সংকুচিত সুযোগ মানসিক বিকাশের অন্তরায়

আসাদ মনি
প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পার হয়ে বিশ^বিদ্যালয় শেষ করেও শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান মনস্ক হতে পারছে না। জেলার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে ১০ টি বিষয়ে ¯œাতক ও ৪ টি বিষয়ে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি নেয়ার সুযোগ রয়েছে। বিষয় ভিত্তিক গবেষণামূলক পড়াশুনা থাকলেও ব্যক্তি জীবনে উল্টো চর্চা বাড়ছে। শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগ প্রগতিশীল চিন্তা, বিজ্ঞান মনস্ক ও জাতীয় পর্যায়ে দ্বান্দ্বিক কোনো বিষয় নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। ফলে অবৈজ্ঞানিক চিন্তা, সিদ্ধান্তহীনতা ও গুজব রটানোর ঘটনা বাড়ছে শহরে। আন্তর্জাতিক সমস্যা নিয়ে বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাম্প্রদায়িক চিন্তার প্রতিফলন ঘটছে। এর কারণ সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা বলছেন, স্কুল পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকা, শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানাগারমূখি না করা, বিশ^বিদ্যালয়ে গবেষণা বিমুখ পড়াশুনা, শ্রেণিক্ষক, শিক্ষক সংকট ও দারিদ্রতাই এর অন্যতম প্রধান কারণ।
প্রাথমিক, মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বুনিয়াদি শিক্ষা। প্রাথমিকে শিশুকে বর্ণ ও জীবনের সাধারণ মৌলিক বিষয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। এসময় শিক্ষার্থী পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি অনুকরণ করে শিখতে পছন্দ করে। মাধ্যমিকে পড়ার সময় শিশু চিন্তা করতে শেখে। মানবিক, ব্যবসায় ও বিজ্ঞান তিনটি শাখা দেখানো হয় তখন। ভালো মন্দ বিচার করে পছন্দের শাখাটি নির্বাচন করে শিক্ষার্থী। উচ্চ মাধ্যমিকে শিশুর স্বাধীন চিন্তা করার ক্ষমতা তৈরি হয়। নিজের বুঝাপড়া পাকাপোক্ত হয় এখানে। বিশ^বিদ্যালয় কোনো বিষয়ে দ্বান্দ্বিকতা, গবেষণা, পাশাপাশি অধ্যয়নরত বিষয়ে নতুন নতুন চিন্তা আবিষ্কারও করে শিক্ষার্থীরা।
তবে এসবের মধ্যেও কিছু সীমাবদ্ধতা শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত আচরণে বৈসাদৃশ্য তৈরি করেছে।
জানা যায়, পুরো জেলায় ৫ টি পুরাতন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় রয়েছে। এছাড়াও আরো ৯টি নতুন প্রতিষ্ঠানকে সরকারিকরণ করা হয়েছে। সরকারি এই ১৪ টি উচ্চ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার নামে থাকলেও দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম সেখানে নেই বলে চলে। অনেক বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগারে মান্ধাতা আমলের পুরানো যন্ত্রপাতি রয়েছে। সেগুলো ব্যবহার না হলেও ধূলোর আস্তরণ পড়ে অকেঁজো হয়ে গেছে। ফলে শিক্ষার্থীরা বইয়ের পৃষ্ঠায় বিজ্ঞানের অনেক কলা কৌশল দেখলেও প্রাক্টিক্যালি দেখছেন না। অথচ এসব না করেও প্রাক্টিক্যালের খাতায় নাম্বার উঠছে ঠিকই।
সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সরকারি সতীশ চন্দ্র (এসসি) বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার থাকলেও বিজ্ঞানের শিক্ষক সংকট রয়েছে। পাগলা সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় এবং কলেজে বিজ্ঞানাগারে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। বাদশাগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে আলাদা করে বিজ্ঞানাগার নেই। একটি শ্রেণি কক্ষকে বিজ্ঞানাগার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। দোয়ারাবাজার সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগারের যন্ত্রপাতি পুরানো হওয়ায় ব্যবহারের অনুপযোগি হয়ে আছে। জগন্নাথপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নেই বিজ্ঞানের শিক্ষক। বিজ্ঞানাগার থাকলেও সেটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। গড়ে ৪ টি প্রাক্টিক্যালের ক্লাসের মধ্যে ১ টি হয়। স্বরুপ চন্দ্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়েও বিজ্ঞানাগারে পুরানো যন্ত্রপাতি।
এদিকে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি রয়েছে অবকাঠামোগত সংকট। এসব উভয় সংকটের কারণে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। হচ্ছে না গবেষণা নির্ভর কোনো পড়াশুনা। আর্থিক সংকটের কারণে দিন-রাত টিউশন বা পার্ট টাইম চাকরি করেই যায় শিক্ষার্থীদের।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি নির্ভর। প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনো ভাবে কৃষির সাথে জড়িত। নিজ এলাকায় উচ্চ মাধ্যমিকে পাঠ চুকিয়ে কৃষক পরিবারে সন্তানকে উচ্চ শিক্ষা নিতে শহরে আসতে হয়। নিয়মিত কলেজে যাওয়ার জন্য শহরে থাকতে হয়। সেজন্য টিউশন বা চাকরী করতে হয়। এদিকে সরকারি কলেজের ছাত্রদের থাকার কোনো নিজস্ব হোস্টেল নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের বিজ্ঞান ল্যাব রয়েছে। কিন্তু সেটা ব্যবহার করা হয় না। শিক্ষকরা ক্লাসেও ভালো পড়ান না। সবাইকে প্রাইভেট পড়তে উৎসাহিত করেন।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থী সাকিব বলেন, বিশ^বিদ্যালয় শুধু একাডেমিক পড়াশুনা করার জন্য নয়। বরং বইয়ের বাইরে গিয়ে অনেক কিছু করার জায়গা হলো বিশ^বিদ্যালয়। ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের প্রতিভা বিকশিত হওয়ার একটা উর্বর ভূমি। কিন্তু আমরা করছি তার উল্টো। এর প্রধান কারণ আমার কাছে মনে হয় কেরানিমুখী পড়াশুনা। এজন্য দায়ী আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা।
সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ফয়েজুর রহমান বলেন, আমাদের শিক্ষক সংকট রয়েছে। যেখানে শিক্ষকের পদ বাড়ানো প্রয়োজন সেখানে ৫২ পদের বিপরীতে ৩৫ জন শিক্ষক রয়েছে। ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংকটও রয়েছে। আমাদের পাশেই ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সরকারি এসসি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫২ জন শিক্ষকের পদ রযেছে। অথচ আমাদের তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণির বিদ্যালয়ে ৫২ জন শিক্ষকের পদ রয়েছে। এর ফলে স্বাভাবিক পাঠ্যদান করাতে কিছুটা হিমসিম খেতে হয়।
জেলা শিক্ষা অফিসার মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে। তবে সেগুলো সমাধান করার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। বিজ্ঞানাগারের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হচ্ছে। বিজ্ঞানাগার যাতে ব্যবহার করা হয় সে বিষয়েও আমরা খোঁজ রাখছি।