কুমার সৌরভ
১৯৭১ সনের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে শরণার্থী অনুষঙ্গটি ছিল এক অনিবার্য বাস্তবতা। প্রায় এক কোটি শরণার্থী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয়, বিহার এমনকি উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশের বহু শিবিরে মানবেতর জীবন কাটিয়েছেন। রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন কয়েক লক্ষ মানুষ। এই শরণার্থী অনুষঙ্গটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে তুলে ধরেছিল। প্রভাবিত করেছিল বিশ্ব মানবতাকে, অবশ্যই রাজনীতিকেও। যুদ্ধের কূটনীতি ও রাজনীতি বহুলাংশে আবর্তিত হয়েছে শরণার্থী সমস্যাটিকে কেন্দ্র করে। একাত্তরের শরণার্থী শিবিরগুলো ছিলো মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটিং সেন্টার। ছিলো মুক্তিযুদ্ধ সংগঠকদের আশ্রয়স্থল। কিন্তু একাত্তরের এমন একটি অনিবার্য বাস্তবতা আমাদের ইতিহাস চর্চায় তেমন উল্লেখযোগ্য স্থান করে নিতে পারে নি। কিঞ্চিৎ যতটুকু কাজ হয়েছে সেগুলোও বহুল প্রচারিত নয়। এরকম একটি কম আলোচিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ সেক্টরকে এবার নিজের লেখার উপজীব্য করেছেন সুনামগঞ্জের একজন লেখক। সুখেন্দু সেন। পেশাগত জীবনে একজন সফল ব্যাংকার ছিলেন তিনি। অবসর গ্রহণের পর
লেখালেখিতে অখ- মনোসংযোগ নিয়োজিত করেন। রচনাশৈলী, বিষয়বস্তুর গভীরতা, বিশ্লেষণের দক্ষতা ইতোমধ্যে তাঁকে বিশিষ্ট করে তুলেছে। একাত্তরে তিনি নিজে ছিলেন বাস্তুচ্যুত এক শরণার্থী। পরিবারের সাথে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন পরদেশেÑ নিরাপত্তার জন্য, আশ্রয়ের নিমিত্ত। সেখানে গিয়েও পরিবারছাড়া হয়েছেন। ঘুরেছেন ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয় ও আসাম প্রদেশ। দেখেছেন শরণার্থী জীবন। প্রত্যক্ষ করেছেন যুদ্ধ রাজনীতি-কূটনীতি। ভীষণ প্রতিকূল বিশ্ব পরিস্থিতিতে ইন্দিরা গান্ধী ও ভারত কীভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেছে তার কিছু খ-াংশ জানার সুযোগ হয়েছিলো তাঁর। শরণার্থী জীবনের অনুপুঙ্খ জানার জন্য পড়েছেন প্রচুর। এইসব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পাঠজাত তথ্য মিলিয়ে তিনি রচনা করেছেন ‘শরণার্থী ৭১’ নামক গ্রন্থটি। ২৩৫ পৃষ্ঠার এই বইটি প্রকাশ করেছে ঢাকার স্বনামখ্যাত প্রকাশনী প্রতিষ্ঠান সময় প্রকাশন। বইয়ের দৃষ্টিকাড়া প্রচ্ছদ করেছেন দেশের আরেক নামকরা শিল্পী ধ্রুব এষ।
লেখক একাত্তরে ছিলেন টগবগে যুবা হই হই বয়সের এক তরুণ। তিনি সবকিছু দেখতেন, সেগুলো নিয়ে ভাবতেন। দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার শুরু থেকে ফিরে আসার দিন পর্যন্ত তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনাকে তিনি নিজের মতো করে বিশ্লেষণ করেছেন। ভাবুক মনের সংগোপনে লুকিয়ে রেখেছেন দীর্ঘদিন সঞ্চিত অভিজ্ঞতার এই ভা-ার। ভীষণ আবেগী মন তাঁর। বইয়ের প্রতিটি শব্দে-লাইনে এর অনুরণন। এক দেশ ছাড়া তরুণের মনের এই আক্ষেপ তীব্র বেদনাবোধ দ্বারা তাড়িত হয়ে উঠে এসেছে বিভিন্ন অধ্যায়ে। লেখক শুধু পর্যবেক্ষক নন, তিনি একজন শিল্পীও; শব্দশিল্পী। তাই বর্ণনার প্রতিটি বাঁকে শিল্পের সুষমা। কষ্টের কথা দিয়ে তিনি কান্নার ঝর্ণা