সেক্টর লিডার

কুমার সৌরভ
ঝাঁঝালো কণ্ঠে তিনি বললেন, কাজ না করলে ওরা খাবে কী? আপনারা তো তাদের খাবার দিবেন না। তো এত বড় বড় কথা বলবেন না। প্লিজ স্টপ এন্ড সাটআপ।
ফেসবুকে বানের মতো ভেসে আসা এডভার্স কমেন্টের জবাব দিচ্ছিলেন ম্যাডাম ফেসবুক লাইভে। কমেন্টগুলোতে তাঁর লাইফহিস্ট্রি থেকে ৮৩ সনের চাটুকারিতা, হালফিলে তার ভূমিকার তীব্র সমালোচনা হচ্ছিল। অসম্ভব রেগে গেছেন তিনি।
গাজিপুর সড়কে মিছিল শুরু হয়েছে। মিছিলের অদূরে বিশাল অগ্নিকুণ্ড মুখ হা করে দাঁড়িয়ে আছে যেন। কেউ পরোয়া করছে না অদৃশ্যমান ওই অগ্নিকুণ্ড। ওরা উদভ্রান্তের মতো ছুটছে ফ্যাক্টরিতে। পায়ে হাঁটা দলের সংখ্যাই বেশি। নারীরাই মিছিলের সংখ্যাগরিষ্ট। দেশে নারীর ক্ষমতায়নের উৎকৃষ্ট দৃশ্য আজ গাজিপুরের এই রোদতপ্ত সড়কে এসে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। কিন্তু এই অংশগ্রহণের মন্থনে উঠে আসা মাখন কার মুখে যায়?
ফ্যাক্টরিমুখি এই মিছিলের খবর পেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুললেন তিনি, সুদর্শনা স্মার্ট মহোদয়া। তিনি ফ্যাক্টরি মালিকদের নেতা (থুরি নেত্রী! নারীর ক্ষমতায়ন কিনা!)।
বাতাসে হাঁচি কাশির শব্দ। সম্মিলিত নিঃশ্বাসের কাল বৈশাখির দমকা হাওয়া। মুখে কাপড় গুঁজে কেউ মাস্ক পরে হাঁটার সংগ্রামে নিয়োজিত থাকলেও এই শব্দ লুকানো যাচ্ছে না। লকডাউন কোয়ারেন্টাইন আইসোলেশন সোস্যাল ডিসটেন্স এই মিছিলে পরাস্ত। তাঁদের মনে একটাই চিন্তা ফ্যাক্টরিতে পৌঁছাতে না পারলে বেতন বন্ধ, এরপর উইদাউট নোটিশ টারমিনেশন।
সেক্টর লিডার নসিহত করেছেন, বড় বড় কথা বলবেন না। শ্রমিকরা বলেছে- তারা করোনায় মরতে চায়, ক্ষুধায় মরতে চায় না। সো ব্রাদার সিস্টার এন্ড সোকলড হিউমেনেটিরান, নো এডভাইস নো মোর এনি ডেভিল কমেন্টস।
কোন্ শ্রমিক বলেছে, করোনায় মরতে চাই? কে? কে? কে? উত্তর নেই। এই কথা কি এলিয়েনরা ছড়িয়েছে? এই এলিয়েনরা গুলশান বনানী উত্তরায় থাকে? এদের সেকেন্ড হোম কানাডায়? এরা ভিন গ্রহ থেকে এসে দখলে নিয়েছে শ্যামল সবুজ দেশটি?
সরকার সাবসিডি দিয়েছে শ্রমিকদের ছুটির বেতন দিতে। আর লিডার বলছেন এসো কাজে এসো। প্রোডাকশন বাড়াও। মাস্ক বানাও, পিপিই বানাও। ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে ডিমান্ড বেড়ে গেছে। অর্ডার আসছে আমেরিকা ইতালি ফ্রান্স স্পেন থেকে। লেডি লিডার পুলকিত। করোনার কারণে প্রোডাক্টের ভ্যারিয়েশন এসেছে। ডাইভারসিটি বাড়ছে। দামও বেশ ভাল পাওয়া যাবে। এই মওকায় বিদেশের ব্যাংক ডিপোজিট অনেক বেড়ে যাবে। লিডারের কদর এখন সংগঠনে হাই রাইজিং । নেক্সট ইলেকশনে তাকে ঠেকায় কে। মৃত্যু নিয়ে ব্যবসা! কথাটা ভাবতেই লিপস্টিক রাঙানো তার ঠোটে রক্ত সঞ্চালন বেড়ে গেল আর ঠোটটি আরও মোহনীয় হয়ে উঠল।
গাজিপুরের মিছিলে নেত্রকোনার কেন্দুয়ার রহিমা নামের ২৫ বছরের এক যুবতীও ছিল। রহিমার শরীর ভাল নেই ক’দিন ধরে। মার বাধা না মেনে সেও বেরিয়ে এসেছে কর্মস্থলে যাবে বলে। এখন তার হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। মাথার উপর তীব্র রোদ। ভিড়ের চাপ। রহিমার কষ্ট বাড়ছে। তবু সে থামছে না। এগোচ্ছে। কেউ যেন তাকে ঠেলে নিচ্ছে। তাকে যে পৌঁছাতেই হবে। বাড়িতে বুড়ো বাপ, ফুসফুস ক্ষয়ে যাওয়া মা, দুইটি নাবালক ভাই। ওদের দু’মুঠো ভাতের সংস্থান যে তাকেই করতে হয়। সুতরাং থামলে চলবে না। রহিমা একসময় ফ্যাক্টরির গেটে এসে দাঁড়ালো। ভিতরে ঢুকতে যাবে। কিন্তু একি ! গেটে তালা। নোটিশ টানানো, ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত ফ্যাক্টরি বন্ধ। মাটিতে বসে পড়ল রহিমা। তার মাথা ঘুরছে।
সেক্টর লিডারকে একটি টিভি টকশোতে দেখা গেল। তিনি সপ্রতিভ ভঙিতে বলছেন, করোনা সংক্রমণ এড়াতে আমরা ফ্যাক্টরি বন্ধ রাখার ঘোষণা নিয়েছি। একজন সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করলেন, গতকাল আপনারা বললেন, ৫ তারিখ থেকে ফ্যাক্টরি খোলবে, দলে দলে ওয়ার্কাররা আসছে, এরা এখন কী করবে? তিনি জবাব দিলেন, এই দায় আমাদের নয়। ওরা কেন সর্বশেষ নির্দেশনা না মেনে পিঁপড়ার মতো আসা শুরু করল।
ফ্যাক্টরির গেটে রহিমা পড়ে আছে। তার আশপাশে কেউ নেই। সে একা। সোস্যালি ডিসট্যান্সড। তার নিঃশ্বাস চালু আছে কিনা জানা যায়নি।
সেক্টর লিডার তখন পরবর্তী স্ট্রেটেজি ঠিক করতে একটি হাই পাওয়ার মিটিংয়ে। রহিমাদের দেহ নির্গত প্রাণবায়ু এই অবধি আসতে পারে না কখনও।