বিশেষ প্রতিনিধি ও আকবর হোসেন
মেয়ে সুমাইয়া (১৪), সুরাইয়া (১২), সুইটি (৩) ও স্ত্রী মজমুন বেগমকে নিয়ে ডুবে যাওয়া ধানের মুঠা উঠাচ্ছিলেন পাগনার হাওর পাড়ের সজলপুরের আলীম উদ্দিন। বললেন,‘নিজের ৬ কেয়ার (২ একর) জমি সহ ২ হাল (১৬ একর) জমি করছি। ইখানো (এখানে) ৪-৫’শ মুঠা ধান আছে, কোন মানুষ পাইরাম না নিবার (নেওয়ার) লাগি (জন্য), ৩ পুরি (মেয়ে) আর হেরার (তারার) মা’রে লইয়া হাওরে আইছি (এসেছি), নাইলে ই-ধানের মুঠাটিনও লইয়া যাইবোগি (নিয়ে যাবে) পাইন্নে (পানিয়ে)।’ সোমবার বিকালে পাগনার হাওর পাড়ের উরারবন্দ বাঁধ ভেঙে হাওরের প্রায় ১০ হাজার হেক্টর ফসল তলিয়ে যাওয়ার কারণে হাওর পাড়ের কয়েক হাজার পরিবার এভাবেই নেমেছেন হাওরে। নিজের কাঁচা-আধা পাকা ধান ঘরে তুলতে কাজের মানুষ না পেয়ে পরিবারের প্রাপ্ত-অপ্রাপ্ত বয়স্ক সকল সদস্যরাই হয়েছেন শ্রমিক।
ভাঙা বাঁধের পাশে দাঁড়ানো দক্ষিণ সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জের আবুল কালাম বললেন,‘আমরা ১০ জন শ্রমিক আজ থেকে এই হাওরে ধান কাটার জন্য এসেছিলাম। সজলপুর গ্রামের রফিক মিয়া আমাদের এনেছিলেন। ধান তলিয়ে যাওয়ায় আমরা সকাল থেকে কেবল দাঁড়িয়ে দেখেছি, এখন (বিকাল ৪ টা) বাড়িতে ফিরে যাচ্ছি।’
প্রায় একমাস পিয়াইন নদীর পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনার হাওরের বাঁধ রক্ষায় সব ধরনের চেষ্টা করছিলেন অর্ধশতাধিক গ্রামের কৃষক। কিন্তু সবচেষ্টা ব্যর্থ করে সোমবার ভোরে হাওরের উরারবন্দ বাঁধ ভেঙ্গে ডুবে গেছে হাওরটি। এটি ছিল জেলার বড় হাওরের তালিকার সর্বশেষ হাওর। পাগনার হাওরে জেলার দিরাই উপজেলার রফিনগর, জামালগঞ্জের ফেনারবাঁক, ভীমখালি, জামালগঞ্জ সদর ও নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুরি উপজেলার চাকুয়া ইউনিয়নের প্রায় ৪০ হাজার কৃষক জমি চাষ করেন।
জামালগঞ্জের ফেনারবাঁক ইউনিয়নের পাগনার হাওরের ১২ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল রক্ষার জন্য গত ২৬ দিন রাত-দিন লড়াই করেছিলেন হাওর পাড়ের হাজার হাজার কৃষক। তবে গত এক মাস ধরে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোন কর্মকর্তা বাঁধে ছিলেন না বলে জানিয়েছেন ফেনারবাঁক ইউপি চেয়ারম্যান করুনা সিন্ধু তালুকদার। 
বাঁধের ভাঙন এলাকায় থাকা ফেনারবাঁক ইউনিয়ন পরিষদের সচিব অজিত কুমার রায় বলেন, ‘শতাধিক শ্রমিক নিয়ে রোববার রাতেও বাঁধে কাজ করেছিলাম। বাঁধ রক্ষায় ৫০ জন পাহাড়াদার নিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু সোমবার ভোরে বৃষ্টির সময় উরারবন্দ বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকতে শুরু করে। দেখতে দেখতে তলিয়ে যাচ্ছে হাওর।’
ফেনারবাঁক ইউপি চেয়ারম্যান করুনা সিন্ধু তালুকদার বলেন,‘হাওরের এত বড় দুর্যোগে পাউবোর কোন অফিসারকে বাঁধে পাওয়া যায় নি। রোববার থেকে বাঁধে কাজ করার জন্য ১৭৪ জন শ্রমিক ও নজরদারী রাখার জন্য ৫০ জন পাহাড়াদার নিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। সোমবার ভোরে বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকা শুরু হয়েছে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. জাহেদুল হক জানিয়েছেন, ‘পাগনার হাওরে বোরো জমির পরিমাণ সাড়ে ৯ হাজার হেক্টর, আশপাশের সব মিলিয়ে মোট জমির পরিমাণ হবে ১২ হাজার হেক্টর। সোমবার ভোরে একটি বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় এই হাওরের সকল বোরো ফসল তলিয়ে যাচ্ছে।’
প্রসঙ্গত, জেলায় এ বছর ২ লাখ ২৩ হাজার ৮৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল। বোরো ধানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৬৩৪ কোটি টাকা। ৪২ টি হাওরের ফসল রক্ষায় ৬৮ কোটি টাকা ৮০ লাখ টাকার বাঁধের কাজ চলছিল। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জের বৃহৎ ৩৭টি হাওরসহ মোট ৪২টি হাওরে ২০ কোটি ৮০ লাখ ব্যয়ে ২৩৮ টি পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) ও ৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭৬ টি প্যাকেজে ঠিকাদার দিয়ে বোরো ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করেছিল। কৃষকদের অভিযোগ পিআইসির কাজ ২৮ ফেব্রুয়ারি ও ঠিকাদারের কাজ ৩১ মার্চের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পিআইসির ও ঠিকাদারের কাজ সময়মত শেষ হয়নি। এ কারণে সব কয়টি হাওরের ফসল ডুবে ৯৫ ভাগেরও বেশি ফসল পানিতে ডুবেছে।


