সরকারি ধান সংগ্রহ অভিযান/ প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে এখনই ধান কিনুন

ফসলের মাঠ এখন ধান গন্ধময়। চারিদিকে আনন্দ হিল্লোল। ঘরে ঘরে কর্মযজ্ঞ। এবারের বৈশাখ এসেছে কৃষকের কাক্সিক্ষত রূপে আশীর্বাদের পূর্ণথালা হাতে করে। প্রকৃতির রুদ্ররোষের ভয়ে আড়ষ্ট কৃষক এখন বাঁধনহারা। কৃষকবঁধুর চোখে সোনালী সম্ভাবনার দিগন্তবিস্তৃত মাধুরী। গোলায় সোনালী ধান উঠলেই যে পুরো বছরের স্বপ্নসাধ মিটানোর একটু সুযোগ মেলে। এ মৌসুমে শত কোটি টাকার বাঁধের কাজে কোথায় কোন্ অনিয়ম হল, কোন্ পিআইসি বরাদ্দের ছিটেফোটা খরচ করে পুরোটাই উদরস্ত করতে বেপরোয়া ছিলো, কোন্ প্রকল্প অপ্রয়োজনীয়; এ সবের কোনো কিছুই এখন আর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নেই। সোনালী ফসল এর সবকিছু ভুলিয়ে দিয়েছে। বস্তুত ফসল ঘরে তোলতে পারলেই সরল কৃষক সন্তুষ্ট। দুনিয়ার আর কোনো ঘোরপ্যাঁচ তাকে চিন্তাসাগরে পতিত করতে পারে না। সে এখন গলা তুলে গান গাইতে চাইবে।
উপরের মত করে এক চিত্রকল্পকে মাথায় রেখে গ্রামীণ জনপদের বর্তমান বাস্তব অবস্থাকে মিলাতে গেলে প্রতি পদক্ষেপে হুছট খেতে হবে। পাহাড় যেমন দূর থেকে শোভন-সুন্দর, ঘনসবুজ, মায়া-জাগানিয়া; কাছে গেলে ধরা পড়ে এর বিবর্ণতা, গাছ নেই, সবুজ অরণ্য উধাও হয়ে ন্যাংটা করে ফেলেছে পাহাড়ের বিশাল শরীর। তেমনি দূর থেকে সোনালী ধানের ক্ষেত, সোঁদা ধানগন্ধ, কর্মপাগল পল্লী এলাকা; সবকিছুই বাইরে থেকে কাব্যময়তার আবেশ ছড়াতে পারে কেবল। ভিতরে গিয়ে কান পাতলে শোনা যাবে একসাথে অনেকের কষ্টকথা। এই সোনাফলা ধান তোলেও স্বস্তি নেই কৃষক পরিবারে। ঋণ শোধের চিন্তা, দোকানের পাওনা মিটানোর দায়, ঘর সংসারের অফুরন্ত চাহিদার লম্বা তালিকা; সবকিছু মিলিয়ে কৃষকের চোখে নেই স্বস্তির ঘুম। ধান বেচে নিজের সব দায় মিটিয়ে স্ত্রী সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর সংগতি নেই প্রান্তিক কৃষক পরিবারগুলোর। কৃষক পরিবার বলতে আবার কী? এখন তো সকলেই বর্গাচাষী, ভাগচাষী বা রঙজমা নেয়া জমির চাষী। চাষীর হাতে এখন কোথাও জমি নেই। জমির মালিক (অধিকাংশ ক্ষেত্রে) গ্রামে থাকেন না, তারা শহরবাসী, অন্য পেশায় ব্যস্ত। চাষীর হাত থেকে জমি চলে যাওয়ার এই বাস্তবতা বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির এক নিরব পতনযাত্রা। যা শুরু হয়ে এখনও চলমান গত কয়েক দশক ধরে।
সরকার ধানের ক্রয়মূল্য ঠিক করে দিয়েছেন এবার প্রতি কেজি ৩০ টাকা। সনাতন হিসাব মতে এক মণ ধানের দাম সরকারিভাবে ১ হাজার ১ শত উনিশ টাকা। খবর পাওয়া গেছে এই ধান কৃষক মাঠে বিক্রি করছেন ৮ শ’ টাকা বা তার কম মূল্যে। সরকারিভাবে ধান কিনতে যে এখনও ঢের বাকি। আসছে ৭ মে তারিখকে সরকার ধান সংগ্রহ শুরুর তারিখ ঠিক করেছেন। আমরা অভিজ্ঞতা থেকে জানি নির্ধারিত এই তারিখে কোথাও ধান সংগ্রহ শুরু করা যায় না। নানা আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতির প্রলম্বন একে পিছিয়ে নেয় আরও মাস খানেক। ততক্ষণে প্রান্তিক কৃষকের ঘর হয়ে পড়ে ধান শূন্য। এই ধান জমা হয় ফড়িয়া ও মধ্যসত্ত্¦ভোগীদের গোদামঘরে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে এই অনুৎপাদনশীল গোষ্ঠীটি মণ প্রতি মুনাফা উঠিয়ে নিবে ৩ শ’ টাকা বা তার চাইতেও বেশি। প্রকৃত কৃষকরা কখনও সরকারিভাবে ধান বিক্রি করতে পেরেছেন এমন উদাহরণ খুব কমই মিলে। হয়তো ফরিয়াদেরও সরকারি গোদামে ধান দেয়ার প্রয়োজন হবে না। বাজার এর চাইতেও বেশি দামে সেই ধান কিনে নিবে সময়মতো পর্যাপ্ত মুনাফা উঠিয়ে উচ্চমূল্যে বিক্রি করার খায়েশে। সরকারের ধান সংগ্রহ অভিযান পূর্ণতা না পাওয়ার অর্থ হলো দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় টান পড়া। গতবছর আমরা এমন দৃশ্য দেখেছি। এবারও বোধ করি সে দিকেই যাচ্ছে বাস্তবতা। কৃষকদের নিকট থেকে মৌসুমের শুরু থেকেই ধান সংগ্রহ করার ব্যবস্থা না করা গেলে এই সীমাবদ্ধতা কাটানোর উপায় নেই।
তাই বলি, সব ওজর আপত্তি দূর করে প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে এখনই ধান কিনুন।