বানিয়েছেন, বিদ্রোহের কাহিনিগুলোকে অবলীলায় বারুদের স্তূপে রেখে দিয়ে তুলে এনেছেন অগ্নিবীণার ঝংকার, বিষাদসিন্ধুর গভীর থেকে কুড়িয়ে এনেছেন সর্বহারাদের বেদনাকাব্য। যেকোন অধ্যায় পড়লেÑ এ যে ইতিহাস বা স্মৃতিচারণÑএ বোধ আসবে না পাঠকের। শব্দবিন্যাসের সাথে এক দক্ষ লেখকের সুনিপুণ বর্ণনার গল্পকথার মধ্য দিয়ে পাঠক এগিয়ে যাবেন। সুতরাং এই বইটি নিছক ইতিহাস, স্মৃতিচারণ নয় বরং সাহিত্য মানে উত্তীর্ণ এক অনবদ্য ইতিকথা।
দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি প্রসঙ্গে লেখকের নিজ গ্রামের অভিজ্ঞতার যে আক্ষেপ-বিষাদ তার বর্ণনা এমনÑ‘আজ আর রাতের সংবাদ শোনার জন্য অপেক্ষা না করে চোখে মুখে বিষাদের কালোছায়া মেখে সবাই যার যার বাড়ি চলে গেছে, দেশত্যাগের প্রস্তুতি নিতে। গ্রামের অধিকাংশ লোকজনই গরিব, প্রান্তিক চাষী। দৈন্যদগ্ধ জীবন। সহায় সম্পদ বলতে খানিক কৃষিজমি,বসতবাড়ি, গবাদিপশু, বাঁশঝাড়, গাছপালা, তৈজসপত্র, সংসারের খুঁটিনাটি। তা যত সামান্যই হোক অনেক কালের জমানো, অনেক কষ্টের অর্জন, হয়তো বাপ ঠাকুরদা’র কত স্মৃতি লেপ্টে আছে এইসবে। কারো ক্ষেতে বৈশাখের কাঁচা-পাকা ধান। কারো গোলায় অগ্রহায়নের কিছু ধান মজুদ। দু’চারদিন খাবারের মতো চাল-ডাল, নগদ টাকা পয়সা যদি থাকে সঙ্গে নিতে হবে। কারো টিন থাকলে তা নিতে পারলে ভালো হয়, সঙ্গে বাঁশের খুঁটি। বালাটে শিবির তৈরি শুরু হলেও তাৎক্ষণিক তা পাওয়া যাবে না। অন্তত মাথাগোঁজার একটা ঠাঁই তো তৈরি করা যাবে।’ (পৃষ্ঠা-২৭)। কিন্তু আসলেই কি শরণার্থীরা সবকিছু ছেড়েছুড়ে অল্পকিছু নিয়ে জান বাঁচাতে দেশ ছাড়তে পেরেছিলো? বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এর উত্তরÑনা। কোন রকমে জীবন নিয়ে যেতে পেরেছে তাঁরা। অনেকেই মরেছে পথে। বরং এমন সকরুণ উপাখ্যানই বেশিÑ‘আসার পথে সন্তান প্রসব করেন তিনি। তাও জঙ্গলে। এ পরিস্থিতিতে অসহায় স্বামী সাহায্যের আশায় রাস্তায় উঠে এলে টহলরত পাঞ্জাবির বুলেট ঝাঁজরা করে দেয় সাহায্যপ্রত্যাশী সদ্য পিতৃত্ব অর্জনকারী লোকটির দেহ। মৃত স্বামীকে রাস্তার পাশে রেখেই অন্য শরণার্থীদের সহায়তায় নবজাতককে নিয়ে এই ক্যাম্পে এসে ঠাঁই নেন এই হতভাগিনী মা।’ (পৃষ্ঠা-৫৯)। সরকারি হিসাবে ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী নিবন্ধিত ৯৮ লাখ নিরানব্বই হাজার ৩০৫ শরণার্থীর এমন সকরুণ ত্যাগগাঁথা ছাড়া আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস পূর্ণতা পেতে পারে কি?
এরকম বিষন্নতার গল্প বই জুরে। উদাহরণ দিতে গেলে পুরো বইটিই উদ্ধৃতি চিহ্নের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এর চাইতে ঢের ভালো এড়িয়ে যাওয়া। সনিষ্ট পাঠকদের নিকট অনুরোধÑ পড়–ন বইটি। যাদের রয়েছে শরণার্থী জীবনের জীবন-অভিজ্ঞতা; যারা শুনেছেন বাবা-মা-চাচা-চাচীর কাছে, দাদা-নানার কুলে বসে ভয়ে শিহরিত হয়েছেন যেসব বালক ও তরুণ, তারা পেয়ে যাবেন চেনা এক কষ্ট সাগরের উপাখ্যান। নিজের জানা কাহিনি-পরিবেশ-দুর্ভোগ-যন্ত্রণার সাথে একাত্ম হতে হতে চলে যাবেন কুশলী ঔপনাস্যিকের হাতে রচিত এক মহাকাব্যিক বিষাদসিন্ধুর করুণ রসে। যারা সুনীল গঙ্গোপধ্যায়ের ট্রিলজির ‘পূর্ব-পশ্চিম’ পড়েছেন তারা আরেক অনুপম ঐতিহাসিক সাহিত্যসৃষ্টির স্বাদে আপ্লুত হবেন নিঃসন্দেহে।
