বিশেষ প্রতিনিধি
হাওরাঞ্চলে বোরো’র এখন ভরা মৌসুম। নীচু এলাকা ছাড়া অন্য এলাকায় সবুজ তরতাজা ধানের গোছাই জানান দিচ্ছে সোনালী ধানের আগাম বার্তা। এই সময়ে সারের প্রয়োজন সকল কৃষকদের। সুনামগঞ্জ জেলাব্যাপি বেশি চাহিদা মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) সারের। অথচ এই জাতের সারই কম পাওয়া যাচ্ছে বাজারে। একই সঙ্গে ইউরিয়া, ট্রিপল সুপার ফসপেট (টিএসপি) এবং ডাই এ্যামোনিয়াম ফসপেট (ডিএপি) সারও চাহিদার চেয়ে অপ্রতুল রয়েছে প্রত্যন্ত এলাকায়।
শাল্লার আনন্দপুরের বড় কৃষক মাখন লাল দাশ সোমবার নয় বস্তা ইউরিয়া সার কিনেছেন। প্রতি বস্তা ৯০০ টাকা হিসাবে দাম রেখেছেন খুচরা বিক্রেতা বা সাব ডিলার। অথচ. বিসিআইসি এই সার ৮০০ টাকা খুচরা মূল্যে বিক্রয়ের নির্দেশ দিয়েছে। একইভাবে বেশি দামে ইউরিয়া সার কিনেছেন শাল্লার আঙ্গাউড়ার কৃষক ভূষণ দাশ এবং নোয়াগাঁওয়ের কৃষক দেবেশ দাশ।
মাখন লাল দাশ জানালেন, জমিতে হালিচারা রোপনের আগে এমওপি ও টিএসপি সার দিতে হয়, সেই সময়ও বেশি দামে সার কিনতে হয়েছে, চারা লাগানোর এক মাস পার হয়েছে, এখন ইউরিয়া সার দেবার প্রয়োজন। দুই চারদিনের মধ্যে সার দেওয়া না গেলে চারা লাল হয়ে যাবে। চারা বড় হবে না।
আনন্দপুরের আরেক কৃষক পরিমল দাশ একই ধরণের মন্তব্য করে বললেন, সারের যখন বেশি প্রয়োজন হয়, তখনই কৃত্রিম সংকট তৈরিসহ নানাভাবে সারের দাম বাড়ানো হয়। এবারও সেটি করা হচ্ছে।
শাল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি বড় গৃহস্থ আব্দুস সাত্তার বললেন, ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি দরে সকল জাতের সারের বস্তা বিক্রয় হচ্ছে। আমার নিজের এই সময়ে ১০০ বস্তা সার লাগবে। কিছু সার বেশি দামে কিনতে হয়েছে। কেন বেশি দামে সার বিক্রয় হচ্ছে আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে জানতে চাইবো।
দিরাই উপজেলার রাজানগরের কৃষক আব্দুস সাত্তার বললেন, ৮৩০ থেকে ৮৪০ টাকায় ইউরিয়া সার বিক্রয় হচ্ছে দিরাই উপজেলায়।
দিরাই উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান, সারের সাব ডিলার মোহন চৌধুরী বললেন, সারের অপ্রতুলতা আছে। সাদা ইউরিয়া সারের চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। এমওপি একেবারে কম পাওয়া যাচ্ছে। বেশি দামে বিক্রয়ের কথা স্বীকার করে তিনি বললেন, আমরা ৮৫০ টাকা বস্তায় ইউরিয়া সার বিক্রয় করছি। এমওপি সার যে যেমন পারে দামে বিক্রয় করছে।
শাল্লার সারের ডিলার জসিম উদ্দিন বললেন, ২০৫ টন ইউরিয়া সার বরাদ্দ পেয়েছি আমি। ২৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা জমা দিয়েছি গত ৪ জানুয়ারি। এখনও সার পাই নি। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা থেকে সার উত্তোলন করলে শাল্লায় এনে পৌঁছাতে খরচ এবং সময় দুটোই বেশি লাগে। শাল্লায় কিশোরগঞ্জের আশুগঞ্জ সার কারখানা থেকে সার বরাদ্দ দিলে ভালো হতো। বার বার আমরা এই দাবি জানাচ্ছি, কেউ আমলে নিচ্ছে না। উপজেলার আনন্দপুরে কোন সার ডিলার নাই, ওখানে সাব ডিলাররা সার বিক্রি করেন। ওখানে সার পৌঁছাতে পরিবহন খরচও বেশি দাবি করে তিনি বললেন, আমরা বিসিআইসি’র নির্ধারিত মূল্যেই সার বিক্রয় করছি।
