কুমার সৌরভ
ছেলেটি রাস্তায় পড়ে আছে। জিন্দাবাজার এলাকায় একটি বন্ধ দোকানের সিঁড়িতে।
তার পরনে জিন্স প্যান্ট, ফুল শার্ট। উপুড় হয়ে পড়ে আছে বলে চেহারা দেখা যাচ্ছে না। গায়ের রঙ গোলাপী আভাযুক্ত ফর্শা। মনে হয় বিদেশি। ছেলেটি কাঁপছে। সে অচেতন।
লকডাউনের সময় এই বিদেশি ছেলেটি কোত্থেকে এই রাস্তায় এলো জানার উপায় নেই। ছেলেটি কথা বলার মতো পরিস্থিতিতে নেই। তাকে ঘিরে একটি জটলা তৈরি হয়ে গেল। সামনেই পুলিশের যে দলটি ডিউটিতে ছিল তারাও ছুটে আসল। সমাগতদের অনেকেই বলল, ছেলেটির প্রচণ্ড জ্বর। তাকে হাসপাতাল নেয়া দরকার। অনেকেই এই কথা বলছে কিন্তু কেউ ছেলেটির কাছে আসছে না। পুলিশও কাউকে কাছে আসতে দিচ্ছে না। সোস্যাল ডিসট্যান্সিংয়ের সময় চলছে কিনা। পুলিশ হুইসেল বাজিয়ে লোকজনকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। মানুষ হুইসেল ও পুলিশের ধমকানোতে একটু দূরে যাচ্ছে বটে কিন্তু কেউ রাস্তায় শায়িত ছেলেটিকে দৃষ্টিসীমার আড়াল হতে দিচ্ছে না।
পুলিশের একজন হাসপাতালে ফোন দিয়ে জানাল।
কিছুক্ষণ পর একটি এ্যাম্বুলেন্স অকুস্থলে এসে দাঁড়ালো। এ্যাম্বুলেন্স থেকে বেরিয়ে এলেন পেট মোটা বয়স্ক ড্রাইভার। চেহারা দেখে বুঝা যায় অবসরে যাওয়ার বেশি দিন বাকি নেই ভদ্রলোকের। তিনি ছাড়া এ্যাম্বুলেন্সে আর কোনো স্বাস্থ্যকর্মী নেই।
তিনি এ্যাম্বুলেন্স থেকে ট্রেচার বের করলেন। কিন্তু এই বয়স্ক ড্রাইভার একা কীভাবে রাস্তায় শায়িত ছেলেটিকে ট্রেচারে করে এ্যাম্বুলেন্সে তুলবেন?
রাস্তায় দাঁড়ানো এক মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি বললেন, ‘মেডিকেলের আর কাউকে সাথে দেয়া গেল না?’
ড্রাইভারের উত্তর- ‘এই কথার উত্তর আমার জানা নাই। আপনারা কেউ আমাকে সাহায্য করুন দয়া করে, রোগীকে এ্যাম্বুলেন্সে তুলি।’
কিন্তু কেউ এগিয়ে এলো না।
পথচারী একজন বললেন, ‘ছেলেটিকে দেখে ইউরোপিয়ান মনে হচ্ছে। সারা ইউরোপে করোনা ছড়িয়ে গেছে। প্রতি মিনিটে মানুষ মরছে। এই ছেলেটিও করোনায় আক্রান্ত কিনা কে জানে। তবে লক্ষণ উপসর্গ কিন্তু সুবিধার ঠেকছে না।’
এই কথা শুনে অন্যরা আরও ভয় পেয়ে গেল। সকলেই কদম কদম পিছিয়ে পড়ছে।
ড্রাইভার কী করবেন বুঝতে পারছেন না। তার কেবলই নিজের ছেলেটির মুখ মনে হতে থাকল। ঠিক এমন বয়সেরই তার ছেলে। ড্রাইভার কিছুটা আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়লেন। পুত্রের জন্য যেরূপ টান হয় সেইরূপ টান অনুভব করলেন তিনি মনের ভিতর।
