দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সৌম্য চৌধুরীর মৃত্যু আত্মহত্যা নাকি অন্য কারণে সেটি তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে মৃত্যুর একদিন আগে তিনি নিজের ফেসবুক আইডি থেকে দেয়া এক পোস্টে এলাকার কিছু সুদখোরের নাম উল্লেখ করে চরমভাবে অতীষ্ট হওয়ার কথা উল্লেখ করেছিলেন। ওই পোস্টে তিনি নিজের করুণ পরিণতি সম্পর্কে কিছু ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন। এই পোস্ট দেয়ার পরদিন অর্থাৎ গত শনিবার ৩ জুন কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল সড়কের ফুলবাড়িয়া এলাকা থেকে অসুস্থ অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয় এবং ওই রাতেই মৌলবীবাজার হাসপাতালে তাঁর মত্যু ঘটে। তাঁর স্ত্রী গণমাধ্যমকে বলেছেন, এলাকার হবু নামের এক সুদখোরের কাছ থেকে সৌম্য চৌধুরী ৪ লাখ টাকা সুদে ঋণ নিয়েছিলেন। এই টাকার বিপরীতে ৫ লাখ টাকা পরিশোধের পরও সুদখোর হবু আরও ২৯ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে দাবি করে আদালতে চেক ডিজঅনার মামলা করেছেন। সৌম্য চৌধুরীর ফেসবুক পোস্ট, তাঁর স্ত্রীর বক্তব্য ও সংবাদে প্রকাশিত অন্য ব্যক্তিদের বক্তব্য থেকে এ কথা বেশ বুঝা যায় যে, সুদে নেয়া এই ঋণের টাকা নিয়ে তিনি বেশ দুশ্চিন্তায় ছিলেন। এই দুশ্চিন্তা তার উপর প্রবল মানসিক চাপ তৈরি করে। এই অনাহুত মৃত্যুর পিছনে তাই এ ঘটনার প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা নিশ্চয়ই ঘটনার নানাদিক তদন্ত করে এই মৃত্যুর সঠিক কারণ অনুসন্ধান করবেন বলে আমরা আশা রাখি।
আমাদের সমাজে এই সুদখোর মহাজনদের নিপীড়নের ভয়াবহতা সুবিদিত। সুদখোরদের কারণে এর আগেও তাহিরপুরের পাতারগাঁও গ্রামের ফয়সল আহমদ সৌরভ নামের এক ব্যক্তি অনাকক্সিক্ষত আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন। সৌরভও নিজের ফেসবুকে সুদখোরের যন্ত্রণায় জীবন বিষিয়ে উঠার কথা উল্লেখ করে রেখেছিলেন। সৌরভের আত্মহত্যার পিছনে অনুঘটক হিসাবে জড়িত সুদখোর কোনো বিচারের সম্মুখীন হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। অর্থাৎ এরূপক্ষেত্রে অত্যাচারী সুদখোরদের কোনো ধরনের আইনি প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয় না। এতে সমাজে সুদখোরদের দাপুটে অবস্থার কথা বেশ বুঝা যায়। সৌম্য চৌধুরীর মৃত্যুর পিছনে যে সুদখোরের অমানবিক নিপীড়ন দায়ী বলে এখন দাবি উঠেছে আমরা জানি না সেও একইভাবে দায়মুক্তি পেয়ে নিজের সুদের রাজত্ব চালিয়ে যেতে পারবে কিনা। তবে একটি কথা বলা যায়, সেটি হলো আমাদের সমাজ বাস্তবতা আজ চরমভাবে অমানবিক, লোভী, নিপীড়ক ও ক্রোড় চরিত্র ধারণ করেছে। এই বাস্তবতায় সুদখোররাই প্রভাবশালী ও পৃষ্ঠপোষকতা ধন্য থাকে। তাদের টিকিটি ধরার জো কারও নেই। তাদের জালে একবার যে বন্দি হয়েছে সে হয় সর্বস্বান্ত হবে নতুবা অসহায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে জীবনের যন্ত্রণা মোচন করে পরিবার পরিজনদের অকুল দুঃখসাগরে ভাসিয়ে যাবে।
সৌম্য চৌধুরীর মৃত্যুর ঘটনাটি আমাদের দারুণভাবে ব্যথিত করেছে। আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে প্রতিনিয়ত উন্নয়নের গালভরা শ্লোগান তোলা এ কোন্ বিভ্রান্ত সময়ে আমাদের বসবাস। এই ধরেেনর একটি সমাজ বাস্তবতাই কি আমরা আশা করেছিলোম ১৯৭১ সনে, যখন জীবন বাজি রেখে আমাদের সাহসী পূর্বপুরুষেরা যুদ্ধে নেমেছিলেন? সৌম্য চৌধুরী বা কুসীদজীবীদের প্রবল দাপটের কাছে অসহায়ভাবে নিপীড়নের শিকার সৌম্য ও তাঁর মতো অন্য ব্যক্তিরা জীবন দিয়ে এই কঠিন প্রশ্নের সামনে সকলকে দাঁড় করিয়ে গেছেন। এর জবাব আমাদের জানা নেই। এই অত্যাচারীদের রক্তলোলুপ লোভের রাজ্যে এক চিলতে দাগ কাটতে প্রচলিত ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠান কি একটুও এগিয়ে আসবে না। নাকি সৌম্য চৌধুরীর স্ত্রী সন্তানদের অসহায় ক্রন্দন কেবল একটি পরিবারের সর্বস্ব হরণের বেদনাভার হয়েই একসময় সকলের স্মৃতি থেকে বিস্মৃত হয়ে যাবে? আমরা জানি না। এর কিছুই জানা নেই আমাদের।