কৃষক সংগ্রাম সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা ধর্মপাশার বাদশাগঞ্জের বাসিন্দা খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বললেন, এমনিতেই নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রয় করেন হাওরাঞ্চলের বেশির ভাগ সারের ডিলার। গত কয়েকদিন ধরে একশ-দেড়শ টাকা বস্তা প্রতি বেশি দামে সার বিক্রয় করছেন তারা। এমওপি বিক্রয় হচ্ছে দ্বিগুণ দামে। কর্তৃপক্ষের নজরদারি না থাকায় যে যেভাবে পারে বিক্রয় করছে। কৃষকদেরও বিপদে পড়ে কিনতে হচ্ছে।
শাল্লা উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা বিভুতোষ চৌধুরী বললেন, শাল্লা উপজেলায় পাঁচ জন সারের ডিলার রয়েছেন। তাদেরকে নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। প্রত্যেকের বিক্রয় রেজিস্টার রয়েছে। তারা ৮০০ টাকা বস্তায় ইউরিয়া সার বিক্রয় করছেন। কেউ যদি বেশি দামে কিনে ভাউচার কম দামের নেন, কাউকে অভিযোগ না জানান, তাহলে অনিয়ম ধরা কঠিন হয়। এ ধরণের অভিযোগ কেউ জানান নি। শাল্লায় ১০২১ টন ইউরিয়া সারের এই মাসে বরাদ্দ হয়েছে। এখনো পর্যন্ত ১০১ টন পাওয়া গেছে। যদি চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যায় কোন ধরণের সমস্যা থাকবে না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বললেন, জুলাই ২০২১ থেকে জুন ২০২২ পর্যন্ত জেলায় এমওপি সারের চাহিদা দেওয়া হয়েছে ৩৪ হাজার ১৯ টনের। এরমধ্যে মঙ্গলবার পর্যন্ত সাত হাজার ১৩৮ টন পাওয়া গেছে। এভাবে ডিএপি সারের চাহিদা দেওয়া হয়েছে ২০৭৮০ টনের, পাওয়া গেছে ১৫ হাজার ৬৫৬ টন, ইউরিয়া সারের চাহিদা দেওয়া হয়েছে ৫৮ হাজার ৫৯৬ টন, পাওয়া গেছে ৩৫ হাজার ৪৯ টন।
তিনি জানান, এমওপি ৫০ কেজির বস্তা ৭৫০, টিএসপি ১১০০ এবং ইউরিয়া ও ডিএপি ৮০০ টাকায় বিক্রি করার নির্দেশ রয়েছে। কেউ বেশি মূল্যে বিক্রি করেছেন এমন অভিযোগ জানায় নি কেউ। গত ২২ ডিসেম্বর থেকে সার বিক্রয় কেন্দ্রে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা হচ্ছে, ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলবে। এই পর্যন্ত ৮ জন ডিলারকে জরিমানা করা হয়েছে।
তিনি বললেন, ইতিমধ্যে সারের ডিলাররা যে টাকা জমা দিয়েছেন, সেই অনুযায়ী সার বরাদ্দ পাওয়া গেলে কোথাও সমস্যা থাকবে না। মঙ্গলবার জেলার সকল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়ে সভা ছিল, সেখানে এসব বিষয় আলোচনা হয়েছে। সকলকে বলে দেওয়া হয়েছে কোথাও যাতে কেউ সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে বিক্রি করার অপচেষ্টা না করে, সেভাবে নজরদারি করতে হবে। জেলার ৯০ জন সারের ডিলারই আমাদের নজরদারির মধ্যে আছেন। বেশি দামে সার বিক্রয়ের কোন সুযোগ নেই।
- শান্তিগঞ্জে মাস্ক ব্যবহারে সচেতনা বৃদ্ধিতে থানা পুলিশের প্রচারণা
- তাহিরপুরে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রচারাভিযান


