সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত- ইতিহাস যেখানে থেমে গেল

অ্যাড. মাহবুবুল হাছান শাহীন
সেকেন্ডের কাঁটার মতোই টিক টিক করে চলা জীবন ঘড়ি এক সময় থেমে যায়। চিরন্তন সত্যের কঠিন বাস্তবতার সামনে যখন প্রতিটি মানুষ এসে দাঁড়ায় জীবনের খাতার হিসাব মেলাতে চেষ্টা করে। কারো মেলে, কারো মেলে না। তারপরও কারো জন্য জীবনের গতিপথ থেমে থাকে না। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি দিনের বিররণই পাঠকের জানা। তাই আমি সে দিকে আলোচনা করতে গেলাম না। কিছু কিছু ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা লিখতে খুব ইচ্ছে হলো।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের মহা নায়ক। বাংলাদেশের জন্ম লগ্ন থেকেই সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। ষাটের দশকের রাজনীতির উত্তাল সময়ের রাজনৈতিক কর্মী। সত্তরের প্রাদেশিক পরিষদের কনিষ্ঠতম সদস্য ছিলেন। প্রথম সংসদ থেকে শুরু করে বর্তমান সংসদ পর্যন্ত দীর্ঘ ৪৫ বছরের সৃষ্টিশীল সাংসদ হিসাবে প্রতি মুহূর্তেই সংসদকে প্রাণবন্ত রাখতে অবদান রেখে গেছেন। ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। তিনি বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্যও ছিলেন। মৃত্যু পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে তাঁকে নিয়ে শোক প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাশ হয়। যাঁরা কিছু কথা বলেছেন তা শুনতে শুনতে মনের ভিতর অনেক কিছুই তোলপাড় করেছিল। তাঁর একসময়ের রাজনৈতিক সহকর্মী বর্তমান কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন,‘আমাদের সময়ে জগন্নাথ হলে নাটকের অন্যতম চরিত্র ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। জগন্নাথ হলের কোন নাটকই তাঁকে ছাড়া সম্পন্ন হতো না’।
বিরোধী দলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ বলেন,‘তাঁর সম্পর্কে আমরা আজ যত ভালো কথাই বলি না কেন আমার মনে হয়েছে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি’।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন,‘বর্তমান সংসদের প্রধান বিরোধী দলের প্রধানের ভূমিকা পালন করেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। সরকারের কোন ভুল-ত্রুটি তিনি ছাড় দিতেন না। তাঁর গঠনমূলক সমালোচনা বর্তমান সরকারকে আরো দৃঢ় করেছে’।  
ব্যক্তিগতভাবেও কিছু সুখ অনুভূতি আমার ছিল। কতটুকু উদার মনের মানুষ ছিলেন খুব সহজেই বুঝা যায়। ২০০৮ সালে ওয়ান ইলিভেনের সময় আমার বার কাউন্সিলের ভাইবা পরীক্ষা। আগের বছর খারাপ করার কারণে অনেকেই বললেন,‘সেনবাবুর কাছে যাও। কোন সাহায্য পেতে পারো’। বন্ধুবর মুক্তদির আহমেদ মুক্তা’র (জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদের বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান) সঙ্গে শেয়ার করার পর সে বলল, ‘চল আমি তোর সঙ্গে ঢাকায় যাবো’। আমি রাজনীতি বা রাজনীতি সংশ্লিষ্ট কোন মানুষের সঙ্গে তেমন ভাবে কখনও মিশিনি। তাই মুক্তাকে বললাম তোর সঙ্গে যাবো, উনি আমাকে চিনবেন কি না? সে বলল আগে যাই তারপর দেখা যাবে। আমি