তিনি হাতে গ্লাভস লাগালেন। মুখে মাস্ক পরলেন। গায়ে চাপালেন পিপিই’র মতো একখণ্ড গাউন। গাউনটি কেবল তার বুকের দিক ঢাকতে পারে। পিঠ খোলাই থাকে। নিজেকে এভাবে তৈরি করে ড্রাইভার ট্রেচারটি ঠেলে ছেলেটির কাছে নিয়ে গেলেন। উপুড় হয়ে পড়ে থাকা ছেলেটিকে তিনি টেনে উপরমুখো করলেন। এখন ছেলেটির চেহারা দেখা যাচ্ছে। কী সুন্দর চেহারা। ঠোট হালকা লালচে। গালের বাম পাশে একটি তিল। দেখেই মায়া হয়। ড্রাইভার ছেলেটির গায়ে হাত দিলেন। তিনি বুঝতে পারলেন প্রচণ্ড জ্বরে ছেলেটি বেহুশ হয়ে আছে।
ছেলেটিকে কীছুতেই তিনি ট্রেচারে তুলতে পারছেন না। ফ্যালফ্যাল করে চারদিকে তাকাচ্ছেন তিনি। তার চোখে সাহায্যের আকুতি। ডাকছেন, ‘ভাই কেউ একজন আসুন, ছেলেটিকে তুলি। ওর তো চিকিৎসা প্রয়োজন। নইলে রাস্তায়ই মরে পড়ে থাকবে যে।’
সময় গড়িয়ে যায়। পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট। কেউ আসছে না। যেন মানুষের ভিড়টি এখন কারও জাদুবলে প্রস্তরের স্তুপ হয়ে গেছে। মানুষের এই পাথর হয়ে উঠায় বড় কষ্ট পেলেন প্রৌঢ় ড্রাইভার।
হঠাৎ দুইজন এগিয়ে এলেন। একজন ড্রাইভারের চাইতেও বয়স্ক। রিক্সা চালান তিনি। আরেকজন মধ্যবয়সী, জিন্দাবাজার পয়েন্টে তরমুজ ফালি করে বিক্রি করতেন। লকডাউনে দুইজনই এখন কর্মহীন।
এদের সহায়তায় অনেক কষ্ট করে ছেলেটিকে এ্যাম্বুলেন্সে তোলা গেল। তুলতে যেয়ে একবার ট্রেচার থেকে ছেলেটি সড়কে পড়ে গেল। পুনরায় চেষ্টার পর তোলা গেলো। ড্রাইভার এ্যাম্বুলেন্স নিয়ে দ্রুতগতিতে হাসপাতালের দিকে রওয়ানা হলেন। যাওয়ার আগে সাহায্যকারী দুইজনকে ধন্যবাদ জানালেন- ‘আল্লাহ তোমাদের ভাল করুক’ বলে।
#
তরমুজওলা আর রিক্সাওলাকে এবার চেপে ধরল জনতা। ‘এই মিয়া তুমি তো এবার আমাদের বিপদ ডেকে আনবে। যদি ছেলেটির করোনা হয়ে থাকে তবে তো তোমরা অনেককে এই রোগ ছড়িয়ে দিবে।’ সকলেই এই কথা সমর্থন করল। তারা দাবি তুলল এই দুইজনকে কোয়ারিন্টাইনে দিতে হবে। তারা কাকুতি মিনতি করে বলল- ‘বাবারা, একটি অসুস্থ মানুষকে সাহায্য করেছি আমরা। এটাই তো মানুষের ধর্ম। তোমরা নিরব দাঁড়িয়ে ছিলে। কই তোমাদের তো কেউ কীছু বলছে না। দুনিয়াটা কি এতই খারাপ হয়ে গেছে?’
