সুদের বিরুদ্ধে সোচ্চার দিরাইবাসী

বিশেষ প্রতিনিধি
সুদখোরদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন দিরাইবাসী। শনিবার রাতে সুদের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে মৃত্যুবরণকারী দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যানের মর্মস্পর্শি মৃত্যুর ঘটনায় এলাকার বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ঐক্যবদ্ধভাবে তিনদিনের প্রতিবাদী কর্মসূচী দিয়েছে। তিনদিনই দিরাই থানা পয়েন্টে মানববন্ধন করবেন তারা। এদিকে, পুলিশ সুপার সোমবার বিকালে বলেছেন, যেহেতু মৃত্যুর আগে নিজের ফেসবুক আইডিতে স্ট্যটাস দিয়ে মারা গেছেন সৌম্য চৌধুরী, পুলিশকে এ ব্যাপারে বিশদ খোঁজ খবর নিতে বলা হয়েছে।
সৌম্য চৌধুরী’র অকাল মৃত্যুতে এবং মৃত্যুর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত এবং দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি একইসঙ্গে দিরাইয়ের ব্যাপরোয়া সুদের ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার দাবিতে মঙ্গলবার বিকালে দিরাই থানা পয়েন্টে মানববন্ধন করবে বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থা দিরাই শাখা। পরদিন বুধবার একইস্থানে এই দাবিতে মানববন্ধন করবে ভাটি বাংলা উন্নয়ন সংস্থা। বৃহস্পতিবার মানববন্ধন করবে দিশারী সমাজ সচেতন ও অবক্ষয়রোধ যুব সংঘ।
বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থা দিরাই শাখার সভাপতি শাজাহান সিরাজ বললেন, দিরাইয়ে সুদখোররা সক্রিয়। এরা সম্পদশালী, নিরীহ, সম্মানী ব্যক্তিদের টার্গেট করে চড়া সুদে টাকা বিনিয়োগ করে। এক পর্যায়ে সম্পদ, ভিটেমাটি ছাড়া হন ঋণ গ্রহিতা। দিরাইয়ে অনেক ভদ্রলোক এরকম নিঃস্ব হয়েছে। সৌম্য চৌধুরীর ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটেছে।
দিশারী সমাজ সচেতন ও অবক্ষয়রোধ যুব সংঘের সভাপতি রুখন উদ্দিন জহুরি বললেন, সৌম্য চৌধুরী’র কাছ থেকে অসুস্থ্য অবস্থায় চেক নিয়ে, তাকে বিপদে ফেলা হয়েছে। তিনি বলেন, সৌম্য চৌধুরী’র স্বজনদের আহাজারীতে রাজানগরের বাতাস ভারী হলেও সুদখোর সি-িকেটের বিরুদ্ধে প্রভাবশালীরা কথা বলতে চান না।
দিরাইয়ের বিশিষ্ট সমাজকর্মী মুছলেহ উদ্দিন বললেন, দিরাইয়ে সুদখোররা বেপরোয়া হয়ে গেছে। ১০-১৫ বছর আগেও যারা বিভিন্ন বাড়িতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করেছে, এরা এখন টাকার জোরে ভিআইপি। কৌশলে সৌম্য চৌধুরী’র মত নিরীহ, সম্পদশালী, শিক্ষিত ভদ্রলোককে বড় অংকের ঋণ দেয় এরা। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে টার্গেট করে তারা। একপর্যায়ে সকল সম্পদ হাতিয়ে নিয়ে পথে বসায় টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে। দিরাইয়ে এমন অনেক উদাহরণ আছে। এদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। প্রশাসনকেও সক্রিয় হতে হবে।
দিরাই উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাড. রিপা সিনহা বললেন, সুদখোরদের যন্ত্রণায় যে সৌম্য চৌধুরী মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়েছেন- এটি তার ফেইসবুক স্ট্যটাসেই প্রতিয়মান হয়। বিষয়টি নিয়ে সকলে সোচ্চার হওয়া জরুরি।
প্রসঙ্গত. দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সৌম্য চৌধুরী ২০২১ সাল থেকে সুদখোরদের যন্ত্রণায় পলাতক ছিলেন।
তার স্ত্রী ইলা চৌধুরী জানান, তার স্বামী হবিবুর রহমান হবির কাছ থেকে কাছ থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা নিয়ে পাঁচলাখ টাকা দেবার পরও তারা ২৯ লাখ টাকা পাওনার মামলা করেছে। ২০২১ সালের পর থেকে সে বাড়ীতে থাকতে পারে না। দিরাইয়ে যেতে পারে না। তাকে পুলিশ খুঁজে বেড়ায়। এরপর তিনি এখানে-ওখানে থেকে জীবন যাপন করতেন। পাঁচ বছর চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় নিজের সম্পদ বিক্রয় করে মানুষের কাজ করেছেন। চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় তাদে মদ খাইয়ে সুদখোররা চেকে স্টাম্পেসহ নানা কাগজে সই নিয়েছে। হবুর (হবিবুর রহমান) টাকা আমার স্বামী দিরাই পৌরসভার সাবেক মেয়র মোশারফ মিয়াকে নিয়ে পরিশোধ করেছেন। এরপরও তাদের মামলায় পলাতক অবস্থায় আমার স্বামী হোটেলে হোটেলে কাটিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে সিলেটের ইসকনের হোটেলে খেয়ে তালতলার একটি আবাসিক হোটেলে (হোটেল শাহ্বান) ফিরে রাত ১১ টায় আমাকে ফোন দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, এখানেও নাকি পুলিশ আসবে, এতো রাতে কোথায় যাব। আমি ছাড়া তোমার কেউ নাই, আমি নিজে নিজে স্যালেন্ডার করবো, আমাকে এসে দেখে যেও।’ ইলা চৌধুরী বললেন, আমার স্বামীর এই অবস্থার জন্য যারা দায়ী, সেসব সুদখোরদের বিরুদ্ধে মামলা করবো আমি। আমার স্বামীর মোবাইল ট্যাকিং করলেই কারা কিভাবে তাকে সুদের টাকার জন্য নির্যাতন করেছে, বেরিয়ে আসবে।
হবিগঞ্জের বাসিন্দা ব্যারিস্টার সুমন বললেন, অনুমোদনহীন সুদখোরদের বিরুদ্ধে আমার দায়ের করা রীটে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা আছে। দেশের সকল থানায় আদালতের নির্দেশনা দেওয়া আছে। থানা পুলিশ সেভাবে ব্যবস্থা নিতে পারে।
উল্লেখ্য, শনিবার গভীর রাতে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল রোডের ফূলবাড়িয়া এলাকার সড়কের পাশে থেকে পুলিশ সৌম্য চৌধুরীকে অনেকটা অচেতন উদ্ধার করেছিল। রাতেই মৌলভীবাজার হাসপাতালে মারা যান তিনি।
মৃত্যুর আগের দিন তিনি তার নিজের ফেসবুক আইডিতে দিরাইয়ে কিছু মানুষের নামোল্লেখ করে লিখেছেন,‘ সুদখোরদের যন্ত্রণায় এই পথ বেছে নিলাম আমি।’ রোববার রাজানগর গ্রামের শ্মশানঘাটে সৌম্য চৌধুরী শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়
সৌম্য চৌধুরী ফেসবুক আইডিতে লিখেছিলেন ‘আমার এমন পরিণতির জন্য দায়ী দিরাইয়ের হবিবুর রহমান এবং জসিম উদ্দিন, হবিবুরের কাছ থেকে আমি টাকা এনেছিলাম। তা সুদ করেছি দিরাই পৌরসভার সাবেক মেয়র মোশারফ মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে। এরপর আমি অসুস্থ্য হয়ে পড়ি, সুস্থ্য হয়ে জানতে পারি, ওদের টাকার জন্য আমার উপর মামলা হয়ে গেছে। ওদের টাকার জন্য আমি পথে বসেছি। হবিবুর একজন নিচু সুদখুর। সুদের টাকায় দিরাইয়ে তিনটি বাড়ী করেছে সে।’
জসিম উদ্দিন নামে আরেকজনের নামোল্লেখ করে তিনি বলেন, সে ২৯ লাখ টাকা কোথা থেকে পেলো, আমার কাছে সে এতো টাকা পায়, তার টাকার উৎস্য কী, তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে।
তিনি এই দুই সুদখোরসহ দিরাই কলেজের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সজল দাস, অসিত দেব নাথ, চিনি ঠাকুর ও পুতুল দাসের নামোল্লেখ করে লিখেন, ওরা সুদের ব্যবসা করে মানুষ বিপদে পড়লে শতকরা ১০ টাকা হারে সুদে টাকা লাগায়। তিনি ওদের বিচারও দাবি করে লিখেন-‘বিদায়’
হবিবুর রহমান হবিব অবশ্য রোববার স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীদের বলেছেন, তিনি মামলা করেন নি মামলা করেছে জসিম উদ্দিন।
জসিম উদ্দিন রোববার স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীদের বলেছেন, আমার চার লাখ টাকা পাওনা ছিল, বাকী টাকা হবুর (হবিবুর রহমান হবির) ছিল, স্থানীয় নেতাদের উপস্থিতিতে ২৯ লাখ টাকায় সমাধানের সুরাহা হওয়ায় সৌম্য চৌধুরী’র কাছ থেকে চেক নেওয়া হয়েছিল।
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ এহসান শাহ্ বললেন, সৌম্য চৌধুরী’র মৃত্যু এবং আগের দিন তার নিজের ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসের বিষয়টি পুলিশের নজরে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এই বিষয়ে বিশদ খোঁজ খবর নেবার জন্য। সবকিছু পর্যালোচনা ও তদন্ত করে এই বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেবার ভিত্তি থাকলে পুলিশ সেভাবেই ব্যবস্থা নেবে। আমি যেটুকু জানি সৌম্য চৌধুরী’র মরদেহের ময়না তদন্তও সম্পন্ন হয়েছে।
সৌম্য চৌধুরী’র ভাতিজা ধ্রুবজ্যোতি চৌধুরী বললেন, আমার কাকার এমন অমানবিক মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে সকল স্বজনই কষ্টে আছেন। ধর্মীয় আচার চলবে মঙ্গলবার পর্যন্ত। এরপর পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে এগুবো আমরা।