সুমতির মুখে সেফটিপিন : নাট্যকার ও দর্শকের যৌথ নির্মিতি

ইকবাল কাগজী
গতকালের (বৃহস্পতিবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭) ‘দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর’-য়ের শেষ পাতায় একটি প্রতিবেদন ছিল নাটক মঞ্চায়নের। প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল, “-‘অপশক্তি’ মঞ্চস্থ”। বুধবার সন্ধ্যায় জেলা শিল্পকলা একাডেমির  হাসন রাজা মিলনায়তনে নাটকটি সঞ্চস্থ হয়। দুই শব্দের ছোট্ট শিরোনামটি পড়তে না পড়তেই মনের ভেতর একধরনের সুবাতাস বইতে শুরু করে, করিমের ‘বসন্ত বাতাস’-য়ের মতো। কেন জানি কেবল মনে হতে লাগলো, এবার বুঝি অনেক দিনের পরে নাটকান্তপ্রাণ সুনামগঞ্জ আড়মোড়া ভেঙ্গে তন্দ্রাচ্ছন্নতার ঘোর কাটিয়ে উঠছে। এইবার শুরু হবে ঘুমতাড়ানিয়া বৃন্দ্যগীত, চারদিকে আকাশবাতাস মুখরিত করে বেজে উঠবে ঢুলকরতাল। কামনা করি, স্বপ্নবাজ সুনামগঞ্জের এই স্বপ্নটা যেনও আর কোনও দিন ভেঙে না যায় ।
এই যে স্বপ্ন দেখা, আবার ফিরে আসছে সুনামগঞ্জের সমৃদ্ধ নাট্যসাংস্কৃতিক পরিসর, এমন হতে পারে যে, এ সুন্দর স্বপ্নটা স্বপ্নই থেকে যাবে। কিন্তু এমন স্বপ্ন দেখার একটি কারণ আছে। কারণটি হলো, ‘অপশক্তি’ মঞ্চায়নের ক’দিন আগে এই একই মঞ্চে মঞ্চস্থ হয়ে গেলো, সালেহ আহমদ আলমগীরের পরিচালনায় সুনামগঞ্জের প্রখ্যাত নাট্যকার ও অভিনেতা গোলাম রাব্বীর ‘সুমতির মুখে সেফটিপিন’ নাটকটি। এমন স্বল্পবিরতির ব্যবধানে দুই দুইটি নাটকের মঞ্চায়ন সুনামগঞ্জে নাট্যচর্চার অতীত সমৃদ্ধির স্মৃতির সূর্যোদয় ঘটিয়ে তবে ক্ষান্ত হয়। ঘরকলজিক (নস্টালজিক) করে তোলে নাট্যান্তপ্রাণ দর্শকশ্রোতাকে। খুঁচিয়ে জাগিয়ে তোলে নাট্যামোদী মানুষজনের চাতক মনকে। মনের ভেতরে স্বপ্ন তো জেগে উঠতেই পারে । এতে মনের কোনও দোষ দেখি না।    
‘সুমতির মুখে সেফটিপিন’ আবুল হোসেন মিলনায়তনে প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল, সে অনেকদিন আগে। এই আগে মানে, আজ থেকে পুরো ৩৪ বছর আগে, ১৯৮৩-তে। ২০১৭-য় এসে নাটকটির চতুর্থ মঞ্চায়ন হয়েছে, জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে। আগের তিনটি মঞ্চায়ন সম্পন্ন হয়েছে আবুল হোসেন মিলনায়তনে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় মঞ্চায়ন যথাক্রমে ১৯৯০ ও ২০১৩-তে। উল্লেখ্য যে, দ্বিতীয় মঞ্চোয়নের সালটিকে সালেহ আহমদ আলমগীর ‘সম্ভবত’
বিশেষণে বিশেষায়িত করেছেন। এই আলমগীর চিকিৎসাবিষয়ক কর্মকা-ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাঁর পেশাটা এমন যে, তাঁকে রোগী দেখার ধকল সইতে হয়  না, অথচ ‘ডাক্তার’-য়ের মু-মাল ‘ড.’ তিনি তাঁর নামের আগায় লাগিয়ে থাকেন। কিন্তু (কানে কানে বলি), তলে তলে তিনি সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক জগতের পুরোহিত, বিশেষ করে নাট্যজগতের পুরোধা সূত্রধর। গত ৩  সেপ্টেম্বরে মঞ্চায়িত ‘সুমতির মুখে সেফটিপিন’-য়ের পরিচালনায় তিনিই ছিলেন। এর আগে এই নাটকের ২০১৩-র তৃতীয় মঞ্চায়নও সম্ভব হয়েছে তাঁর পরিচালনার হাত ধরেই।    
