সবার আগে হাওর রক্ষা করতে হবে

টাঙুয়ার হাওরের নজরখালী বাঁধ ভেঙে যাওয়া এবং আরও বহু বাঁধ হুমকির মধ্যে থাকার মাধ্যমে চলমান বাঁধ নির্মাণ প্রক্রিয়ার দুর্বলতা প্রমাণিত হয়। বলাবাহুল্য বাঁধের কাজে দুর্নীতি, প্রভাবদুষ্টতা ও স্বজনপ্রীতিসহ অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ, অপরিহার্য স্থানে প্রকল্প গ্রহণ না করা, ক্ষেত্রবিশেষে প্রয়োজনীয়তারিক্ত বরাদ্দ দানের অভিযোগ গত কয়েক বছর ধরে নিয়মিতই উত্থাপিত হচ্ছে। কিন্তু বাঁধ নির্মাণকারী কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কানে তুলা গোঁজা নীতি অবলম্বন করে চলেছেন। আমরা বারবার বলে আসছিলাম, প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়নি বলে কাজের এসব অনিয়ম নিয়ে তেমন কথা উঠেনি কিন্তু যখন এসব দুর্বল বাঁধ ন্যূনতম পানির তোড় সামাল দিতে ব্যর্থ হবে তখন এই নিরবতা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। এখন সেই বাস্তবতার দেখা পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু হনুমানের লেজের আগুনে লঙ্কা পুড়ানোর পর এ নিয়ে হৈচৈ করে লাভ কী? আমরা স্পষ্টতই ২০১৭ সনের অকাল ও আকষ্মিক বন্যার সংকেত দেখতে পাচ্ছি। কৃষকরা এক বুক হতাশা বুকে চেপে ধরে অসহায় ক্রন্দন কাতরতা নিয়ে হাওর ও আকাশের দিকে চেয়ে থাকছেন। অথচ সময়মত একটুখানি সতর্ক হলে এবং দুর্নীতির লাগাম ধরতে পারলে আজ এ দিন দেখতে হত না।
ঠিক এই মুহূর্তে বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপনের চাইতেও বড় হলÑ হাওরকে রক্ষা করা। এসব নিয়ে কিছু পরেও কথা বলা যাবে। আগে যে যেভাবে পারেন হাওর রক্ষা করতে হবে। সরকারের মুখ চেয়ে বসে থাকলে চলবে না। কৃষকদের এগিয়ে আসতে হবে। বিভিন্ন জায়গায় কৃষকদের স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ রক্ষার কাজে নেমে পড়ার খবর আমরা পাচ্ছি। এই স্বতস্ফূর্ত জাগরণকে উৎসাহিত করতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের জনপ্রতিনিধিদের আর সব কাজ ফেলে রেখে হাওর রক্ষায় মনোনিবেশ করতে হবে। প্রতিদিন বৃষ্টি হচ্ছে। পানি বাড়ছে নদীর। নদীর পানি যাতে হাওরে ঢুকতে না পারে সেজন্য রাত জেগে হাওর পাহারা দিতে হবে। পানি ঢুকার স্থানগুলো চব্বিশ ঘণ্টা সতর্ক পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। বাঁশ, চাটাই, দড়ি, পলিথিন, কোদাল যথেষ্ট পরিমাণে মজুদ রাখতে হবে। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার দায়িত্ব নিতে হবে জনপ্রতিনিধিদের। অবশ্য জনপ্রতিনিধিদের প্রতি মানুষের আস্থা এখন একেবারে শূন্যের কোঠায়। জনপ্রতিনিধিরা সাধারণ ভোটারদের আস্থা অর্জনে ভীষণভাবে ব্যর্থ, এটা গণতান্ত্রিক পদ্ধতির সবচাইতে বড় উপহাস। তবু যাবতীয় পিছুটান ও আস্থা—অনাস্থা দূরে ঠেলে সকলে মিলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাওর রক্ষার জন্য প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
প্রশাসনকে তাদের সর্বশক্তি দিয়ে হাওর রক্ষায় নিয়োজিত হতে হবে। যখন যা দরকার যাতে সরবরাহ করা যায় সেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। নদীর পানির স্তর ও বৃষ্টিপাত (সমতলে ও পাহাড়ে) সম্পর্কিত হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করে এর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণভিত্তিক পূর্বাভাসের আলোকে করণীয় বিষয়ে কৃষকদের তথ্য সরবরাহ করতে হবে। এজন্য ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং ব্যবস্থা একেবারে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত চালু করে দিতে হবে। সকলে মিলে এক জোট হয়ে কাজ করলে বিরূপ প্রকৃতির ধ্বংসলীলা কমিয়ে আনা সম্ভব। হাওরের বোরো ধান এই অঞ্চলের প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, একইসাথে এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জোগানদার। হাওর ডুবলে কৃষকের সর্বনাশের সাথে দেশেরও সর্বনাশ ঘটে যাবে। বাঁধ নির্মাণের সাথে জড়িত সকল স্তরের কর্তৃপক্ষ ও জনপ্রতিনিধিরা সময় থাকতে বিষয়টির প্রতি অবজ্ঞা করলেও এখন সকলকে এর গুরুত্ব বুঝতে হবে।
বাঁধ নির্মাণে যত পরিকল্পনাহীনতা, দুর্নীতি—অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে সেগুলো নিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা—পর্যালোচনা হোক এবং পিছনে যত অনিয়ম হয়েছে তার সুষ্ঠু তদন্ত হোক, বিচার হোক যাবতীয় অপকর্মের, সামনের দিনে হাওর রক্ষার স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত বৈজ্ঞানিক পথ ও পদ্ধতির উদ্ভাবন ঘটুক এই আমাদের কামনা।