বিশেষ প্রতিনিধি
সরকারি খাদ্য গোদামে পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ করে কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয় বন্ধ করা হয়েছে বলে কৃষকদের কাছ থেকে অভিযোগ উঠেছে। এতে গোদামের আশপাশে স্তুপ করে রাখা ধান নিয়ে মহা বিপাকে পড়েছেন সাধারণ কৃষকরা। দীর্ঘদিন ধরে গোগামের রাস্তা ও আশপাশে ধান স্তুপ করে রাখার পর এখন ধান নেয়া হবে না এমন ঘোষণায় কৃষকরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে জানিয়েছেন। সরকারি ঘোষণা মোতাবেক ৩১ জুলাই পর্যন্ত ধান কেনার সময়সীমা থাকলেও এক সপ্তাহ আগেই সেটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার জেলা প্রশাসকের কাছে অতিদ্রুত খাদ্য গোদামে ধান গ্রহণ করার জন্য লিখিত দাবি জানিয়েছেন সুনামগঞ্জ সদর ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার কয়েকজন কৃষক। কৃষকদের পক্ষে সুনামগঞ্জ পৌরসভার কাউন্সিলর আহমেদ নূরও জেলা প্রশাসকের কাছে দাখিল করা আবেদনে স্বাক্ষর করেছেন। এছাড়া কৃষকরা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে দেখা করে গোদামের রাস্তায় ও আশপাশে স্তুপ করে রাখা ধান গোদমে নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও ভারপ্রাপ্ত খাদ্য গোদাম কর্মকর্তা জানিয়েছেন,‘খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা এসেছে সরকারিভাবে আর ধান ক্রয় করা হবে না। তাই তারা ধান ক্রয় করা বন্ধ করে দিয়েছেন।’
এদিকে হঠাৎ করে সরকারি খাদ্য গোদামে ধান ক্রয় বন্ধ হওয়ার পর কৃষকদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়ার নানা খবর বেরিয়ে এসেছে। অনুসন্ধানে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিভিন্ন এলাকার কার্ডধারী একাধিক কৃষদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত মে মাসে শুরু হওয়া সরকারি ধান ক্রয় অভিযান শুরুর পর নানা কৌশলে কৃষকের কাছ থেকে সদর উপজেলা খাদ্য গোদামে প্রতি ৩ মে. টনে প্রায় ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত অবৈধভাবে আদায় করার কথা জানা গেছে। এসব টাকা আদায় করছেন সদর উপজেলা খাদ্য গোদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ধিরাজ দেবনাথ চৌধুরী, অফিসের নিরাপত্তা প্রহরী জাকির হোসেন ও জগলুল মিয়াসহ আরো অনেকেই।
ধান ক্রয় করতে প্রতি ৩ মে. টন ধানে খাদ্য গোদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ধিরাজ দেবনাথ চৌধুরীকে ৩ হাজার, নিরাপত্তা প্রহরী জাকির হোসেনকে ১ হাজার, আরেক নিরাপত্তা প্রহরী (ভাউচার লেখকের দায়িত্বে ছিলেন) জগলুল মিয়াকে প্রতি ৩ টনে ৫০০, এছাড়া ধান ঝাড়ানোর জন্য জাকিরকে প্রতি ৩ টনে ৫০০ টাকা, অফিসকে ধান ওজন করানোর জন্য প্রতি ৩ টনে ৫০০, গোদামে ধান ঢোকানোর জন্য প্রতি ৩ টনে (৭৫ বস্তা) ১১২৫ টাকা করে, বস্তার জন্য নিরাপত্তা প্রহরী মুজিবুর রহমানকে প্রতি ৩ টনে ১৫০-২০০ টাকা করে দিতে হয়েছে। নিজের পদ অনুযায়ী সবচেয়ে বেশী টাকা আদায় করেছেন জাকির হোসেন।
একাধিক কৃষক জানান, কৃষকদের অকথ্য ভাষায় গালি-গালাজ, ধান না নেয়া ও বেশী কথা বললে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তি দেয়ার ভয় দেখাতেন খাদ্য গোদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ধিরাজ দেবনাথ চৌধুরী। যারা ধান বিক্রিতে উৎকোচ দেয়ার বিষয়ে প্রতিবাদ জানাত তাদের ধান না নেয়ার হুমকি দিতেন। এমনকি বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে অনেকের ধান নিতেন না। যারা গোদামে ধান দিয়েছেন তাদের সবাইকেই কম-বেশী টাকা দিতে হয়েছে।
কৃষকরা জানান, গত ১৫ দিন আবহাওয়া খারাপ থাকার কারণে গোদামে ধান নেয়া হয়নি। এখন হঠাৎ করে ধান নেয়া বন্ধ করা হয়েছে। অথচ কৃষকদের কাছ থেকে ধান নেয়া হবে বলে সিরিয়েলের টোকেন দেয়া হয়েছিল। গোদামের সামনের রাস্তায় তারা ধান রেখেছেন। এই ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। তাদের ধারণা কাগজে কলমে ধান ক্রয় বন্ধ করা হয়েছে। তবে খাদ্য গোদাম কর্তৃপক্ষ পূর্বের তারিখ উল্লেখ করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ধান ক্রয় করবেন।
