সজল কান্তি সরকার
হাওরবেষ্টিত ভাটির লোকজন বর্ষাকালে অলস সময় কাটায়। বিশাল জলাশয়ে গ্রামগুলো তখন অসহায় ভেলার মত ভেসে থাকে। একটু বাতাস পেলেই শুরু হয় টালমাটাল ঢেউ।“মাটির উপর জলের বসতি জলের উপর ঢেউ, ঢেউয়ের সাথে পবনের পিড়িতি নগরে জানে না কেউ।” মাটির বাঁধে সবুজে ঘেরা গ্রামগুলোর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ভাটির মানুষগুলো সংগ্রাম করে প্রকৃতির সঙ্গে জীবনের মায়া সাঙ্গ করে। আবার প্রকৃতি যখন শান্ত তখন শুরু হয় জীবনের সুখের গল্প। আলগাঘরে পুরুষদের তাসখেলা, বাড়ির উঠোনে মহিলাদের ধামাইল গানের আসর, ছোট ছেলে মেয়েদের কুত্-কুত্ খেলা, মার্বেল খেলা, অতি বয়ষ্কদের পুঁথি পড়া বর্ষাকালে ভাটির গ্রামগুলোর সুখের দৃশ্য। বিশাল শান্ত জলাশয়ের গা বেয়ে ধামাইল গানের সুরগুলো তখন ভেসে যায় দূর অজানায়। আমন্ত্রণ জানায় দূরের যে কোন অচেনা অতিথিদের। অলস সময় বিলাসে শান্ত পড়ন্ত বিকেলে কেউ ‘ইরের’ কাছে বসে থাকে বড়শি নিয়ে মাছ ধরতে। আবার তার সাথে আরও কতগুলো অলস চোখ তাকিয়ে থাকে দূর সীমানায়, কে আসছে ‘নাও’ বেয়ে গ্রামের দিকে তার খেয়ালে। গ্রামে ভিড়ালে অতিথির নাও, আনন্দে জাগে সারা গাঁও। তোমার বাড়ির অতিথি আমার বাড়িতে নিমন্ত্রণ, এ যেন মধুর সম্পর্কের এক অনন্য উদাহরণ।
ভাটির মাটির মানুষগুলো প্রকৃতি থেকে শুধু দুঃখই পায় না সুখও পায় অনেক। যা আজ আমরা হাওরবাসী মর্মে মর্মে উপলদ্ধি করতে পারছি প্রকৃতির স্বাদ গন্ধহীন শহরের অট্টালিকায় থেকে। মন ও মননের স্বপ্নগুলো আজও হাওরপারের ভাটির মাটির মানুষগুলোকে নিয়ে জাল বুনে। অতীত স্মৃতিগুলো আজও আমাদেরকে ব্যাকুল করে তুলে। মন চায় এখনই ছুটে যাই ‘সেই আপন ঠিকানায়’।
মূলত গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক লোকসমাজেই লোকসংস্কৃতির উদ্ভব হয়েছে। পল্লী অঞ্চলই লোকসংস্কৃতির লালনক্ষেত্র। এখানেই তার সজীব অবস্থান ছিল, আছে এবং থাকবে। তবে শিক্ষিত সমাজে, শহরেও তার প্রচলন আছে সত্য কিন্তু পল্লীর সাধারণ লোকসমাজের তুলনায় অতি কম। পল্লীর মাটির মানুষগুলোর মাঝে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আচরিত হয়ে আছে লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি অর্থাৎ কবির ভাষায় বলা যায়-“পল্লীর প্রত্যেক পরতে পরতে লুকিয়ে আছে সাহিত্য এবং সাহিত্যের উপকরণ।” লোকসাহিত্যের অন্যতম উপকরণ লোকগীত। যার বিশেষ অংশ জুড়ে রয়েছে ধামাইল নৃত্যগীত। ধামাইল শব্দটি ‘ধামালী’ শব্দ থেকে সৃষ্ট। যার বিশেষ অর্থ হচ্ছে অঙ্গভঙ্গি করে নাচ-গান। ধামালীর অপিনিহিতজাত শব্দ ধামাইল। তবে ধামাইল শব্দের যথার্থ উৎস নিয়ে অনেক অভিমত ও মতপার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। অনেকের মতে ধামান, দামান, ধামালি, ধামন