মিহির কান্তি দাস
বাংলাদেশের রাজনীতির প্রাণ পুরুষ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রাজনীতির মাঠে কিংবদন্তী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তিনি বাংলাদেশের ৭২’র সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ছিলেন। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে। প্রতিটি সংসদীয় অধিবেশনে উনার উপস্থিতি সংসদকে প্রাণবন্ত করে তুলতো। ৭০ এর নির্বাচনে সারাদেশে নৌকার জয়-জয়কার কিন্তু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) এর প্রার্থী হিসেবে প্রবীণ রাজনীতিবিদ অক্ষয় কুমার দাসকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে প্রাদেশিক পরিষদে সদস্য নির্বাচিত হন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যগণ জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে বিবেচিত হন।
কলেজ ছাত্র থাকাকালীন সময়ে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত থাকার ফলে মোটামুটি নিয়মিতভাবে পত্রিকা পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠেছিল। ‘সংবাদ’ পত্রিকা কখন আসবে উন্মুখ হয়ে থাকতাম। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত তখন এম.পি ছিলেন। উন্মুখ হয়ে থাকতাম কারণ ‘সংবাদ’ পাঠ করলে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কি বলেছেন পার্লামেন্টে সেটা জানা যেত।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত তখনকার ৭২ এর পার্লামেন্টে তুখোড় পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে পরিচিত। দিরাই-শাল্লাকে সারা দেশের রাজনৈতিক পরিমন্ডলে পরিচিতি করিয়ে ছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে যে সংসদ নির্বাাচন অনুষ্ঠিত হয সেই নির্বাচনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কর্মী হিসেবে সক্রিয় অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়েছে। তখন তিনি একতা পার্টি থেকে শত ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে জয়লাভ করেছিলেন। ছাত্র কর্মী হিসেবে তখন উনার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন শেষ করে দিরাই কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করতে তিনি উৎসাহ দিয়েছিলেন। তার উৎসাহ এবং আগ্রহের ফলে দিরাই কলেজ শিক্ষকতা জীবনের শুরু আমার।
শুরুতেই বাসস্থান সমস্যার মোকাবেলা করতে গিয়ে আমার কাকা প্রয়াত অ্যাড. সুরেশ চন্দ্র দাসের স্মরণাপন্ন হই। অ্যাড. সুরেশ চন্দ্র দাস এবং সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একই আদর্শের রাজনীতির অনুসারী ছিলেন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সাথে আমার বাসার সমস্যার কথা বলায় উনার বাসভবনে থাকার জন্য বলেন। বাসভবনে থাকার সুবাদে এম.পি মহোদয়ের ঘনিষ্ট সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয়। উনাকে বহুভাবে বহুরূপে দেখার সুযোগ হয়েছে। উনি দিরাই-শাল্লার মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাওয়ার উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। কাছ থেকে দেখেছি মনে প্রাণে তিনি একজন প্রগতীশীল অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিবিদ ছিলেন। দীর্ঘদিন তার ঘনিষ্ট সান্নিধ্যে থেকেছি কিন্তু উনার কথাবার্তায়, আচার-আচরণে কোথাও সাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনা
প্রকাশ পায়নি। উনি মানুষকে ভালবাসতেন। দিরাই-শাল্লার উন্নয়ন ছিল তাঁর স্বপ্ন। দিরাই ডিগ্রি কলেজের পরিচালনা পরিষদে দীর্ঘদিন সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। সভাপতি থাকাকালীন সময়ে এম.পি মহোদয় এবং আমি একি বাসায় অবস্থান করতাম। কলেজের উপাধ্যক্ষ হিসেবে দিরাই-শাল্লার উন্নয়নসহ দিরাই কলেজকে উন্নয়নের লক্ষ্যে তথা দিরাইয়ের শিক্ষার দ্বার প্রসারিত করার জন্য দিরাই কলেজকে ডিগ্রি কলেজে উন্নীত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। অত:পর অবকাঠামোগত উন্নয়নে মনযোগী হন। দিরাই কলেজ আজ একটি প্রতিষ্ঠিত কলেজ। এই প্রতিষ্ঠার পেছনে যার সবচাইতে বেশি অবদান তিনি হচ্ছেন প্রয়াত বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এম.মি। এম.পি মহোদয় তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীদের সন্তানের মত ভালবাসতেন। সহকর্মীদের সুখে-দু:খে এগিয়ে আসতেন এবং নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখতেন। পিছিয়ে পড়া যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দিরাই-শাল্লাকে যোগাযোগের আওতায় আনার লক্ষে দিরাই-মদনপুর সড়ক নির্মাণে একক ভাবে ভূমিকা রাখেন তিনি। অত:পর দিরাই-শ্যামারচর সড়ক নির্মাণ বাস্তবায়িত হয়। বর্তমানে দিরাই-শাল্লা সড়ক বাস্থবায়ন হওয়ার পথে। দিরাই-শল্লার মসজিদ, মন্দির, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনুদানসহ অন্যান্য অবদান রেখেছেন। জগদল মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা উনার অনন্য কৃতিত্ত্ব।
বারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরেও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে দিরাই-শাল্লার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে বেগ পেত হয়েছে। এর একটি কারণ অধিকাংশ সময় তিনি বিরোধী দলের সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। ক্ষমতাশীন দলের সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে দিরাই-শাল্লা উন্নয়নের মহাসড়কে যুক্ত হয়েছে।
নারী শিক্ষার অগ্রগতির লক্ষে দিরাইয়ে একটি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। স্বপ্ন বাস্থবায়নের লক্ষে শিক্ষানুরাগী রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা শুরু। এলাকাবাসী এম.পি মহোদয়ের স্বপ্ন বাস্থবায়নের লক্ষ্যে সহমত পোষন করেন। ১৭/১২/২০১৩খ্রি: সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠার লক্ষে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত সকল সম্বানিত শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গ কলেজ প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করেন। এম.পি মহোদযের উদ্যোগে কলেজটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন শেষ হওয়ার পর কলেজটিতে ২০১৬-২০১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে একাদশ শ্রেণির শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হয়। কলেজটিতে বর্তমানে শতাধিক ছাত্রী লেখাপড়া করছে। প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে কলেজটি সুনামের সাথে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। কলেজের উন্নয়ন কার্যক্রম, শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখার লক্ষ্যে কার্যক্রম অব্যাহত।
কারিগরি শিক্ষা প্রসারে লক্ষে গড়ে তুলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পলিটেকনিক ইনষ্টিটিউট। কারিগরি প্রতিষ্ঠানটি সুনামের সাথে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
প্রবীণ রাজনীতিবিদ, বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুতে দেশবাসীর সাথে সাথে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মহিলা কলেজ পরিবারও গভীরভাবে শোকাহত। উন্নয়নের রূপকার, ভাটি বাংলার সিংহ পুরুষ প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মহোদয়ের আদর্শ দেশবাসীর ন্যায় দিরাই-শাল্লার মানুষের অন্তরে চিরদিন অম্লান থাকবে।


