বিশেষ প্রতিনিধি
শহরের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান সৎকার স্থান ধোপাখালি শ্মশানঘাটের এক পাশের প্রায় ৩ কোটি টাকা মূল্যের ভূমি দখলের জন্য নানাভাবে তৎপরতা চালিয়েছে ভূমি খেকোরা। ভূয়া দলিল ও নামজারী করে একপক্ষ, ভূয়া কাগজপত্র দেখিয়ে আরএস জরিপে নিজের নামে রেকর্ড করে আরেকপক্ষ এই ভূমি আত্মসাৎ করার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। অবশ্য জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলামের নির্দেশে শ্মশানঘাটের পাশের ভূমি এক নম্বর খতিয়ানভুক্ত করে শ্মশানঘাট কমিটিকে বন্দোবস্ত দেবার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
শহরের ধোপাখালী এলাকার নিজগাঁও মৌজায় জেলা প্রশাসকের এক নম্বর খতিয়ানের ৯ নম্বর দাগে ৩৩ শতক জায়গায় বহুকাল আগেই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শ্মশানঘাট করা হয়। এর পাশেই ৫ নম্বর খতিয়ানের ২,৩ ও ৪ নম্বর দাগে শান্তিপদ রায় ও হরিপদ রায়ের ২২২ শতক জায়গা ছিল। ১৯৫৮ ইংরেজিতে সরকার এই জায়গার ৩ ও ৪ নম্বর দাগ থেকে ৭৬ শতক এবং ২ নম্বর দাগ থেকে ৪৫ শতক জায়গা অধিগ্রহণ করে। এই জায়গা পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং হাওর উন্নয়ন বোর্ড ব্যবহার করছে। ১৯৬৮ ও ৬৯ ইংরেজিতে লাশকাটা ঘরের জন্য সরকার হরিপদ রায় ও শান্তি পদ রায়ের আরো ১০ শতক জায়গা অধিগ্রহণ করে। ১৯৭৩ ইংরেজিতে হরিপদ রায় ও শান্তিপদ রায় জনৈক হরমুজ আলীসহ অন্যান্যদের নিকট পাউবো ও শ্মশানঘাটের মাঝখানের ৪৬ শতক জায়গা বিক্রি করেন।
হরমুজ আলী পরে জনৈক নাসির উদ্দিনের কাছে ৮ শতক, সুলতান আহমদসহ অন্যান্যদের কাছে ১৪.২৫ শতক এবং নাসির উদ্দিনের কাছে আরো ৮.৫০ শতক বিক্রি করেন। এই ৩০.৭৫ শতাংশ জায়গা এখনো গ্রহিতার দখলেই আছে। এর বাইরে হরিপদ রায় ও শান্তিপদ রায়ের আরো ৪৫ শতাংশ জায়গা ছিল। এই জায়গা মৌখিকভাবে শ্মশানঘাটের জন্যই রেখেছিলেন হরিপদ রায় ও শান্তিপদ রায়।
নাসির উদ্দিনসহ অন্যরা ভুয়া দলিলের (নম্বর ৫১১৮/৯৪) মাধ্যমে খরিদ দেখিয়ে শ্মশানঘাটের জন্য দানকৃত এই জায়গার নামজারী করে নেন। সম্প্রতি. শ্মশানঘাট পরিচালনা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সেবক কুমার দাস সদরের সহকারী কমিশনারের (ভূমি)’র নিকট এ ব্যাপারে নামজারী রিভিউ মামলা (নম্বর ২২০/২০১৪) দায়ের করেন।
সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মামুন খন্দকার নামজারি রিভিউ আবেদন মঞ্জুর করে যাচাই-বাছাই করে পেয়েছেন ১৯৯৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর এই ভূমির একটি জাল দলিল (যার নম্বর ৫১১৮/৯৪) সৃজন করা হয়। সুনামগঞ্জ রেজিস্ট্রি অফিস থেকে জাবেদা নকল সংগ্রহ করে দেখা গেছে ৫১১৮/৯৪ নম্বরের দলিলের দাতা ডেপুটি কমিশনার সুনামগঞ্জ এবং এর গ্রহিতা মো. শামছুল ইসলাম, পিতা আয়ূব উল্লা, বাড়ী-মুক্তারবন্দ। এটি সদর উপজেলার নৌকাখালী মৌজার ১ নম্বর খতিয়ানের একটি বন্দোবস্ত দলিল। অথচ এই দলিলকেই ভূয়া দলিল দেখিয়ে শ্মশানঘাটের ভূমি নামজারী করার প্রমাণ পাওয়ায় এই নামজারী বাতিল করে সংশ্লিষ্ট ভূমি জেলা প্রশাসকের এক নম্বর খতিয়ানভুক্ত করা হয়। এরপর শ্মশানঘাট কমিটির আবেদনের প্রেক্ষিতে শ্মশানঘাটের সুবিধার্থে এটি শ্মশানঘাটের জন্য বন্দোবস্ত দেবার জন্য গত ২৩ এপ্রিল ভূমি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়।
