সুনামগঞ্জের অত্যাবশ্যকীয় নদী খনন (১ম ধাপ)

অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার
সুনামগঞ্জের নদীকে শুধু সুনামগঞ্জের প্রবাহমান জলধারা বললে ঠিক হবে না। সিলেট থেকে পশ্চিমে নেত্রকোণার দুর্গাপুর পর্যন্ত সুদূর অতীতে পাহাড় ঘেষা যে প্রশস্থ সাগরমুখ ছিলো এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর অবধি প্রবাহিত জল¯্রােতের চিহ্ন এখনও বর্তমান তাকে গোটা ভাটি এলাকার অন্তরাত্মা বলাই সমীচিন হবে। কেননা সুনামগঞ্জ পাহাড় সংলগ্ন জেলা বিধায় সাগরমুখী পানি সুনামগঞ্জ থেকেই দক্ষিণমুখী প্রবাহিত হয়ে নানাভাবে নানাপথে সাগরে পতিত হয়। তাই সুনামগঞ্জের নদীগুলি ও ‘ধেনু-মেঘনা’র প্রবাহটাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে ভাটির পানি-প্রবাহ তথা ফসলের একমাত্র বিপদ ‘উবধি পানির তা-ব’ অনেকটাই আয়ত্তে আনা যাবে। সুনামগঞ্জের নদীগুলির সুদীর্ঘ সময়ের পলি ভরাট ও অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এলোমেলো করে দিয়েছে। এমন দু’তিনটি নদীর প্রবাহ ও পানি ধারন ক্ষমতা বদলে দিতে পারলেই ভবিষ্যৎ দু:সাধ্য কাজটা অনেক সহজ করে দেবে। তবে বিশেষজ্ঞ মহল ও স্থানীয় অভিজ্ঞ মতামত এক করতে পারাই কঠিন কাজ। অবশ্য মনে রাখতে হবে প্রকৃতির দানকে জীবন উপযোগী করতে প্রতি নিয়তই ভুল বা দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হওয়া স্বাভাবিক, তাতে ভুল বুঝাবুঝির বিষয়টিকে বড় করে দেখা যাবে না। তবু আমি আমার মতামত উপস্থাপন করছিÑÑÑবর্তমানে শুধু সুনামগঞ্জে আবদ্ধ ও প্রবাহিত নদী মিলে ‘সুনানগঞ্জ জেলা ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সম্ভাবনা’ বইয়ে ‘জেলার নদ-নদী’ পরিচ্ছেদে স্থান পায় নাই ‘গোমাই’ (মধ্যনগর থেকে দক্ষিণে কামাউড়া-বনগাঁও), ‘মনাঈ’ (সুনই-বেখইজোড়া থেকে মজলিশপুর হয়ে বরই-বাখরপুর) এমন দু’টি নদীসহ মোট অভ্যন্তরীণ ৩২ টি নদী। এই নদীগুলির ¯্রােত দক্ষিণে প্রবাহিত হবার ‘ধেনু-মেঘনা’সহ খনন কাজ তিনটি ধাপে একটু দীর্ঘ সময় নিয়ে সম্পন্ন করলে স্থানীয় চলমান কৃষি-অর্থনীতি সচল থাকবে, দূর অতীতের ফেলে আসা কাজের অনেকটা পূরণ হবে এবং ভবিষ্যৎ সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে ভাটির বোরো ফসলকে দেশের অর্থনীতিতে যুগান্তকারী সম্ভাবনা সৃষ্টি করা যাবে।