নাটকটির কেন্দ্রীয় চরিত্র  
‘মনসাদ’। একজন চোরাকারবারী। যাকে বলে ভীষণ ধুরন্ধর, প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর। হেন কোনও অপকর্ম নেই সে যা করতে পারে না। এমনকি নরহত্যা পর্যন্ত তার কাছে উলস (ছারপোকা) মারার মতো তুচ্ছ। আইন তার হাতের পুতুল। সে তার অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার জানন দেয় ‘আমি থাকি আইনের গুড়িৎ’ এই বিখ্যাত সংলাপ আউড়ে। বলাই বাহুল্য, সে কথা বলে সুনামগঞ্জ শহরের  একেবারেই গায়ে লাগোয়া লখনছিরি (লক্ষণশ্রী)-র আঞ্চলিক ভাষায়, এটাই তার মাতৃভাষা। প্রথম ও দ্বিতীয় মঞ্চায়নে ‘মনসাদ’ চরিত্রটি নাট্যকার স্বয়ং রুপায়ণ করেছেন। পরের দুই বার ‘মনসাদ’ সেজেছেন সামির পল্লব।     
হেঁটে হেঁটে জীবন অনেকটা সময় পেরিয়ে এসেছে। স্মৃতির পাতায় জমেছে ধুলোর পুরো পরত। সে ধুলোর আস্তরণ সরিয়ে সেদিনকার আবুল হোসেন মিলনায়তনে মঞ্চায়িত ‘সুমতির মুখে সেফটিপিন’-য়ের পূর্ণ প্রতিচ্ছবি ভাষিক তুলি দিয়ে আঁকা এখন আর সম্ভব নয়। টাটকা স্মৃতি আর টাটকা নেই, ধূসরম্লান হয়ে পড়েছে। যাকে বলে, এতোটাই পুরনো হয়ে পড়েছে যে, মনে পড়ে কি পড়ে না। ‘সুমতির মুখে সেফটিপিন’-য়ের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘মনসাদ’-য়ের রূপায়নে নাট্যকার গোলাম রাব্বীর অনবদ্য অভিনয় দেখেছিলাম, সম্ভবত দ্বিতীয় মঞ্চায়নের সময়। সে কথা জীবনে ভুলবার নয়। কোনও দর্শক বোধ করি সেদিনের মঞ্চে মূর্তিমান ‘মনসাদ’কে কোনও দিন ভুলতে পারবে না। নাটকের কোনও চরিত্র এতোটা বাস্তব হয়ে দেখা দিতে পারে অভিনয়ের শৈল্পিক নৈপুন্যে, সেদিন সেটা ভালো করে দেখা ও বুঝা গিয়েছিল।
এবার ২০১৭-তে এই ‘মনসাদ’ চরিত্রটির রূপায়ণে ছিলেন যথারীতি সামির পল্লব। সামির পল্লব ও স্বয়ং রাব্বীর মধ্যে ‘মনসাদ’ চরিত্রে কে বেশি অনবদ্য সে তুলনাটা একেবারে কানায় কানায় পরিপূর্ণ করে করার মতো স্মৃতির ঔজ্জ্বল্য আজ আর অবশিষ্ট নেই। তবু বলতে দ্বিধা নেই যে, যে কোনও চরিত্রে অভিনেতা রাব্বীর তুলনা কেবল রাব্বীই হতে পারেন, সেখানে আর কাউকে মানায় না। বিশেষ করে ‘মনসাদ’ চরিত্রে তার অভিনয় তুলনা রহিত, উৎকর্ষে তা এতোটাই চূড়ান্তস্পর্শী। তবে কোনও রকম তুলনার ধারে কাছে না গিয়ে এটা অন্তত বলাই যায় যে, সামির উতরে গেছেন। দর্শকরা সে কথা করতালিতে টইটম্বুর মিলনায়তন মুখরিত করে জানিয়ে দিয়েছেন।
নাটক শেষ হওয়ার পর বাসায় ফিরছিলাম, হেঁটে হেঁটে, নাটক নিয়ে গল্প করতে করতে। সঙ্গে ছিলেন কবি কুমার সৌরভ ও হিরন্ময়। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া  দুই যমজ ত্বিষা ও ঈশা। তারা দু’জন নাটক দেখে খুব উচ্ছসিত। সামির পল্লবের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, কিন্তু নাটকের প্রমিত ভাষায় রচিত অংশের অভিনয় তাদের প্রত্যাশা পুরন করতে পারেনি, তাদের কাছে একেবারেই জলো ঠেকেছে।
