, কারণ তাঁর গর্ভে যে সন্তান এসেছে, তা পবিত্র আত্মার শক্তিতেই হয়েছে।”
ইংরেজী Christmas এর বাংলা প্রতি শব্দ হিসেবে আমরা বড়দিন নামটি ব্যবহার করে থাকি। কিন্ত ‘বড়দিন’ নামটি আসলে কখন থেকে এবং কিভাবে এসেছে সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোন সঠিক তথ্য জানা যায়নি। তবে জানা যায় যে, পুরাতন ইংরেজী শব্দ Cristes Maesse থেকে Christmas উৎপত্তি। ইংরেজী Dictionary দেখলে আমরা পাবো যে Christ’s Mass. এর বাংলা অর্থ ‘খ্রীষ্টের ভর’। জানা যায় যীশুর নাম বোঝানোর উদ্দেশ্যে এ শব্দটি ব্যবহার করা হত। অনেক সময় এটি একটি উপাধি হিসেবে ব্যবহার করা হতো। Christmas এর সংক্ষিপ্ত রূপ Xmas যা ১৬শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে ব্যবহার শুরু হয়।
প্রকৃতপক্ষে যীশুর জন্মদিন বা তারিখ কখন তা আমরা নির্দিষ্ট করে কখনও বলতে পারবো না। পবিত্র বাইবেলেও যীশুর জন্মের তারিখ সম্পর্কে তেমন কিছু উল্লেখ নেই। তবে খ্রিষ্টমন্ডলী যীশুর জন্মসময়, পবিত্র বাইবেলে যীশুর জন্ম ও জীবনী থেকে অনুমান করেন যে, যীশু প্রচন্ড শীতের মাঝে বেৎলেহেমের এক গোয়ালঘরে দরিদ্রবেসে সাধারণ মানুষ হয়ে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। এসকল বিষয় বিবেচনা করে রোমান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী খিষ্টমন্ডলী যীশুর জন্মদিন বা Christmas নির্ধারণ করেন ২৫ শে ডিসেম্বর। এরই প্রেক্ষিতে আমরা প্রতি বছর যীশুর জন্মদিন এদিনে পালন করে থাকি।
সর্বপ্রথম ৩৩৬ খ্রি: খ্রিষ্টিয়ান রোমান সম্রাট Constantine রোমে প্রথম Christmas বা বড়দিন পালন করেন। কিন্তু সেসময় রোমে এটি কোন জাতীয় অনুষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। পোপ Gregory ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে St. Augustine কে ইংল্যান্ডে প্রেরণ করলে তিনি বড় আকারে ২৫ ডিসেম্বর Christmas বা বড়দিন উদযাপন করেন। তখন থেকেই সারা বিশ্বে খ্রিষ্ট বিশ্বাসীরা প্রতি বছর ২৫ ডিসেম্বর Christmas বা বড়দিন হিসেবে পালন শুরু করেন।
স্বর্গীয় রেভারেন্ড সাইমন এইচ সরকার “বড়দিন” নামকরণের বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন এইভাবে- ‘আমরা তারিখ, সন ইত্যাদি কিছুই বলতে পারবনা, কিন্তু ঘটনার বিবরণ দিতে পারব।’ Christmas কথাটি প্রথম বাংলা করণ করেন ভোলানাথ শর্মা। অনেকটা হিন্দু ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ধাঁচে বললেন, Christmas বাংলা করণ হবে‘ খ্রীষ্টাষ্টমী’। অনেকের কানে ‘খ্রীষ্টাষ্টমী’ কথাটি ভাল লাগলনা। এরপর কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত খ্রীষ্টাষ্টমী পালনে নূতন নামকরণ করলেন “বড় দিন”। গোটা বাংলা ভাষাভাষিদের জন্য Christmas এর এই নতুন নামকরণ গভীর রেখাপাত করল। আর সেই সময় থেকে আমরা “বড়দিন” বলে আসছি।
