বিশেষ প্রতিনিধি
আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আগেভাগেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ) আসনের সম্ভাব্য দুই প্রার্থী প্রভাবশালী রাজনীতিক কয়ছর এম আহমদ ও মাওলানা শাহিনুর পাশা চৌধুরী । যুক্তরাজ্যে নিজেদের মতো করে ক্যাম্পেইনে নেমেছেন তাঁরা। সাবেক সংসদ সদস্য জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী সুনামগঞ্জ জেলা জমিয়তের সভাপতি এবং সাবেক ছাত্রদল নেতা কয়ছর এম আহমদ তারেহ রহমানের ঘনিষ্টজন এবং বর্তমানে যুক্তরাজ্য বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।
গেল প্রায় এক মাস হয় শাহীনুর পাশা যুক্তরাজ্যে আছেন, প্রতিদিনই নিজেদের নির্বাচনী এলাকার জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জের কোন না কোন যুক্তরাজ্য প্রবাসীর বাড়িতে ঘরোয়া বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন তিনি।
শাহীনুর পাশা বললেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসাবেই যুক্তরাজ্যে আসা। এই নির্বাচনই আমার শেষ নির্বাচন, নির্বাচনে আমি দল, জোট বা ব্যক্তি পরিচয়ে অংশ নেবই।
অপরদিকে, যুক্তরাজ্য বিএনপির তিন বারের সাধারণ সম্পাদক যুক্তরাজ্যে বিএনপির জনপ্রিয় নেতা হিসাবে পরিচিত কয়ছর এম আহমদ বলেছেন, নির্বাচনে অংশ নেবার পরিবেশ হলে আমি দেশে আসবো। সুনামগঞ্জ-৩ আসনে আমিই বিএনপির দলীয় প্রার্থী। এই আসনে এর আগে বিএনপি জোটের প্রার্থী হয়েছিলেন মাওলানা শাহীনুর পাশা। তার দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এখন বিএনপি জোটের শরিক নয়। এই আসনের উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে বিএনপি এখন সংগঠিত শক্তি। এলাকায় এবং যুক্তরাজ্যে আমার পক্ষে নেতা কর্মীরা কাজ করছে, নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি হলে এবং বিএনপি নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিলে হাজার খানেক যুক্তরাজ্য প্রবাসী আমার পক্ষে নির্বাচনী এলাকায় কাজ করতে আসবে। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে সুনামগঞ্জ-৩ আসনের প্রার্থী যে আমি, এটিও জানান দিচ্ছেন দলীয় নেতা কর্মীরা।
সম্প্রতি প্রবাসী অধ্যুসিত জগন্নাথপুরের প্রভাবশালী এই দুই রাজনীতিক এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় এসব কথা বলেন।
জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্টজন হিসাবে পরিচিত যুক্তরাজ্য বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম কয়ছর আহমদ। তারেক রহমান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে থাকায় এম কয়ছর আহমদ দেশে না আসলেও বিএনপির সুনামগঞ্জের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ অনেকটা তার কাছেই। জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জের বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বেশির ভাগ দায়িত্বশীল নেতাই তার আশীর্বাদপুষ্ট।
কয়ছর এম আহমদ জগন্নাথপুর পৌর শহরের ছিলিমপুরের বাসিন্দা। ১৯৯৮ সালের ১৫ এপ্রিল আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ও বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতা কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় জগন্নাথপুরের যুবদল নেতা হাফিজুর রহমান গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এই ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলা হলে এম কয়ছর আহমদকেও আসামী করা হয়। এরপর থেকে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতেই সক্রিয় এম কয়ছর আহমদ।
এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আগামী জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কয়ছর বললেন, এই সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। গণতান্ত্রিক পরিবেশ হলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-৩ আসনে জোটের কোন শরীককে আর প্রার্থী নয়, তিনিই বিএনপির মনোয়ন পাবেন জানিয়ে বললেন, সুনামগঞ্জ-৩ আসনে আগের যে কোন সময়ের চেয়ে বিএনপি সংগঠিত ও শক্তিশালী। সংগঠনের প্রত্যেক শাখায় তাঁকে (কয়ছর এম আহমদকে) নিয়ে আলোচনা হয় জানিয়ে কয়ছর বললেন, সকলেই জানে দল আমাকে মূল্যায়ন করবে।