মিলনায়তনে উপচেপড়া ভিড় লাগার ভাবনাটি মাথা থেকে সরছিল না। ছোট্ট এই শহরে নাটক দেখতে আসার এই ভিড় প্রমাণ করে যে, ‘সুমতির মুখে সেফটিপিন’ নাটকটির জনপ্রিয়তা সত্যিকার অর্থেই আকাশটুম্বী। আজ মিলনায়তনে তিল ধারনের ঠাঁই ছিল না। নারী চরিত্রবিবর্জিত এই নাটকের ব্যাপক জনপ্রিয়তার মূল চাবিকাঠি সংলাপে ব্যবহৃত আঞ্চলিক ভাষা নয়, এটা অনস্বীকার্য সত্য, তবু সার্বিক বিবেচনায় লক্ষণশ্রীর লোকভাষা এই নাটককে আলগা সৌন্দর্যে মহিমান্বিত করেছে, বোধ করি নাটকটির জনপ্রিয়তার এটিও একটি কারণ।       
তবে এই ভিড়ের কারণ ভাবনার বিষয় নয়। ভাবছিলাম, এই ভিড়ের মধ্যে যেসব মানুষ এসেছিল নাটক দেখতে আসলে তারা নাটক দেখে কী নিয়ে গন্তব্যে ফিরছে? নাটক নিয়ে যাঁরা কাজ করেন তাঁরা জানেন যে, নাটক সমাজবদলের সর্বোত্তম  বলতে না চাইলেও উত্তম হাতিয়ার তো বটেই। নাটকের এই ভূমিকাকে অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। আর সমাজবদল মানে যে সামজিক বিপ্লব সে কথা তো সর্বজনবিদিত ঐতিহাসিক প্রপঞ্চ। সেটা বুঝতে মার্কসের চেলা হতে হয় না। সচেতন নাট্যকারকে আধুনিক হয়ে উঠার শর্তে বিশেষ করে রাজনীতি সচেতন হতেই হয় এবং অবশ্যই নাটককে সমাজবদলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের কৌশল জানতে হয়। নাটককারগণ যদি এমন নাটক নির্মাণ করেন যে-নাটক দেখে দর্শক একধরনের তৃপ্তি নিয়ে ফিরে যাবে, উৎফুল্ল চিত্তে, তা হলে ধরে নিতে হবে সে নাটক সমাজবদলের হাতিয়ার হওয়ার কাজ করে উঠতে পারেনি, সামাজিক দায় আদায়ে ব্যর্থ হয়েছে। নাটককে হতে হবে এমন ধরণের যে, নাটক শেষ হওয়ার পর দর্শক ভাবনায় পড়বে, নাছোঁড়বান্দা  চিন্তা তাকে জড়িয়ে ধরবে, ছাড়বে না। ভাবতে ভাবতে গন্তব্যে ফিরবে। ঘুমুতে যাবার আগে ভাববে, ঘুম থেকে জেগে আবার ভাববে। যখন একটি নাটক এরকম বৈশিষ্ট্যের হয়ে উঠবে, তখন সে নাটকটি হয়ে উঠবে নাট্যকার ও দর্শকের একটা যৌথ নির্মাণ। নাট্যকার গোলাম রাব্বী সচেতনতার সঙ্গে সেটা করেছিলেন কিনা, জানা কথা, তাঁর স্বভাষ্য হতে সেটা জানার এখন আর কোনও অবকাশ নেই। তবে ‘সুমতির মুখে সেফটিপিন’ নাটকটি যে নাটককার ও দর্শকের যৌথ নির্মাণ হয়ে উঠেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এ নাটক অবশ্যম্ভাবীভাবে দর্শককে ভাবায়, চিন্তক করে তোলে।