কে শুনে কার কথা। জনতার মধ্য থেকে সচেতন কেউ এবার ফোন দিল স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কীছুক্ষণ পর এসে সবকীছু শুনে সিদ্ধান্ত জানালেন, জনতার দাবির মধ্যে যুক্তি আছে। যেহেতু তারা করোনার লক্ষণযুক্ত একজনের সংস্পর্শে এসেছে তাই তাদের কোয়ারিন্টাইনে থাকাটাই উচিৎ। তাদের সামাজিক অবস্থা অনুধাবন করে তিনি বুঝলেন নিজ বাসায় থেকে এদের স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব হবে না। তিনি সরকারিভাবে তৈরি করা কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে থাকার বিধান দিলেন।
রিক্সাওলা ও তরমুজওলা এবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। ‘বাইরে থাকলে আমাদের বউ পোলাপান খাবে কী হুজুর’? স্বাস্থ্য কর্মকর্তা অভয় দিলেন, চিন্তা নেই, সরকার আছে, আপনারা নিশ্চিন্তে যান’।
#
শহীদ শামসুদ্দীন মেডিক্যালের বেডে শুয়ে আছে সেই ছেলেটি। তার নাম মার্ক বিকেন। ফিনল্যান্ডের বাসিন্দা। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করেন তিনি। সিলেটে এসেছিলেন অফিসের কাজে। কাজ শেষ হওয়ার আগেই শুরু হয়ে যায় লকডাউন। আটকা পড়েন তিনি সিলেটে। একটি হোটেলে থাকতেন মার্ক। সেদিন রাতে হঠাৎ করেই প্রচণ্ড জ্বর উঠে তার। সাথে থাকা প্যারাসিটামল দুইটি একসাথে খেয়ে শুয়ে পড়েন মার্ক। কিন্তু জ্বর কমছে না একটুও। সারা রাত যন্ত্রণায় ছটফট করেন মার্ক। পরদিন সকালে হোটেল থেকে বেরিয়ে আসেন কোনো ডাক্তারের কাছে যাবেন বলে। সব চেম্বার বন্ধ। অনেক ঘুরাঘুরি করে তিনি যখন জিন্দাবাজার আসলেন তখন তার মাথা ঘুরতে লাগল। তিনি বসে পড়লেন বদ্ধ দোকানের দরোজায়। এরপর তার আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান আসলে তিনি নিজেকে শহীদ শামসুদ্দীন হাসপাতালের বেডে দেখতে পেলেন। আইসোলেটেড ওয়ার্ড।
একটুপর একজন নার্স আসলেন। মার্ককে হাসিমুখে বললেন, ‘গুড ইভিনিং মার্ক’। মার্ক বলল, ‘ হেয়ার ইজ হাউ গট আই এডমিটেড সিস্টার, আই জাস্ট লস্ট মাই সেন্স এন্ড ফেল অন দি রোড’। নার্স বললেন, ‘ আই ডোন্ট নো এনিথিং। আই এ্যাম হেয়ার অন ডিউটি। আই নার্সিং ইউ ফর লাস্ট টু ডেইস। দ্যাটস অল।’ এবার মার্ক বলল, ‘সিস্টার এ্যাম আই কোভিড পজিটিভ?’ নার্স বলল, ‘ নো নো, নট ইয়েট। ইওর স্যাম্পল সেন্ট টু ল্যাব। দ্য রিপোর্ট হ্যাজ নট ইয়েট এরাইভড ‘। নার্স মার্ককে শান্ত্বনা দিল-‘ডোন্ট বি এ্যাফ্রেইড। ইউ স্যুড বি ফাইন’। এরপর নার্স তাকে ঔষধ খাইয়ে বিদায় নিলেন।
পরদিন রিপোর্ট আসল কোভিড নেগেটিভ। ইতোমধ্যে মার্কের জ্বরও কমে গেছে। মার্ক ভাবছে, হাসপাতাল থেকে ছাড় পেয়ে টানা এক মাসের ছুটি নিয়ে দেশে চলে যাবে। তার চোখে প্রেমিকা জেনির মুখ ভেসে উঠল। সামনের স্প্রিংয়ে ওদের জুটি বাঁধার কথা। এরই প্রস্তুতি সারতে হবে এই ছুটিতে।
#
সেই এ্যম্বুলেন্স ড্রাইভার, রিক্সাওলা ও তরমুজওলার কথা মার্কের কখনও জানা হয়নি। আমরাও জানতে পারিনি তারা এখন কোথায় কেমন আছেন। জানার আগ্রহও নেই কারও।