শব্দ থেকে ধামাইল শব্দের উৎপত্তি। ধামাইলের সময়কাল সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না তবে বড়– চ-ীদাসের শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনে ধামালী শব্দটি বারবার ব্যবহার হয়েছে। এতে বোঝা যায় তার প্রচলন বড়– চ-ীদাস যুগেরও আগে, তবে মধ্যযুগেও বিভিন্ন লোককবির কাব্যরচনায় ধামালীর উল্লেখ রয়েছে। অষ্টাদশ শতকেও ধামালী শব্দটি প্রয়োগ হয়েছে। মহাভারতে মহাকবি সঞ্জয়ও ধামালী শব্দটির প্রয়োগ করেছেন।
ধামালি বা ধামালী আভিধানিক অর্থে দুরন্তপনা। অথবা কৌতুক বা চাতুরী যা প্রাচীন সাহিত্যে লক্ষ্য করা যায়। ভাটিঅধ্যুষিত হাওর অঞ্চলে মৎস্যশিকারে ধামালী শব্দের বহুল ব্যবহার রয়েছে। মাছেরা পানির উপরিভাগে এসে লেজ নেড়ে ধামালী দিয়ে তারা আনন্দখেলায় মেতে ওঠে। আর এই ধামালী দেখেই মৎস্যশিকারী বুঝতে পারে কোন রকমের কোন আকৃতির মাছ। তাছাড়া হাওরাঞ্চলের কৃষিব্যবস্থায় বা জীবনাচারে ‘ধামালী বা ধামাইল’-এর যথার্ত প্রয়োগ রয়েছে। তাই পল্লীজীবনে বিভিন্ন পর্যায়ে ধামালী শব্দের ব্যবহার জীবন ঘনিষ্ট। পল্লী মানুষের হৃদয়ে ভালবাসা থেকেই এই ধামাইল গানের বিস্তৃতি। সে ব্যপারে কোন দ্বিমত নেই।
ধামাইল সাধারণত দু’ধরনের প্রচলিত আছে-
১.হাতেতালি ধামাইল
২.করতাল ধামাইল
তাছাড়াও ধামাইলের আরও শ্রেণি বিভাগ প্রচলিত রয়েছে। যেমন-
১.শ্রম ও কর্মবিষয়ক ধামাইল ঃ
ক.গোষ্ঠ ধামাইল
খ.বাঘের সিন্নি ধামাইল
গ.গৃহস্থালী ধামাইল
২.সাধন-ভজন বিষয়ক ধামাইল ঃ
ক.প্রার্থনা-বন্দনা বিষয়ক ধামাইল
খ.তত্ত্ব বিষয়ক ধামাইল
গ.রূপ ধামাইল
ঘ.মিলন ধামাইল
ঙ.বিচ্ছেদ ধামাইল
৩. ব্রত অনুষ্ঠানের ধামাইল ঃ
ক.উদয় ধামাইল
খ.সূর্যব্রত ধামাইল
গ.ধানের খিরবাস ব্রত ধামাইল
ঘ.রূপসীব্রত ধামাইল
৪.উৎসব বা আনুষ্ঠানিক ধামাইল ঃ
ক.কীর্তন ধামাইল
খ.পূঁজা-পার্বন বিষয়ক ধামাইল
গ. বিয়ের ধামাইল
ঘ. জল ধামাইল
৫.দেশাত্ববোধক ধামাইল
৬.শিশুতোষ ধামাইল
৭.বিবিধ ধামাইল
তবে কৃষি নির্ভর হাওরপারে সরাসরি গৃহস্থালি ধামাইলের প্রচলন অন্যান্য ধামাইলের তুলনায় অনেক কম। ধামাইল একটি সহজিয়া দলগত পরিবেশনা। শিল্পীদের আন্তরিক মেলবন্ধনে এ গান গাওয়া হয়। ধামাইল গান সাধারণত মেয়েরা দল বেঁধে হাতে তালি দিয়ে গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে নেচে নেচে গায়। বাড়ির উঠোনে বা খোলা আঙ্গিনায় এ গানের আসর বসে। শুরুতে একজন শিল্পী কোন রকম অঙ্গ-ভঙ্গি ছাড়াই গান শুরু করে একটি পদ গায় পরবর্তীতে নৃত্য-তালে সকলে মিলে দোহার দেয়। শুরুতে এক বা দুই তালিতে গানটি গাওয়া হয়। তারপর তিন বা চার তালি, আবার কখনও পাঁচ তালিতে গাওয়া হয়। শুরুতে ধামাইল গানে কোন প্রকার বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার হতো না। শুধু হাতে তালি