স্টোন ক্রাশারের শব্দে ঘুম ভাঙে অনেক শিশুর

বিশেষ প্রতিনিধি
স্টোন ক্রাশারের শব্দে ঘুম থেকে জেগে ওঠে কান্না শুরু করে শিশুরা। শীতের মওসুমে ধোয়াচ্ছন্ন হয়ে যায় বাড়ি-ঘর, শ^াস নিতে কষ্ট হয়, প্রতিবাদ করলে বাড়িতেই থাকা যাবে না, তারা অনেক প্রভাবশালী। কথাগুলো সুনামগঞ্জ শহরতলির সুরমা ইউনিয়নের আসকর আলী’র।
ছাতকের নাগপাড়া-বাশপাড়া’র রতন দেবনাথ বললেন, বাড়ির পাশে চলে তিনটি স্টোন ক্রাশার মেশিন, মেশিন চললে ঘরবাড়ি কাঁপতে থাকে, খাবারে পাথরের গুড়া এসে পড়ে, কাঁলাচান থলায় ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা যায় না ক্রাশারের শব্দে।
আসকর আলী ও রতন দেবনাথ কেবল নয়, সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় কমপক্ষে ৪০০ ক্রাশার মেশিন চলে পরিবেশ অধিদপ্তর বা জেলা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই। কে কোথায় ক্রাশার মেশিন চালায় প্রশাসনও জানে না। কেউ জানায়ও না। অনেক শিশুর ঘুম ভাঙে স্টোন ক্রাশারের শব্দে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সালে সুনামগঞ্জে ১২০ টি ক্রাশার মেশিন চলতো, ২০১৯ সালে চলেছে ১৮১ টি এবং ২০২১ সালে চলছে ২৩৮ টি। বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা হাজার ছাড়াবে। জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন অবশ্য বলেছেন, জেলায় ৪০০ শ’ ছাড়িয়ে গেছে স্টোন ক্রাশার মেশিন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মল্লিকপুর, অচিন্তপুর, অলির বাজার, মঈনপুর, চলতি নদীর দুই তীরে, তাহিরপুরের যাদুকাটা নদী, রক্তি ও বৌলাই নদীর দুইপাড়ে, লাউড়েরগড় ও আনোয়ারপুর বাজারের পাশে, সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ সড়কের পাশে সুরমা নদীর তীরে, দুর্লভপুর, উজান লালপুর থেকে চাঁনপুর বাজার পর্যন্ত তিন কিলোমিটার জুড়ে চলছে এসব মেশিন। ছাতক শহরতলির সুরমা নদীর তীর সংলগ্ন এলাকায় গ্রাম, বসতবাড়ি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশে চলছে স্টোন ক্রাশার মেশিন।
সরকারি হিসেবে সুনামগঞ্জ সদরে ২৬, ছাতকে ১০০, তাহিরপুরে ৮৮ এবং জামালগঞ্জে ২৪ টি ক্রাশার মেশিন চলছে। যাদের কোনটির পরিবেশ অধিদপ্তর বা জেলা প্রশাসনের ছাড়পত্র নেই।
জামালগঞ্জের সাংবাদিক অঞ্জন পুরকায়স্থ বললেন, জামালগঞ্জে ক্রাশার মেশিনের সংখ্যা ১০০’এর বেশি। সরকারি হিসেবে কম দেখানো হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বেলা’র সংগঠক শাহেদা আক্তার বললেন, কোন ধরণের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই চলছে পাথর ভাঙার মেশিন। একটা শ্রেণি তাতে লাভবান হলেও জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে। স্টোন ক্রাশার স্থাপন নীতিমালা ২০০৬ মানছেন না কেউ।
তিনি জানান, সিলেটে নীতিমালা অমান্য করে স্থাপিত স্টোন ক্রাশার মেশিনের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে বেলার রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ২৪ জানুয়ারি মহামান্য উচ্চ আদালত রায়ে নির্দেশ দিয়েছেন, একটি জোন করে সকল বৈধ স্টোন ক্রাশার মেশিনকে স্থানান্তর করতে এবং স্টোন ক্রাশার মেশিন স্থাপন নীতিমালা ২০০৬ বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ গ্রহণ করারও নির্দেশ দেন।
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বললেন, স্টোন ক্রাশার মেশিন কেনার জন্য ব্যাংকগুলো ঋণ দিচ্ছে। অর্থাৎ পৃষ্ঠপোষকতাও দেওয়া হচ্ছে। তবে সবকিছুই আইন অনুযায়ী হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমরা সকলেই আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য কাজ করছি। স্টোন ক্রাশার মেশিন বিষয়ে রাজনীতিবিদদেরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, স্টোন ক্রাশার মেশিন হঠাৎ করে বন্ধ করে দেওয়া যাবে না। নির্দিষ্ট স্থানে অর্থাৎ একটি জোনেও আনা সময়সাপেক্ষ বিষয়। তবে পর্যায়ক্রমে তা করতে হবে। সীমানা প্রাচীর দিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে পাথার ভাঙার কোন বিকল্প নেই। এজন্য সকলকে সচেতন করতে হবে এবং বর্তমান পদ্ধতির পাথর ভাঙার প্রতিবাদ করতে হবে। স্বাস্থ্য সম্মতভাবে পাথর ভাঙার জন্য জেলা প্রশাসন সচেতনতার উদ্যোগ নেবে। পরে মোবাইল কোর্টও পরিচালনা করা হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে, সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে সোমবার বেলার উদ্যোগে স্টোন ক্রাশার মেশিনের অবৈধ ব্যবহার: জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিপর্যয় রোধে করণীয় শীর্ষক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন, মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান। বেলার সংগঠক শাহেদা আক্তারের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য দেন, জেলা প্রশাসক মো, জাহাঙ্গীর হোসেন, পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান, প্রথম আলো’র নিজস্ব প্রতিবেদক খলিল রহমান, জেলা পরিষদ সদস্য সেলিনা আবেদীন, পরিবেশ কর্মী এন্দ্রো সালমার, আবু নাসার, সালেহীন চৌধুরী, সাংবাদিক অঞ্জন পুরকায়স্থ, ফরিদ আহমদ প্রমুখ।