প্রথম ধাপে (১) ‘পইন্দা’ নদীর মুখ থেকে ১০ কি:মি: খনন, এবং দক্ষিণে পুরান সুরমা, কালনী, কুশিয়ারায় গভীরতা বুঝে মোট ৩০ কি:মি: (২) জামালগঞ্জ-ধরমপাশার সুকদেবপুরের সুরমা-সুমেশ^রীর মোহনায় তিন দিকে ৩০ কি:মি: খনন (৩) মধ্যনগর থেকে যাত্রাবাড়ি পর্যন্ত ‘গোমাই’ নদী ১২.৫ কি:মি: খনন করলে এখনই ফসলহানির ঝুঁকি অনেকটা কমবে। অন্তত ‘উবধি পানি’ দেখা দিলেই বা বাঁধের কাছে পানি ভীড় করার প্রাক্কালেই যদি দক্ষিণে ‘ধেনু নদী’র দিকে প্রবাহিত হবার সুযোগ করে দেওয়া যায় তাহলে বাঁধ রক্ষার এত দুশ্চিন্তা করতে হবে না আদিতেও করতে হয় নাই। আর প্রথম ধাপের খননে সুনামগঞ্জের দক্ষিণে উল্লিখিত তিনটি আবদ্ধ স্থানের মুখ গভীর করে দিলে সুফল আসবেই। বর্তমানে জেলার ভিতরে এক নাগারে খনন করে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে তা তেমন দরকার ছিলো না, পরবর্তীর উন্নততর খননের সময় তা করলেই হতো। দ্বিতীয় তৃতীয় ধাপে সুনামগঞ্জের অভ্যন্তরীণ ও দক্ষিণে প্রবাহিত ‘ধেনু-মেঘনা’য় বৃহত্তর খনন কাজ সম্পন্ন করতে পারলে সুনামগঞ্জ তথা ভাটি এলাকা ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ বছরের জন্য নিরাপদ হবে।
ব্রিটিশ-ভারতে কোলকাতা থেকে কুশিয়ারা বেয়ে শিলচর জাহাজ লাইন ছিলো। মাঝে জাহাজ জংশন মার্কুলি থেকে কালনী নদী বেয়ে পইন্দ্যা গ্রামের পাশ দিয়ে মূল সুরমায় এ লাইনের একটি জাহাজ ‘৫২ সন পর্যন্ত এ রুটের শেষ ঘাট ছাতক অবধি যেত। ‘৫৪ সন পর্যন্ত সুরমা কিছুটা গভীর থাকায় আরও দু’বছর জাহাজ আসতে পেরেছে পরবর্তীতে নদীর কাম্য গভীরতা কমে যাওয়ায় জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তখনকার নদীর গভীরতায়ও ১৯৬০ খ্রি : (১৩৬৭ বঙ্গাব্দে) ফেব্রুয়ারিতে (ফাল্গুন মাসে) বড় অকাল বন্যা হয়েছিল। এ নিয়ে গ্রামে গান সৃষ্টি হয়েছিলÑÑ‘সর্বনাশা সাষট্টি বাংলায়, বোরো জমিন তল করিল দারুণ বন্যায়’। এ বন্যায়ও ফসল নষ্ট করেছিল কিন্ত ব্যাপক হারে হাওর ডুবে নাই। অবশ্য তখন হাওরে বাঁধ দেওয়ায় সরকারি কোন তদারকি ছিলো না কৃষকের নিজস্ব চেষ্টায় হাওর রক্ষা করেছিলো। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝিতে সুনামগঞ্জে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়া থেকেই নদী ভরাট হওয়ার আলামত পাওয়া যায়। এই প্রক্রিয়ায় ভরাট হতে হতে ২০১৭ খ্রি: যে ভয়ালরূপ দেখা দিয়েছে, তা নিজের গায়ে খানিক দোষ না নিয়ে শুধু প্রকৃতিকে দোষ দেওয়া সঠিক হবে বলে মনে করি না। বৈশাখী ‘উবধি পানি’র কথা