দিয়ে গাওয়া হতো। বর্তমানে ঢোলের ব্যবহার হয়ে থাকে ধামাইলের নৃত্যশৈলী বাড়াতে। তবে বেশিরভাগ সময় সাধারণত দ’ুহাতে তালি দিয়ে চক্রাকারে ঘুরে সমবেত কণ্ঠে এ গান গাওয়া হয়। এক্ষেত্রে ‘করতাল’ ধামাইলেরও বিশেষ প্রচলন রয়েছে। সুর্যব্রত ধামাইলে যা লক্ষ্য করা যায়। যা রামকরতাল বা ঢাক বাজিয়ে পরিবেশন করা হয়। এ গানের মাধ্যমে সময় ও অনুষ্ঠানের উপযুক্ত বিষয়টাই ঝংকৃত হয় বলে তা সকলের মাঝে মোহময় আবেশের ঢেউ তুলে। মূলত সাতটি বিষয়ের উপর ধামাইল নৃত্যটি নির্ভরশীলÑ ১. হাতেতালি ২.হাতের আঙ্গুলে তুরি ৩.অঙ্গচালনা ৪.পদচালনা ৫.হস্তচালনা ৬. শিরচালনা এবং ৭.আঁখিচালনা। এই শপ্তক্রিয়ার সমভিব্যাহারেই ধামাইল নৃত্যের পূর্ণতা আসে। ধামাইল সিলেট ও বারাক উপত্যকার লোকসংস্কৃতিরও একটি জনপ্রিয় ও মুখ্য উপাদান। গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় বিবাহের বাগদান, মঙ্গলাচরণ, জলভরা, আদ্যস্নান, গায়েহলুদ, অধিবাস, ফুলচন্দন, বাসীবিবাহ, বর বিদায়, কনে বিদায়, বধূবরণ, উপনয়ন, সাধভক্ষণ, অন্নপ্রাশন, দুর্গাপূজা, মনসাপূজা, সরস্বতীপূজা ও সূর্যব্রতসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান ধামাইল ছাড়া সম্পন্ন হয় না। ধামাইল গান নিছক শুধু গানই নয় এটি লোকসংস্কৃতি বা সাহিত্যের একটি অঞ্চলের, জাতির জীবনবোধের গল্পও বটে।
পল্লী সাহিত্যের অফুরন্ত ভা-ার রয়েছে ধামাইল গানে। ধামাইল আসরকে কেন্দ্র করে গ্রামের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা একত্রে নিশি জাগরণ করে শ্রোতা হয়ে। মনে হয় এটি যেন মানবপ্রেমের মিলন মেলা। তাই পল্লীর প্রতিটি মেয়েই তার সঙ্গীতচর্চা শুরু করে ধামাইল গান দিয়ে। ধামাইল গান জানা মেয়েদের একটি বিশেষ গুণ, যার জন্য সমাজ তাকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করে। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় হাওরপারের এই ধামাইল গান আজ আর আগের মতো নেই। পল্লীর প্রত্যেক পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা সাহিত্য আজ যেন হারিয়ে যেতে বসেছে অপসংস্কৃতির বেড়াজালে।
ধামাইল গান সাধারণত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিয়ে কিংবা পূজাকে কেন্দ্র করেই বেশি গাওয়া হয়। প্রেম-বিরহ-বিচ্ছেদ নিয়ে বেশিরভাগ ধামাইল রচিত হয়েছে। যার মধ্যে রাধারমনের রচিত গানের সংখ্যাই বেশি। তাছাড়া মধু কবি, দীন শরৎ, প্রতাপরঞ্জন, গৌরচাঁন, বাবুমোহন, গোপীধন, উপেন্দ্র, মহানন্দ, রামজয়, রসরাজ ও শাহ আব্দুল করিম তাঁদের রচিত গানগুলো আমাদের চেতনাকে শানিত করে নতুন ভাবে। ধামাইলে সাধারণত বন্দনা, জলভরা, গায়ে হলুদ, অধিবাসের স্নান, বর আগমন, বিয়ে, জামাই স্নান ও বরযাত্রাকে কেন্দ্র করেই বেশিরভাগ প্রাণময় গানের আসর গড়ে উঠে।