এদিকে, শ্মশানঘাট কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সেবক কুমার দাস গত সপ্তাহে স্থানীয় সেটেলমেন্ট অফিসে এই ভূমির বর্তমান অবস্থা যাচাই করতে গিয়ে দেখতে পান শ্মশানঘাটের পাশের ৩৯ শতক এবং সিভিল সার্জন অফিসের লাশকাটা ঘরের ১০ শতক ভূমিসহ ৪৯ শতকই বিগত জরিপ (৭ বছর আগে) শেষে আরএস রেকর্ডে সিলেট শহরের মির্জাজাঙাল এলাকার বাসিন্দা মফিজ আলীর ছেলে সিরাজুল ইসলামের নামে রেকর্ড হয়েছে। এই রেকর্ড দেখে হতবাক হয়ে যান শ্মশানঘাট কমিটির সদস্যরা।
শ্মশানঘাট কমিটির সদস্য অ্যাড. রতন কুমার রায় বলেন,‘আরএস রেকর্ডে সিলেট শহরের মির্জাজাঙাল এলাকার সিরাজুল ইসলামের নাম দেখে আমরা অবাক হয়েছি, এটি কী করে সম্ভব ৭ বছর আগে হয়েছে এই এলাকায় জরিপ। ভূমির মালিক এর অনেক আগে দেশ ছেড়েছেন, সিরাজুল ইসলামের নামে কোন বন্দোবস্তও নেই, তাহলে কারা কীভাবে এটি করলো’। তিনি জানান, এই ভূমি বহুদিন ধরে শ্মশানঘাট কমিটি ব্যবহার করছে, শ্মশানঘাটের দখলে থাকা ভূমি নানা ফন্দি করে ভূমি খেকোরা গ্রাস করার চেষ্টা করায়, আমরা বন্দোবস্ত পাওয়ার আবেদন করেছি, জেলা প্রশাসক সাহেব আমাদের আবেদন গ্রহণ করে, বন্দোবস্ত দেবার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। তিনি জানান, আর এস রেকর্ডে সিরাজুল ইসলাম তার ঠিকানায় বাড়ির নম্বর উল্লেখ করেননি, মির্জাজাঙাল সিলেট শহরের বড় একটি আবাসিক এলাকা, তার মুঠোফোন নম্বরও স্যাটেলমেন্ট অফিসের কেউ দিতে পারেননি, না হয় জানার চেষ্টা করা যেত কিভাবে তিনি আরএস রেকর্ডে এই ভূমির মালিক সেজেছেন। তার মতে এমনও হতে পারে মূল্যবান এই ভূমি গ্রাস করার জন্য স্থানীয় কোন ভূমি খেকো অন্তরালে থেকে কাগজপত্রে সিলেটের সিরাজুল ইসলামের নাম ব্যবহার করেছে।
সুনামগঞ্জ স্যাটেলমেন্ট অফিসের পেশকার রতন কুমার বিশ্বাস বলেন,‘আমরা জরিপের অনেক পরে এসেছি, এটি কীভাবে, কোন কাগজের ভিত্তিতে রেকর্ড হলো জানি না, তবে সঠিক কাগজপত্র ছাড়া আরএস রেকর্ডে নাম ওঠলেও আপত্তি শুনানীর সময় এটি টিকবে না’।
সদর তহশিল অফিসের তহশিলদার নিখিল পুরকায়স্থ বলেন,‘আরএস রেকর্ডে সিরাজুল ইসলামের নাম দেখে গত ১৩ জুন স্যাটেলমেন্ট অফিসে আপত্তি পত্র পাঠানো হয়েছে, শুনানীর তারিখে আমরা কাগজপত্র দেখাবো’।
সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মামুন খন্দকার বলেন,‘আরএস রেকর্ডে জনৈক সিরাজুল ইসলামের নাম দেখে আপত্তিপত্র পাঠানো হয়েছে। এই ভূমির মালিক অনেক আগেই দেশ ছেড়েছেন, ৭-৮ বছর আগে সিরাজুল ইসলাম নিশ্চয়ই ভূয়া কাগজপত্র দেখিয়ে ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি উল্লেখ করে শ্মশানের দখলে থাকা ভূমি ও সিভিল সার্জন অফিসের লাশ কাটা ঘর নির্মাণের ১০ শতক ভূমি তার নামে (সিরাজুল ইসলামের নামে) আরএস রেকর্ড করিয়েছেন। আমরা ইতিপূর্বে এই ভূমি এক নম্বর খতিয়ানভুক্ত করে, দীর্ঘদিন ধরে দখলে রেখে ব্যবহারকারী শ্মশানঘাট কমিটিকে বন্দোবস্ত দেবার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি’।