জগন্নাথপুরে বিএনপিতে বিভক্তি আছে, এটি দূর করার উদ্যোগ আছে কি-না জানতে চাইলে, কয়ছর দাবি করলেন, জগন্নাথপুরে দলের উপজেলা সভাপতি আবু হুরায়রা ছাদ মাস্টারের নেতৃত্বে দল ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত। সাবেক সভাপতি আক্তার হোসেন (পৌর মেয়র) এখন আর দলে নেই। দলে কোন বিভাজনও নেই।
শান্তিগঞ্জে দলের সাবেক সভাপতি ফারুক আহমদ এখনো বহিস্কৃত হিসাবেই আছেন মন্তব্য করে এম কয়ছর আহমদ বললেন, তিনি জনপ্রিয় মানুষ, দলে ফেরার চেষ্টা করছেন। শান্তিগঞ্জেও দল শক্তিশালী হয়েছে বলে দাবি তাঁর।
এদিকে, এই আসনে এক সময় (২০০৫ সালের ২০ জুনের উপ-নির্বাচনে) বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে নির্বাচিত সাবেক এমপি মাওলানা শাহীনুর পাশাও প্রায় এক মাস হয় যুক্তরাজ্যে অবস্থান করে আগে ভাগেই জাতীয় নির্বাচনের ক্যাম্পেইন শুরু করেছেন।
শাহীনুর পাশা বললেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন আমার শেষ নির্বাচন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের জীবিত একমাত্র সাবেক এমপি আমি। দল আওয়ামী লীগ-বিএনপি যে কোন জোটের সঙ্গেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। রাজনীতিতে শেষ কথা নেই। যার সঙ্গেই জোট হোক, আমার আসন নিশ্চিত করেই জোটের আলোচনা হবে। জোট কিংবা দল বা ব্যক্তি যে কোন ব্যানারেই শাহীনুর পাশা নির্বাচন অংশ নেবেন বলে জানালেন।
কয়ছর এম আহমদ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে এই সাবেক সাংসদ বললেন, কয়ছর আহমদের নিজের কেন্দ্র জগন্নাথপুর পৌরসভার ইকরছইয়ে এবং জগন্নাথপুর বিএনপির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান চৌধুরী’র কেন্দ্রে ২০০১ এবং ২০০৫’এর জাতীয় নির্বাচনে ধানের শীষ অনেক কম ভোট পেয়েছে।
তিনি বললেন, আমি জমিয়তের দুই বারের জেলা সভাপতি, আমি দেশে থেকেই আমার জমিয়তকে নির্বাচনী এলাকায় সংগঠিত করছি। কয়ছর আহমদের মতো প্রবাসে থেকে নয়। আমার দল সুনামগঞ্জ-৩ আসনে অনেক সুসংগঠিত, দলে কোন বিভক্তি নেই।
জগন্নাথপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি লুৎফুর রহমান চৌধুরী এই প্রসঙ্গে বললেন, শাহীনুর পাশা যেহেতু বিএনপি জোটে নেই, তার এসব কথার জবাব দেবারও প্রয়োজন মনে করছি না। রাজনীতি যেহেতু করি দলের গুরুত্ব আগে, পরে জোট। বিএনপির ভোট না পেলে শাহীনুর পাশা ২০০৫’এর উপ-নির্বাচনে এমপি হতে পারতেন না। আমার বা কয়ছর আহমদের কেন্দ্রে বিএনপির ভোট কম। এজন্য হয়েেতা এই দুই কেন্দ্রে ভোট কম পেয়েছেন, কিন্তু অন্যান্য কেন্দ্রে আমাদের কর্মীদের জন্যই তার জয় হয়েছে।
জগন্নাথপুর পৌরসভার মেয়র, উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আক্তার হোসেন বললেন, বিএনপিতে এখন আর আমি নেই এটা সত্য, দল আমার সঙ্গে ন্যায় বিচার করে নি। পৌরসভা নির্বাচনে আমি দলের মনোনয়ন চাইনি। তাহলে বিদ্রোহী হিসাবে কেন আমাকে বহিস্কার করা হলো। দল যেহেতু এভাবে আচরণ করলো, আমি দলের কোন কাজে আপাতত যুক্ত হতে চাই না।
প্রসঙ্গত. সুনামগঞ্জ-৩ জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জের বিপুল সংখ্যক ভোটার যুক্তরাজ্য প্রবাসী। স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে নিয়ামক শক্তি হিসাবে কাজ করেন এসব ভোটাররা।
এই আসনের জনপ্রিয় রাজনীতিক ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট প্রার্থী মোহাম্মদ আবদুল মান্নান (এমএ মান্নান) ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৫৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী জমিয়ত উলামায়ে ইসলামের নেতা শাহীনুর পাশা ওই সময় ৫৬ হাজার ৭৬৫ ভোট পান। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোহাম্মদ আবদুল মান্নান ৫০ হাজার ৪৩৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। গেল জাতীয় নির্বাচনেও শাহীনুর পাশাকে হারিয়ে বিপূল ভোটের ব্যবধানে আব্দুল মান্নান এখানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বর্তমানে সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রী আব্দুল মান্নান।