ধামাইলে জামাই স্নানের একটি বিশেষ অংশ রয়েছে। বিশেষ করে নতুন জামাইসহ বাড়ির অন্য সকল জামাইদের একসঙ্গে বসিয়ে নানান রং তামাশায় ও রসিকতায় ধামাইল গান গাওয়া হয়। তবে বর পক্ষথেকে দাবি আদায়ের জন্য ধামাইলে ‘বান্দা’ গানের প্রচলন রয়েছে।
যেমন-“শুনতে শুন্ছি জামাইবাবু বড় ধনবান,
পান চিনি খাওয়াইয়া টাকা করবেন দান”।
এভাবে মহিলারা নতুন জামাইদের কাছ থেকে দাবি আদায় করে থাকে। অবশেষে জামাইদের স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পড়িয়ে মিষ্টিমুখ করে ধামাইল গানের আসর শেষ করে।
তাছাড়া ‘করতাল ধামাইল’ও হাওরপারে গাওয়া হয়। বিশেষ করে মাঘ ফাল্গুন মাসে হিন্দুদের সরস্বতী পূজাকে কেন্দ্র করে। উল্লেখ্য যে, গৃহস্থালি কাজ শেষ করে কৃষকেরা মেয়ে সেজে রাতের বেলায় ‘করতাল ধামাইল’ গাইতো। যা ‘বাঘেরসিন্নি’ নামে পরিচিত। গ্রামের সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ত তখন ‘হ্যাজাক’ জ্বালিয়ে একদল পুরুষ তামাশা করে ‘করতাল ধামাইল’ গেয়ে ‘বাঘেরসিন্নি’ মাগতো। প্রতিটি বাড়ির উঠোনে গিয়ে তারা প্রথমে
“সোনা বউ দিদিগো দরজা খোল,
বাত্তি জ্বালাও চাই,
বাত্তিটি জ্বালাইয়া দেখ কমলিনী রাই”।
এই গানটি গেয়ে গৃহকর্তাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে জাগিয়ে তোলতো। তবে বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে পাহাড়ের নিকটবর্তী এলাকায় গৃহস্থ পরিবারের যুবক ছেলেরাও এ গান গেয়ে থাকে। তাছাড়া ভাটি বাংলার রাখাল সমাজ রাতেরবেলায় হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধামাইল গান গেয়ে ‘বাঘের সিন্নী’ মাগতো। সেক্ষেত্রে তারা করতালি ধামাইল বেশি পরিবেশন করত। যার শারীরিক অঙ্গভঙ্গি ও নৃত্যশৈলী হতো একটু ভিন্নতর।
‘ময়না যাইছনারে জঙগলার মাঝে বাঘ আইতাছে’,
‘পিরিত কইরা যন্ত্রণা মন মিলে মানুষও মিলে সময় মিলে না’
এসব গান নিস্তব্ধ রাত্রিতে ঝংকৃত হয়ে ঘুমন্ত মানুষগুলোকে জাগিয়ে তুলত। তারপর গৃহকর্তা খুশি হয়ে তাদেরকে টাকা পয়সা অথবা চাল উপহার দিতেন। এসব টাকা পয়সা জমা করে পরবর্তীতে তারা গ্রামের সবাইকে নিয়ে বনভোজন করতো। তাই গ্রামীণ সমাজের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ধরে রাখতে ধামাইল গানের গুরুত্ব অপরিসীম বর্তমানে যা প্রায় বিলুপ্তির পথে। তাই ধামাইলের অস্তিত্ব রক্ষায় সকল জনপদের প্রত্যেকেই তার যথোপোযুক্ত মূল্যায়ন ও অনুশীলন অব্যাহত রেখে জাতীয় সংস্কৃতি বিকাশে ভুমিকা নেওয়া উচিত। হাওরপারের ধামাইল আসরে কাঁদা মাটির গন্ধ, সুশীতল বাতাস, রোদ বৃষ্টির খেলা ও মানুষের হৃদয়জাগানো সুর মানুষকে অভিভূত করে। শুধু তাই নয় একে অপরেকে হৃদয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখে জন্ম থেকে জন্মান্তর পর্যন্ত। জীবনের সুখ-দুঃখ, বিরহ-ভালবাসা, ও চাওয়া-পাওয়ার সকল সুর বেজে উঠে সেই ধামাইল আসরে।