ক্ষোভ প্রকাশ করে কয়েকজন কৃষক বলেন,‘বাড়ি থেকে গোদামে ধান আনতে আমাদের প্রতি মণে খরচ হয়েছে প্রায় ১০০ টাকা করে। এখন এই ধান গোদামে বিক্রি করতে না পারলে আবার প্রতিমণে ১০০ টাকা খরচ করে বাড়িতে নিতে হবে। না হয় কোন ব্যবসায়ী ও মিল মালিকের কাছে সস্তায় বেচতে হবে। প্রতি মণে কত টাকা লস হবে তা টাকা পাওয়ার পরই জানা যাবে। ধান ক্রয় অভিযান হঠাৎ করে বন্ধ করার জন্য কৃষকরা খাদ্য গোদামের কর্তৃপক্ষকেই দায়ী করেন।
মঙ্গলবার বিকালে বিভিন্ন এলাকার একাধিক কৃষক দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর কার্যালয়ে এসে ধান না নেয়ার কারণ হিসাবে এসব অভিযোগ ও খাদ্য গোদামের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের টাকা আদায়ের বিষয়ে কথা বলেন। কৃষকদের দেয়া বক্তব্য দৈনিক সুনমাগঞ্জের খবর কর্তৃপক্ষের কাছে রেকর্ড রয়েছে।
জানা যায়, সরকারিভাবে খাদ্য গোদামে ধান ক্রয় করার তালিকা অনুযায়ী সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২১৭৬ মে.টন ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় ৩১০৫ মে.টন। দক্ষিণ সুনামগঞ্জে সরকারি খাদ্য গোদাম না থাকায় মোট ৫৩৮১ মে.টন ধান সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গোদামেই নেয়ার কথা। কিন্তু গত ২৫ জুলাই পর্যন্ত সুনমাগঞ্জ সদর উপজেলা খাদ্য গোদামে দুই উপজেলার মোট ৩০৯৬ মে.টন ধান ক্রয় করা হয়েছে।
তবে কৃষকদের এসব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন সদর উপজেলা খাদ্য গোদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ধিরাজ দেবনাথ চৌধুরী ও উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বিনয় কুমার দেব।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা খাদ্য গোদাম এলাকার স্থানীয় পৌর কাউন্সিলর আহমেদ নূর বলেন,‘ গত ১৫ দিন কারো কাছ থেকে ধান নেয়া হয়নি। ধান নেয়া হবে বলে অনেক কৃষককে টোকেন দেয়া হয়েছে। তারা গোদামের ভেতর ও বাইরে ধান স্তুপ করে রেখেছেন। এখন হঠাৎ করেই বলা হচ্ছে ধান ক্রয় করা হবে না। কৃষকরা এসব ধান নিয়ে ক্ষতির সন্মুখিন হয়েছেন। কৃষকদের স্বার্থে গোদামের আশপাশের রাখা ধানগুলো ক্রয় করা প্রয়োজন।’
কৃষকদের ধারণা এখন পর্যন্ত অর্ধেক বা তার চেয়ে কিছু বেশী ধান ক্রয় করা হয়েছে। এখনও প্রায় আড়াই হাজার মে. টন ধান ক্রয় করার বাকী রয়েছে। এসব ধান কাগজে কলমে ক্রয় করা হবে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে।
এ ব্যাপারে সদর উপজেলা খাদ্য গোদামের নিরাপত্তা প্রহরী জাকির হোসেনের কাছে কৃষকদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন,‘ভাই আমি কারো কাছ থেকে টাকা নেইনি। একজন বললেই হলো নাকি। কৃষকরা মিথ্যা অভিযোগ করছেন।’
সদর উপজেলা খাদ্য গোদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ধিরাজ দেবনাথ চৌধুরী বলেন,‘ খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা এসেছে ধান ক্রয় বন্ধ রাখার জন্য। গত ২৫ জুলাই আমাদের হাতে এই নির্দেশনা এসে পৌঁছেছে। তাই আমরা ধান ক্রয় করা বন্ধ করে দিয়েছি। ধান বিক্রি করতে না পেরে অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়ে এখন আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা বলছেন। এসব অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই। আমরা ধান ক্রয়ে কৃষকদের কাছ থেকে টাকা আদায় ও তাদের সাথে কোন ধরনের খারাপ আচরণ করি নি। যারা কৃষকদের নামে গোদামে ধান বিক্রয় করতে ব্যর্থ হয়েছেন তারাই এসব ভিত্তিহীন কথাবার্তা বলছেন। আমাদের অফিসের কোন কর্মচারী-কর্মকর্তাকে কেউ টাকা দেয়নি। কৃষকদের কাছ থেকে কেউ টাকা আদায় করে নি। কৃষকদের নামে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও মধ্য স্বত্বভোগীরা নিজের সুযোগ সুবিধা না পেয়ে এখন কৃষকদের দিয়ে এসব কথা বলাচ্ছে।’
সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বিনয় কুমার দেব বলেন,‘ সদর উপজেলা খাদ্য গোদামে সরকারিভাবে ধান ক্রয় করার বিষয়ে কৃষকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়েছে বলে কোন অভিযোগ পাইনি। কেউ আমার কাছে এ ধরনের কোন অভিযোগ করেন নি। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ধান ক্রয় বন্ধ করা হয়েছে। ধান ক্রয় করার করার কোন সুযোগ নেই আর। কৃষকদের এখন অভিযোগ করার কোন অর্থ নেই।’


