শোকাবহ আগস্টের শুরু আজ। বাংলাদেশের ইতিহাসকে উল্টোপথে নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টায় আপাত সফলতা প্রাপ্তির লক্ষে ১৫ আগস্ট যে বিয়োগান্তক ঘটনার জন্ম হয়েছিল সেই রক্তরঞ্জিত আগস্টের আজ প্রথম দিন। ১৯৭৫ সনের আগস্টের ঘটনাবলী এই মাসটিকে বাঙালি মানসে কলংকিত করেছে। আজও আগস্ট শুরু হলে বাঙালির হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। আজও আগস্ট আসলে শোকে বেদনায় বাঙালি ¤্রয়িমান হয়। ষড়যন্ত্র আর চক্রান্তের বিস্তীর্ণ জালে আটকে থেকে বাংলাদেশ এই মাসে হারিয়েছিল স্বাধীনতার দিশা। ভূলুণ্ঠিত হয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে রক্ত দ্বারা অর্জন করা সেই সব আদর্শ। আগস্টের ১৫ তারিখ জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা করে ঘাতকরা পৃথিবীর ইতিহাসে রচনা করেছিল নৃশংসতা আর পৈশাচিকতার নতুন অধ্যায়। লড়াকু বাঙালি পিছিয়ে যেতে যেতে একসময় বুক চিতিয়ে সামনে এগোনোর দৃঢ প্রত্যয় নিয়ে রুখে দাঁড়ায় আর পচাত্তরের আগস্টের বর্বরতাকে পিছনে ঠেলে ইতিহাসকে নিজস্ব গতিপথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় ব্রতী হয়। একাত্তরে যে জাতি জিততে শিখেছিলো সেই অদম্য জাতি আবারও পচাত্তরের বিভিষীকাকে দু’ পায়ে মারিয়ে বিজয় পতাকা উড়িয়েছে। পচাত্তরের ঘাতকরা চলে গেছে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে। বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ আর বাংলাদেশ ফিরে পেয়েছে আপন বৈশিষ্ট্য। আমরা আজ আগস্টের শোকগ্রস্ত হৃদয়ে বঙ্গবন্ধুকে অকপটে স্মরণ করতে পারছি। আমরা আজ স্বাধীনতা বিরোধীদের দুর্বিনীত হুংকারের কণ্ঠরুদ্ধ করতে পেরেছি। শোকের মাস শুরুর এই দিনে আজ আমরা স্মরণ করছি হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্ত করে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার স্বাদ পাইয়ে দেওয়ার মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও সেদিন তাঁর সাথে নিহত পরিবারবর্গ, আত্মীয় ও অন্যদের।
প্রশ্ন আসাটা স্বাভাবিক, সদ্য স্বাধীন দেশে মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় কেন স্বাধীনতার মূল রূপকারকে প্রাণ দিতে হলো? ১৫ আগস্টের নৃশংসতার সাথে জড়িত কিছু ঘাতকের বিচারের রায় কার্যকর হয়েছে সত্য কিন্তু এই ঘটনার পিছনের ইন্ধনদাতা কিংবা জাতীয়-আন্ত¥র্জাতিক চক্রান্ত ষড়যন্ত্র বিষয়ে তেমন কোন কাজ হয়নি আমাদের দেশে। কোন জাতীয় পরিস্থিতির কারণে একটি সদ্য স্বাধীন দেশে এরকম চক্রান্ত সফল হয় আবার কেনই বা এতবড় বর্বরতার বিরুদ্ধে ব্যাপকভিত্তিক গণবিদ্রোহ তৎকালে গড়ে উঠেনি , এসব বিষয়ে আওয়ামী লীগ ও গবেষকদের কাজ করা উচিৎ বলে মনে করি। এটি এ কারণে আরও বেশি প্রয়োজন যে, ইদানীং আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল অনেকেই পচাত্তরের মতো ষড়যন্ত্র চলার আভাস ইঙ্গিত দিয়েছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাঙালির ৯৫ শতাংশ সমর্থন স্বাধীনতার পক্ষে থাকলেও সাড়ে তিন বছর পর ঠিক উল্টো চিন্তার লোকেরা দেশের শাসনক্ষমতা কী করে কুক্ষিগত করতে পারলো এরও নির্মোহ বিশ্লেষণ প্রয়োজন। নতুবা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি রোধ করার জায়গাটি দুর্বল হবে।
সংগঠন হিসাবে আওয়ামী লীগ বরাবরই অধিকতর গণসম্পৃক্ত। জনগণের গভীরে এর শেকড় প্রোথিত। কিন্তু দল যখন ক্ষমতায় থাকে তখন কেন জানি জনগণের সাথে দলটির সম্পর্ক আলগা হয়ে যায়। দলের নাম ব্যবহার করে সুবিধাবাদী একটি শ্রেণি গজিয়ে উঠে যারা কস্মিনকালেও আওয়ামী রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করে না। দল ক্ষমতায় থাকলে নিবেদিত কর্মী সমর্থকরা সামনে আসার সুযোগ কম পায়। এই অবস্থা বার বার আওয়ামী লীগের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনলেও দলটি কখনও নিজেদের সংশোধনের প্রবল উদ্যোগ নেয়নি।
শোকাবহ আগস্টের শুরুর দিনে আমরা আওয়ামী লীগকে আরও আত্মানুসন্ধানের আহ্বান জানাই। দেশের স্বাধীনতাকে সংহত রাখতে জনগণের মাঝে দলটির অবস্থান পাকাপোক্ত করা ভিন্ন জাতির আর কোন প্লাটফরম নেই। আগস্টে আমরা তাই ডাক দিয়ে যাই কেবল আত্মসমালোচনা আর পরিশুদ্ধির।