ও মুক্তা ঢাকায় গেলাম। সেনবাবুর ঝিগাতলা বাসায় নিচতলায় গিয়ে বসলাম। রাজনৈতিক ব্যস্ততা কম বিধায় লোকজনও কম। আমরা বসার পর উপরে খবর দেয়া হলো। প্রায় ত্রিশ মিনিট পর উনি নামলেন। মুক্তাকে আগে থেকেই ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন। খবর কি? বলার পর আমাদের আসার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলেন। মুক্তা আমার পরিচয় দিলো। সুনামগঞ্জের অ্যাড. সালাম সাহেবের ছেলে। প্রথমেই বললেন, তুই সালামের ছেলে? জ্বি কাকা। বলার পর বললেন রাজনীতি করস নি? জি না কাকা। তোরা রাজনীতি না করলে ওইব নি। প্রায় এক ঘন্টা আমাদের সময় দিলেন। চা বিস্কুট খাওয়ার পর একটি কার্ডে কিছু লিখে আমার হাতে দিলেন, বললেন যা দেখ কাজ অয়নি। অখন তো রাজনীতি নাই, কেউ কেউর কথা শুনে না। কথা শুনলাম। মুগ্ধ হলাম। একজন অচেনা তরুণের কাছে এরচেয়ে বোধহয় বেশি পাওয়ার কথা নয়। তবে রাজনীতি, মমত্ববোধ টের পেলাম। মনে হলো হয়তো কোন এক সময় আব্বার সঙ্গে পরিচয় ছিলো। তাই সহজেই আমার সঙ্গে মিশে যেতে পারলেন।
দূর থেকে আমার মনের অনুভূতিতে একটা দোলা খেল। আমার মনে হলো জাতীয় রাজনীতিবিদ হলেও, জেলার রাজনীতিতে তেমনভাবে প্রভাব খাটানো তাঁর ভালো লাগতো না। দিরাই শাল্লার রাজনীতি তাঁকে বেশি করে টানতো। দিরাই-শাল্লাকে মনে হতো তাঁর বুকের ডান পাশ বাম পাশ। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ঘনিষ্ট দিরাইয়ের কিছু ছাত্রনেতার (বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতা) সঙ্গে লেখাপড়ার সূত্রে ঘনিষ্টতা হয়েছিলো। দেখতাম সারা জেলার চেয়ে তারা বেশি রাজনীতি সচেতন। সেনবাবু বলতে তারা     অজ্ঞান। তার মধ্যে অন্যতম দিরাই পৌরসভার বর্তমান কাউন্সিলর বিশ্বজিৎ রায়, সাবেক কাউন্সিলর নারায়ণ বনিক।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের ৩য় বর্ষপূর্তিতে তাঁর উপস্থিতি খবর পরিবার সহ পুরো জেলা জুড়েই আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই বলেছেন সেনবাবু আসবেন না। কিন্তু অনেককে অবাক করে দিয়ে অনেক কষ্ট স্বীকার করে শুধুমাত্র খবরের বর্ষপূর্তিতে তিনি হাজির হলেন। এই প্রথম জেলার কোন অনুষ্ঠানে ছয় সংসদ সদস্যকে পুরো জেলাবাসী এক ফ্রেমে দেখলো। সে ছবি আজ ইতিহাস হয়ে গেলো।
ইতিহাসের সবচেয়ে দু:খের বিষয় হলো ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। আমার মনে হয় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে মানুষ শিক্ষা নেবে। সারা জীবন রাজনীতির মাঠে যে ব্যক্তি তাঁর কর্মগুণে সচল ছিলেন, তাঁর কর্মদ্যোগ থেমে থাকবে না। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মী তাঁর রাজনীতির পাঠ থেকে শিক্ষা নেবে। একজন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রাজনীতির মহীরুহ। রাজনীতিতে বিরোধ থাকবে, থাকবে মতদ্বৈততা। অনেকের ভেতরেই থাকবে দু:খ, ক্ষোভ, রাগ, অভিমান। বেলা শেষে আমরা মানুষ। জীবনের খাতা বন্ধের পর যা ভালো তাই ফিরে ফিরে আসুক। মৃত্যু পরবর্তী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ইতিহাস যেন থেমে না থাকে।
লেখক: আইন সম্পাদক পৌর আওয়ামী লীগ, সুনামগঞ্জ।