এনামুল হক এনি, ধর্মপাশা
ধর্মপাশা উপজেলা বিএনপিতে এক প্রকার সার্কাস চলছে। কে যে কখন কার পেছনে, কোন নেতাকর্মী কার সাথে তা সহজে বুঝা মুশকিল! আজ ওর সাথে, তো কাল তার সাথে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর উপজেলা বিএনপির কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দলে দ্বিধাবিভক্তি শুরু হয়ে চলছে এখন পর্যন্ত। নিজেদের মধ্যে দলাদলি, হামলা, মামলাসহ একে অপরকে হয়রানির অশুভ প্রতিযোগিতা চলছে প্রতিনিয়ত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ন্যক্কারজনক মন্তব্য করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টায় লিপ্ত কোনো নেতাকর্মী। বিষয়টিকে কেউ কেউ এক প্রকার বিনোদন বা সার্কাস বলেও আখ্যায়িত করেছেন।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য ডা. রফিক চৌধুরী নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-১ আসনে পরাজিত হওয়ার পর তাঁর ঘনিষ্ট নেতাকর্মীদের অগ্রাধিকার দিয়ে উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটি গঠন করেন। পরবর্তীতে এটি পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে রূপ নেয়। আর এ কমিটি থেকে বাদ পড়ে যান উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবদুল মোতালেব খানসহ অনেক নেতাকর্মী। ফলে বঞ্চিত নেতাকর্মীরা আবদুল মোতালেব খানের নেতৃত্বে গঠন করেন উপজেলা বিএনপির নতুন কমিটি। ফলে সুসংগঠিত বিএনপি দু’ধারায় বিভক্ত হয়ে যায়। তখন থেকেই ডা. রফিক চৌধুরী ও আবদুল মোতালেব খান সমর্থিত নেতাকর্মীরা জাতীয় দিবস উদযাপনসহ দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচী পৃথক পৃথকভাবে চালিয়ে আসছিল। দলীয় কার্যক্রম চালাতে গিয়ে উভয় গ্রুপের মধ্যে বিভিন্ন সময় হয়েছে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, ঘটেছে হতাহতের ঘটনা।
আবদুল মোতালেব খান গেল উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে অংশগ্রহণ করেন। ডা. রফিক চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তৎকালীন কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম কামাল মোতালেব খানের বিপক্ষে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনের কিছুদিন পূর্বে সাইফুল ইসলাম
চৌধুরী কামাল তাঁর মনোনয়ন প্রত্যাহার করে মোতালেব খানকে সমর্থন দেন। এ সময় কৌশল করে আবদুল মোতালেব খান বিএনপিকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করার জন্য উভয় পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে মিলনের সেতুবন্ধন তৈরি করেন। মোতালেব খান উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জয় লাভের পর বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে আবারও দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ফাটল ধরিয়ে ডা. রফিক চৌধুরীর কাছ থেকে সটকে পড়েন। দলের এমন বেহাল অবস্থার কারণে বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন কয়েকশ নেতাকর্মী।
২০১৪ সালের ১৭ নভেম্বর আব্দুল মোতালেব খানকে আহ্বায়ক করে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেয় জেলা বিএনপি। এই কমিটিতে ডা. রফিক চৌধুরী সমর্থিত কয়েকজন নেতাকর্মী স্থান পায়। তবে মোতালেব খানকে আহ্বায়ক করায় ডা. রফিক চৌধুরী সমর্থিত নেতাকর্মীরা উপজেলা সদরে জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক নাছির চৌধুরীর বিরুদ্ধে জুতা ও ঝাড়ু মিছিল করে। পরে ২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি উপজেলা বিএনিপর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইসতিয়াক হোসেন চৌধুরী স্বপনকে আহ্বায়ক করে ১৭১ সদস্য বিশিষ্ট পাল্টা আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেন ডা. রফিক চৌধুরী। পাল্টাপাল্টি আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে উভয় পক্ষের নেতাকর্মীরা একে অপরের বিরুদ্ধে অশালীন ও বিরূপ মন্তব্যে লিপ্ত হয়। পরে আব্দুল মোতালেব খানকে সভাপতি ও আলী আমজাদকে সাধারণ সম্পাদক করে উপজেলা বিএনপির কমিটি অনুমোদন দেয় জেলা বিএনপি। তবে এ কমিটিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায় ডা. রফিক চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন নেতাকর্মীরা। চলতে থাকে পৃথক পৃথক কর্মসূচি।