লেখক যেমন দেশ ছাড়ার সময়ে তার প্রিয় গল্পখুড়ো, গ্রামের শ্মশানে স্বামীর চিতায় নিজের দেহ না পুড়ানোর আক্ষেপে বিলাপরত বিধবা, খাঁচা থেকে ময়না পাখিকে মুক্ত করে যাওয়া গ্রামুড়ে বন্ধু, চুড়ি বদলানো বান্ধবীর দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ায় বিষাদের হতাশায় ডুবেছিলেন, দেশ স্বাধীনের পর তাদের একেবারে হারিয়ে যাওয়ায় একই বিষাদের পৌনপুনিক আঘাতে বিক্ষত হয়েছেন। ত্রাপরেও ‘বাড়ির টানে পাগলপাড়া মানুষ অপেক্ষায় থাকছে না। হাওরের বাঁধ ধরে, জমির আল দিয়ে, মেঠোপথে, নদীর তীরে তীরে, বিধ্বস্থ জনপদ মাড়িয়ে, আগুনে পুড়া গ্রাম পেরিয়ে সারি সারি মানুষ ফিরে আসছে। ঘর নেই, খাদ্য নেই, হালের বলদ নেই, কৃষি উপকরণ নেই। ফিরছে শূন্যভিটায়।’ (পৃষ্ঠা-২০৯)। এই নিজের ইচ্ছায় নিজের দেশে ফিরে আসার নামই স্বাধীনতা। দেশ ছাড়া কোটি বাঙালির দেশে ফেরার অদম্য বাসনার নামই বাংলাদেশ। যারা ফিরেছে তারা কি এখন স্বস্তিতেই রয়েছে স্বাধীন দেশটিতে? লেখক এর উত্তর খোঁজেন নি। তাঁর এ দায়ও নেই। এটি খুঁজছেন নানাজন নানা পথে। খুঁজতে খুঁজতে পরিসংখ্যানের রেখচিত্র শূন্যে মিলিয়ে গেলে সেই খোঁজার অবসান হবে কি না কে জানে।
লেখক শরণার্থী’৭১ বইয়ে শরণার্থী জীবনকে উপজীব্য করে মূলত পুরো একাত্তর কাহিনিকে দেখার চেষ্টা করেছেন। পাঠককে নিয়ে যেতে চেয়েছেন ঘটনার গভীরে, রাজনৈতিক উৎসে। তথ্য দিতে চেয়েছেন শেকড়ের। মুজিবনগর সরকার, শরণার্থী ব্যবস্থাপনা, যুদ্ধ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গিÑ এমনসব বিষয়ের শিকড় অনুসন্ধানের পাশাপাশি তিনি সমকালীন পশ্চিবঙ্গের রাজনীতির টানাপোড়েন নিয়ে এসেছেন নিজের বিশ্লেষণী দক্ষতায়। একাত্তরের কলকাতায়-পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম-শহরে নকশাল রাজনীতির যে প্রবল প্রভাব তা এড়িয়ে যেতে পারেন নি তিনি। এড়িয়ে যাবেন কীভাবে? পূর্বাংশে জাতীয়তাবাদী চেতনার আলোকে যে স্বাধীনতার যুদ্ধ, পশ্চিমাংশে একই সময়ে চলা আন্তর্জাতিকতাবাদী চেতনার নকশাল আন্দোলনের যে দুই ভিন্ন চেহারা-চরিত্র ও দর্শন তা উপেক্ষণীয় নয় বরং প্রবলভাবে সম্পর্কিত। এসংক্রান্ত আলোচনার ইতি ঘটে নি এখনও। তবে নকশাল আন্দোলনের তাত্ত্বিক ভ্রান্তি সত্বেও হাজার হাজার মেধাবীর সীমাহীন আত্মত্যাগ আর নির্যাতন-নিপীড়নের কাহিনি যেন পূর্বাংশে-পশ্চিমাংশে একই রকম। একই রঙেরÑ লাল; রক্তরঞ্জিত। এ বিষয়ে স্বাধীনতাপ্রত্যাশী যুদ্ধরত একটি দেশের কোন এক তরুণ নিজের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে হয়তো নকশালীদের প্রতি বিরূপ ধারণা পোষণ করতেই পারেন, তিনি এদের প্রতি সহানুভূতি নাই দেখাতে পারেন। কিন্তু ত্যাগের ইতিহাসে ভুলপথে জীবনখোয়ানো নকশালীদের সুগভীর মানবমুক্তির ব্রত ইতিহাসের কোন এক বাঁকে সঠিক পথের দিশা খুঁজে পাবেই।
সুখেন্দু সেন’র শরণার্থী’৭১ বইটি আগেই বলেছি, আমার বিবেচনায় এক অনুপম সাহিত্য সৃষ্টি। শব্দপ্রয়োগে, বাক্যগঠন, আবেগ তৈরি, বর্ণনার কুশলতা, উপমার সৌন্দর্য, চিত্রকল্পের বিস্তৃতি সবকিছু মিলিয়েই এ এক সাহিত্য। জীবনের সাহিত্য। শরণার্থীকথা জানার পাশাপাশি এই অনুপম সাহিত্যসৃষ্টি পাঠ করা উচিৎ ইতিহাস-উৎসুখদের। অবশ্যই একাত্তর পরবর্তী প্রজন্মের সকলের। বইটির বহুল প্রচার কাম্য।