যীশু সকল মানব জাতির মুক্তির জন্য এই পৃথিবীতে এসেছিলেন। কিন্তু আমরা স্বার্থপর। সর্বদা নিজেদের স্বার্থের কারণে আমরা একে অপরকে প্রতারিত করি, হেয় করি, অপমান করি এবং নিজেকে শক্তিমান হিসেবে, বুদ্ধিমান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যস্ত থাকি। পবিত্র বাইবেলে লেখা আছে ‘For God so loved the world, that he gave his one and only Son, that whoever believes in him should not perish, but have eternal life’ কারণ ঈশ্বর জগতকে এতোই ভালবাসেন যে তিনি তাঁর একমাত্র পুত্রকে দিলেন, যেন সেই পুত্রের উপর যে কেউ বিশ্বাস করে সে বিনষ্ট না হয় বরং অনন্ত জীনব লাভ করে। (যোহন ৩:১৬পদ)
যীশু জন্মের অনেক বছর পূর্বে ইসাইয় গ্রন্থের ৯:৬ পদে যীশু সম্পর্কে বলা হয়েছিল- “একটি বিশেষ শিশু জন্মগ্রহণ করার পরই এটা ঘটবে। ঈশ্বর আমাদের একটি পুত্র দিবেন। লোকদের নেতৃত্ব দেওয়ার ভার তাঁর ওপর থাকবে। তাঁর নাম হবে আশ্চর্য্যয় মন্ত্রী, ক্ষমতাবান ঈশ^র, চিরজীবি পিতা, শান্তির রাজকুমার।” তাইতো পূর্ব দেশ হতে বিখ্যাত তিন পন্ডিত দ্রুবতারার মাধ্যমে খোঁজে পেয়েছিলেন শিশু যীশুকে। কী আশ্চর্য্য ঘটনা। আসলেই তিনি ছিলেন রাজাদের রাজা, শান্তির রাজা। তিনি তার জীবন দিয়ে, আশ্চর্য্য কাজের মধ্যদিয়ে, ভালবাসা দিয়ে, সৎগুণাবলীর মধ্য দিয়ে আমাদের মুক্তির পথ দেখিয়ে গেছেন। দেখিয়ে গেছেন কীভাবে একজন অন্যজনের সেবা করতে হয়। আমরা যদি যীশুর দেখানো পথে শান্তির পথে, ভালবাসার পথে, মুক্তির পথে, একে অপরের সহযোগিতার পথে সাহয্যের হাত প্রসারিত করি তবেই এই শুভ বড়দিন উদযাপন স্বার্থক হবে। ভরে যাবে আমার আপনার মন ও প্রাণ।
Christmas বা শুভ বড়দিন বলতে ভাল ভাল খাবার খাওয়া নয় কিংবা নতুন নতুন জামা-কাপড়, নতুন জুতা পড়া, লোক দেখানো ধর্ম-কর্ম করা নয়। এ দিনে প্রভু যীশুর মহান দয়া ও আমাদের পরিত্রাণের জন্য তিনি এ পৃথিবীতে এসেছিলেন এসমস্ত কিছু ভেবে তাঁকে এবং পিতা ঈশ্বরকে ধন্যবাদ ও প্রশংসা করার দিন। বড়দিন আমাদের আত্মত্যাগ করতে শিখায়। যীশু কিন্তু প্রতিবছর জন্মগ্রহন করবেন না। কিন্তু তিনি জন্ম নিবেন আমার আপনার অন্তরে। তাই আসুন আমরা আমাদের মন সরল করি ও পরিস্কার করি, মনের সব কালিমা দূর করি তবেই আমরা যীশুকে খোঁজে পাবো; তবেই তিনি জন্ম নিবেন আমাদের অন্তররূপ মানব মন্দিরে। তাই আসুন আমরা যীশুর এই মহান জন্মদিনে, এবারের বড়দিনে সকল ভেদাভেদ ভুলে শান্তির অগ্রযাত্রায় শরিক হয় এবং একে অপরের কাছে বাড়িয়ে দেয় দেশ, জাতি ও সমাজ গঠনের সহযোগিতা হাত, তবেই স্বার্থক ও সুন্দর হবে এবারের শুভ বড়দিন।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল, কমিউনিটি প্যারামেডিক কোর্স, স্যানক্রেড হাসপাতাল, সুনামঞ্জ।
উৎস: ১। https://www.whychristmas.com/story/Retrieved
২। বড়দিনের তাৎপর্য, রেভা: প্রদীপ তজু, আ’চিকরাংনি খু’রাং, ২০১৮