যে বলা হয় তা নানা প্রকারের নানা প্রকৃতির। কোন বছর বাংলাদেশের সীমানায় বৃষ্টি নেই শুধু পাহাড়ে বৃষ্টি তাতেই নদী উছৃংখল হয়ে যায়। কোন বছর সিলেটের পাহাড়ে বৃষ্টি তো সুরমা-কুশিয়ারা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। কোন বছর পশ্চিমের পাহাড়ে বৃষ্টি তো কংশ-ব্রহ্মপুত্র বাঁধনহারা। কোন বছর পাহাড়েও বৃষ্টি সমতলেও বৃষ্টি যা এ বছর হয়েছিলো। আবার ‘৬৭ সনে সমতলে কোন বৃষ্টি ছিলো না খরা-শুকনা দিন কিন্তু নদীর রূপ ছিলো রুদ্রমূর্তি তবু তখন কৃষক ফসল রক্ষা করেছিলো, তার কারণ ছিলো নদীর ধারন ক্ষমতা ছিলো ব্যাপক।
স্বাধীনতা পূর্ব কালেও যেকোন কারণে এই ‘উবধি পানি’ যখন হাওরে ঠেলা দিতো সুনামগঞ্জের উত্তর-পূর্ব থেকে সুরমা নদীর পানি পইন্দ্যা নদী দিয়ে কালনী হয়ে কুশিয়ারা ও পরে ধেনুতে পড়ে মেঘনায় চলে যেতো। বাকি উবৃত্ত পানি সাচনার দিকে ঠেঙ্গাখালি বেয়ে সুমেশ^রীর পানির সঙ্গে মিশে সুকদেব হয়ে ধেনুতে চলে যেতো। ওপরদিকে পশ্চিমে কলমাকান্দা থেকে আসা সুমেশ^রীর পানি ‘গোমাই’ নদী বেয়ে কামাউড়া-বনগাঁও হয়ে যাত্রাবাড়ির কাছে ‘কংশে’র শাখায় পড়ে কিছু ধরমপাশার দিকে বাকি দশদার-ঠাকুরাকোণা হয়ে আটপাড়ার দিকে কংশের অন্য ডালে চলে যেতো। কিন্ত এই (ক) পইন্দ্যা (খ) সুকদেবপুর (গ) যাত্রাবাড়ি’র তিনটি মুখই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনটি এলাকায় পানি জমাট বেঁধে শুধু ফুলতে থাকে আর ঠাঁই না পেয়ে বাঁধ ভেঙ্গে হাওরে ঢুকতে থাকে। তাতে পানির আর দোষ কী ? বর্তমানে ভরাট হওয়া পইন্দ্যা দিয়ে পানি যেয়ে কূল না পেয়ে সুনামগঞ্জের পশ্চিম-দক্ষিণে ‘রক্তি’র প্রবাহের সাথে যোগ হয়ে যথেষ্ট পরিমানে ‘ধেনু’র দিকে যেতে না পারায় খরচা, হালি, পাকনা, ধানকুনিয়া, শনি, মাটিয়াইন, চন্দ্রসোনার থাল ইত্যাদি হাওর ও আরও ছোট কিছু হাওর অরক্ষিত হয়ে যায়। অন্যদিকে সুরমার পানি খানিক ধাক্কা খেয়ে ‘সুখাইড়’র নদী দিয়ে ‘পাটলী’ ও ‘আবুয়া’র পানির সঙ্গে যোগ হয়ে সানবাড়ির কাছে তে-মোহনায় জমতে থাকে।
ওদিকে ‘গোমাই’ দিয়ে পানি সরতে না পেরে ‘লোয়ার সুমেশ^রী’র দিকে সানবাড়ির কাছে ‘পাটলী’-‘সুখাইড়’-‘আবুয়া’ নদীর পানির সাথে যুক্ত হয়ে জয়শ্রী’র দিকে সুমেশ^রী বেয়ে যেতে না পারায় ‘সোনমড়ল’, গোরমা, টগা, কাইলানী, বাইনচাপরা, বড় গোরাডোবা, ছোট গোরাডোবা, বোয়ালা ইত্যাদি হাওরসহ অনেক ছোট হাওর ঝুঁকিতে পড়ে।
(বাকী অংশ আগামীকাল)