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়িবহরে হামলার প্রতিবাদে গত সোমবার উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে পৃথক পৃথক বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় সভাপতি আব্দুল মোতালেব খানের সাথে ডা. রফিক চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন নেতাকর্মীরা অংশ নেয়। অপরদিকে সাধারণ সম্পাদক আলী আমজাদের সাথে তার কমিটির নেতাকর্মীসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করে। ফলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এখন দুই ধারায় বিভক্ত।
এ ব্যাপারে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল মোতালেব খানের সাথে কথা বলতে একাধিক দিনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও মুঠোফোন রিসিভ না করা বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইসতিয়াক হোসেন চৌধুরী স্বপন বলেন, ‘মোতালেব সাহেব সভাপতি ও আলী আমজাদ সেক্রেটারী সম্বলিত কমিটির কোনো বৈধতা নেই। এই কমিটি আমরা শুরু থেকে মানি না। নাছির চৌধুরীর (জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক) দেওয়া এ কমিটির বিরুদ্ধে বিগত দিনে আমরা জুতা ও ঝাড়– মিছিল করেছি। আমরা যতটুকু জানি এ কমিটি কেন্দ্র দ্বারা স্থগিত আছে। আব্দুল মোতালেব খান তাঁর প্রটোকল সব জায়গায় ব্যবহার করেননি। আলী আমজাদ তার প্রটোকল সব জায়গায় ব্যবহার করে চলেন। প্রটোকল নিয়ে সুনামগঞ্জ গিয়ে কোনো কথা বলার মতো সাহস নেই তার। যেখানে কেন্দ্রের নেতারা এই কমিটি পুনর্গঠনের কথা বলেন সেখানে এই কমিটির বৈধতা থাকে না। আমরা উপজেলা চেয়ারম্যান (আব্দুল মোতালেব খান) ও ডা. রফিক চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন নেতাকর্মীরা এক সাথে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন করেছি।
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আমজাদ বলেন, ‘সভাপতির কর্মকান্ডে অসন্তুষ্ট হয়ে উপজেলা বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ট নেতাকর্মী তাঁর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দলের স্বার্থে তাদের সাথে আমাকে থাকতে হয়। ব্যক্তিগতভাবে আমার সাথে তাঁর কোনো বিরোধ নেই। উনি ডাক্তারের লোকজনের সাথে একাত্মতা পোষণ করেছেন এতে কারও কোনো আপত্তি নেই কিন্তু উনার পক্ষ অবলম্বন করে আন্দোলন সংগ্রাম করে বিগত দিনে যে সকল নেতাকর্মী হামলা মামলার শিকার হয়েছেন অন্তত তাদের উনার সাথে আলাপ করে যাওয়া উচিত ছিল। আব্দুল মোতালেব খান বৈধ কমিটির সভাপতি কিন্তু যারা তাঁকে সভাপতি হিসেবে মানে না তাদের কাছে গিয়েই যদি তিনি ধরনা দেন তাহলে বিষয়টি রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব ছাড়া কিছুই নয়। এতে বুঝা যায় তিনি ধর্মপাশায় জনশূন্য হয়ে গেছেন। রাজনৈতিক আদর্শ, ব্যক্তিত্ব যদি কারও মধ্যে না থাকে তাহলে সে পূর্ণাঙ্গ নেতা হতে পারেনা।’
আলী আমজাদ ইসতিয়াক হোসেন চৌধুরী স্বপনের বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলেন, ‘এটি তাঁর মনগড়া কথা। যদি আমাদের কমিটি বাতিল বা স্থগিত হয়ে থাকে তাহলে তারা সাংগঠনিকভাবে ডকুমেন্ট শো করুক। আমাদের কেউ কোনো স্থগিতাদেশ দেয়নি।’