আরেক অন্যরকম অর্থে এই নাটকটি, প্রমিত বাংলায় রচিত সংলাপাংশের নাটকীয় অনুৎকর্ষতাটুকু বাদে, একটি নিটুল কবিতা। কবিতা আবৃত্তিযোগ্য। আর আবৃত্তিযোগ্য বলে অবশ্যই শিল্পোৎকর্ষতার মাপে পরিমিত অভিনয়ের অবকাশও তাতে থাকে। এই দিক থেকে বিবেচনায় কবিতা ও নাটকের সম্পর্ক গূঢ়ার্থে অন্তরঙ্গ। কবিতার পর্যালোচনা করতে গিয়ে কবি উৎপলকুমার বসু একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমি চাই যে পাঠক তার প্রাণপণ চেষ্টা করুক। পাঠকের সঙ্গে সবসময় আমার একটা দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক থাকে। আমি একটা জিনিস তৈরি করে পাঠককে দিলাম, আর সে খেয়ে নিল। সেটা আমি চাই না। আমি চাই যে সে নিজেও একটা কিছু কন্ট্রিবিউট করুক। সে নিজেও তৈরি করুক। আসলে এটা আমাদের যৌথ, দ্বৈত উদ্যোগে লেখা একটি কবিতা।’  (কবিতাপত্র, ৯ম বর্ষ ১ম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৬, সম্পাদক : হোসেন দেলোয়ার, পৃ: ৮৯, উদ্ধৃত : কামরুল ইসলাম, একজন লোচনদাস কারিগরের চলে যাওয়া)। উৎপলকুমার তাঁর কবিতানির্মাণে পড়ার সময় পাঠকের ও আবৃত্তির সময় শ্রোতার একরকমের অবদান থাকার কথা ভাবেন, গোলাম রাব্বী তাঁর নাটকনির্মাণ নিয়ে তেমন করে ভাবতেন কিনা সেটা, আবারও বলি, এখন আর তাঁর নিজস্ব ভাষ্য থেকে জানা সম্ভব নয়। তবে ‘সুমতির মুখে সেফটিপিন’ নাটকের শেষ সংলাপটি প্রমাণ করে যে, তিনি তাঁর নাটক নির্মাণে দর্শককে যৌথতা দিয়েই নাটকটি রচনা করেছিলেন। শিল্পনির্মিতির এই সূত্রমতে  উৎপলকুমার বসুর কবিতা ও গোলাম রাব্বীর নাটক সমপর্যায়ভূক্ত,  নির্দ্বিধায় বলা যায়, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।      
‘মনসাদ’ বাস করে ‘আইনের গুড়িৎ’। নাটকের শেষ দৃশ্যে এই ক্ষমতাধর মনসাদ দর্শককে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দম্ভভরে বলে দিয়েছে, সে কারও কোনও পরোয়া করে না, কেউ তার ‘বাচ্চার বাপের’ একটি চুলও ছিঁড়তে পারবে না, ‘মনসাধ’ সর্বকালে সর্বাবস্থায় অপ্রতিরোধ্য। মানুষ হত্যা করেও সে পার পেয়ে যেতে পারে। আইন তার টিকিটি পর্যন্ত ছোঁতে পারবে না। আইন তার পকেটের নগদনারায়ণের নেওটা। মুনাফালোভী মুক্তবাজার অর্থনীতির মসলা দিয়ে সৃষ্ট সমাজ তার ক্ষমতার বশীভূত। বিদ্যমান এই সমাজ পূঁজির দাস। এই সামজিক বাস্তবতার পরিসরে এই নাটক সামাজিক বিপ্লব করে দেখিয়ে দেবে না, বরং বিপরীতে সামাজিক বিপ্লব করার পথ বের করার ভাবনার সমুদ্রে ফেলে দেবে দর্শককে। দর্শক ভাবতে ভাবতে ঠিকই সমাজবদলের পথ বের করবে। রাব্বী এই নাটকে মনসাদ নামক দৈত্যকে অপরাজেয় করে তোলেছেন, মনে হয়,  সচেতনভাবেই। তদুপরি হিং¯্র ক্ষমতার অহঙ্কারে উজ্জীবিত মনসাদের প্রতীকী উপস্থাপনের মুন্সিয়ানা দিয়ে বিদ্যমান জড়ভরত সমাজকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে অবজ্ঞার পাত্রে পরিণত করেছেন। দর্শককে ভাবনা করার মওকা করে দিয়েছেন, অথবা একটু গুছিয়ে বললে বলতে হয়, দর্শককে তিনি উসকে দিয়েছেন। তিনি চান তাঁর নাটকের দর্শক সমাজবদলের পথ অনুসন্ধানে নামতে বাধ্য হোক। মনসাদ নামক মূর্তিমান ‘সা¤্রাজ্যবাদী সমস্যা’কে পরাস্ত করার দায়িত্ব নাটকারের নয়। সে ভাবনা দর্শকের। গোলাম রাব্বি তার নাটকের জাত চিনিয়ে দিয়েছেন এখানেই এবং এইভাবে এখানেই তিনি নাট্যগুরু।
গড় করি গুরু।