সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে জগন্নাথপুরের ছোট প্রতিবাদ

জগন্নাথপুর পৌরবাসী নাম দিয়ে একটি সংগঠনের ব্যানারে রবিবার ওই শহরের পৌরপয়েন্টে মাদক, জুয়া ও অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধের দাবিতে সভা করেছেন এলাকাবাসী। খবরটি আপাতদৃষ্টিতে ছোট হলেও এর অন্তর্নিহিত বার্তাটি এক ভয়ানক সামাজিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। আমরা যে সমাজে বাস করি, আমাদের সন্তানরা যে পরিবেশে বড় হচ্ছে সেখানে আসলে কোন্ বাস্তবতা বিরাজিত রয়েছে তা সকলের জানা। সমস্যা হচ্ছে এ নিয়ে কারও মুখে কোন শব্দ নেই। নিরবে মেনে নিচ্ছেন সকলে। এরকম নির্জীব সময়ে যখন কেউ প্রতিবাদের কণ্ঠ নিয়ে সাহসের সাথে রাজপথে এসে দাঁড়ান, তখন সেটি হয়ে উঠে এক উজ্ব¦ল ব্যতিক্রম। জগন্নাথপুর পৌরবাসী সেই ব্যতিক্রমি দায়িত্বটি পালন করে প্রশংসনীয় কাজ করেছেন বলেই আমরা মনে করি। তাঁদের এই মহতী কর্মকা- শুধু একদিনের সভায় থেমে না থেকে এই উদ্যোগটি যাতে ঘুনে ধরা কলুষিত সমাজদেহে কিছুটা হলেও সুস্থতার দিকনির্দেশক হতে পারে এই আমাদের কামনা।
জুয়া, মাদক ও অসামাজিক কর্মকা- এখন ভয়াল সামাজিক সমস্যা হিসাবে সকলের সামনে উপস্থিত হয়েছে। প্রতিদিন এখানে-ওখানে নানা অপরাধ তৎপরতার খবর মিলে। নানা কিসিমের জুয়ায় আসক্ত হয়ে সর্বনাশের অন্ধকার গুহায় ঢুকে যাচ্ছে আমাদের তরুণ সমাজ। মাদকের অপ্রতিরোধ্য আগ্রাসন রোধ করা যাচ্ছে না কিছুতেই। ইভটিজিং, ধর্ষণসহ মাত্রাতিরিক্ত অপরাধপ্রবণতা নিরীহ ও ভদ্র মানুষদের সার্বক্ষণিক দুশ্চিন্তায় রাখতে বাধ্য করছে। তীর-শিলং নামক এক ধরনের জুয়া খেলায় অংশগ্রহণকারীদের ধরা পড়ার খবর পাওয়া যায় প্রায়সই। কিন্তু যারা এই খেলা পরিচালনা করছে তাদের টিকিটিরও নাগাল পেতে দেখি না আমরা। মাদকসক্ত কিছু ব্যক্তি বা একেবারে নীচের স্থরের দুয়েকজন বিক্রেতা মাঝে মধ্যে ধরা পড়ে বটে কিন্তু যারা এ জনপদে মাদকের চালান নিয়ে আসে তারা থাকে ধরাছুঁয়ার উর্দ্ধে। এভাবে ঠ্যাং এর বদলে লাঠি ঝাপটে ধরলে জলের কুমির যে আস্ত গিলে খাবে সেই বোধটি কি কারও নেই?
এক ভয়ানক অস্থিরতা সর্বত্র। সহজ পথে সবকিছু পাওয়ার দুর্নিবার ব্যাকুলতা সকলের মধ্যে। সহজে ধনী হতে চাই, সহজে সমাজে নমস্য হতে চাই, বিনা ক্লেশে প্রভাব চাই, প্রতিপত্তি চাই, ক্ষমতা চাই। এই সর্বগ্রাসী চাওয়ার দুর্দনমনীয় আগ্রাসনের হাত ধরে বেড়ে উঠছে অপরাধ ও অপরাধী। কারণ আমাদের সমাজের কতিপয় ব্যক্তি যা চান তা অর্জনের জন্য তাদের কিছু পোষ্য লোক দরকার হয়। এই পোষ্যরা তার প্রভুর মদদে কিংবা ছত্রচ্ছায়ায় সাহসের শেষ সীমান্তে পৌঁছে। সমাজের অন্য তরুণরা এদের দেখে শিখে। যে সমাজে জ্ঞানীর চাইতে মূর্খ দাম্ভিকের ক্ষমতা বেশি, যেখানে মেধার চাইতে অর্থের মূল্য বেশি, সেখানে অপরাধীরা অনুকূল পরিবেশ পেয়ে যাবে তাতে আর আশ্চর্য কি।
তবে সমাজের বেশির ভাগ মানুষই আইন মান্যকারী নিরীহ প্রকৃতির। এরা শান্তি চান। একটি সুস্থ পরিবেশে বাস করতে চান। রাষ্ট্রের উপর দায়িত্ব বর্তায় সেই পরিবেশ নিশ্চিত করার। দুঃখজনক বিষয় হলো আজ রাষ্ট্র ও তার প্রতিষ্ঠানগুলো এই পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারছে না। উল্টো তাদের কারণে অপরাধ ও অপরাধীরা আস্কারা পেয়ে যায় বলেই সাধারণ্যে বিপুল অভিমত। এরকম অবস্থায় জগন্নাথপুর পৌরবাসী রাস্তায় দাঁড়িয়ে সকলের জন্য একটি উদাহরণ তৈরি করেছেন। তারা জানিয়ে দিলেন যে, যারা আজ সামাজিক অন্যায্যতার শিকার তাদের প্রতিবাদী হতে হবে। প্রতিবাদী হওয়াটা জরুরি নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে। জগন্নাথপুরের এই ছোট উদাহরণটি দাবানলের মতো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়–ক একটি সুস্থ সমাজ নির্মাণের আকাক্সক্ষায়, এই আমাদের কামনা।