আর সেই ধামাইল বলতে সাধারণত রাধারমণের ধামাইলকেই বুঝায়। কারণ ধামাইল গানের ৯৫ শতাংশই রাধারমণ রচিত। সাধারণত হাটে, ঘাটে, মাঠে, হাওরে-বাওরে, নৌকায় মাঝির কণ্ঠে ও লোকউৎসবে যার গান পল্লীর সর্বত্রই গীত হয় তিনিই রাধারমণ। তাই তিনি লোককবি।
দশম শতাব্দীতে রাজা মহীপাল দেবের সভাচিকিৎসক নরহরি দত্ত ছিলেন রাধারমণ দত্তের পূর্বপুরুষ। তিনি ছিলেন বীরভূম জেলার সপ্তগ্রামের অধিবাসী। তাঁর দুই পুত্র নরোত্তম দত্ত ও নারায়ণ দত্ত। নারায়ণ দত্ত ছিলেন রাজা জয়পাল দেবের রসবত্যাধিকারী অর্থাৎ অন্যতম পরামর্শক। নারায়ণ দত্তের দুই পুত্র ভানুদত্ত ও চক্রদত্ত। চক্রদত্তের আরেক নাম চক্রপাণি দত্ত। চক্রপাণি দত্ত ছিলেন তখনকার সময়ের সবচেয়ে বড় প-িত। তিনি ‘আয়ুর্বেদীপিকা’ ও ‘ভানুমতী’ নামে দুটি টীকাগ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর উপাধি ছিল ‘ভিষগাচার্য’। তিনিও সভাচিকিৎসক ছিলেন। রাজবৈদ্য চক্রপাণি দত্ত সিলেটের রাজা প্রথম গোবিন্দকেশব দেব (ভাটেরা তাম্রশাসন অনুযায়ী ১০৪৯ খ্রিস্টাব্দে) এর চিকিৎসার জন্য ৩ পুত্র উমাপতি দত্ত, মহীপতি দত্ত ও মুকুন্দ দত্তকে নিয়ে সিলেটে আসেন। রাজার আরোগ্য লাভের পর চক্রপাণি দত্তকে এদেশে বসবাসের অনুরোধ জানান তিনি। রাজার অনুরোধে তিনি ১ম পুত্র উমাপতিকে বীরভূম পাঠিয়ে মেজোপুত্র মহীপতি ও ছোটপুত্র মুকুন্দকে নিয়ে সিলেটে বসবাস করতে সম্মত হন। রাজা গোবিন্দকেশব তাঁদের অনেক ভূ-সম্পত্তি দান করেন। মহীপতি দত্তের নতুন বাসস্থানের নাম হয় সাতগাঁও যা তাঁর পূর্ববর্তী নিবাস সপ্তগ্রামের অনুকরণে। সেই থেকেই আমাদের দেশে বংশপরম্পরায় তাঁদের শাখা বিস্তার হয়।
মহীপতির পুত্র বিশ্বনাথ, তার পুত্র শ্যামসুন্দর, তার পুত্র শিবসুন্দর, তার পুত্র বাসুদেব, তার পুত্র পুরন্দর, তার পুত্র বলরাম, তার পুত্র গোপাল, তার পুত্র মদন, তার পুত্র বামন, তার পুত্র কল্যাণ, তার পুত্র প্রভাকর, তার পুত্র রুদ্রদাস, তার পুত্র জগন্নাথ, তার পুত্র সম্ভুদাস, তারপুত্র রামদাস, তার পুত্র মুকুন্দদাস, তার পুত্র রাজেন্দ্র দাস, তার পুত্র রামগোবিন্দ (অচ্যুতানন্দ) তার পুত্র দুর্লভরাম, তার পুত্র কৃষ্ণরাম, তার পুত্র রাধামাধব, তার ৩ ছেলে। রাধানাথ, রাধামোহন ও রাধারমণ। রাধামাধব দত্ত বাংলা ও সংস্কৃতভাষায় প-িত ছিলেন। জয়দেবের কাব্য ‘গীতগোবিন্দ’য় টীকাকার হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল অনেক। তিনি সংস্কৃতি ভাষায় ‘ভারতসাবিত্রী’ ও ‘ভ্রমরগীতা’ দুটি গ্রন্থ রচনা করেন। তাছাড়া বাংলা ভাষায় ‘কৃষ্ণলীলাব্য’ ও ‘পদ্মপুরাণ’ পাঁচালীগ্রন্থ ‘সূর্যব্রত’ ও গোবিন্দভোগের গান দু’টি তাঁর সংগীত প্রতিভার প্রমাণ। তাই উত্তরাধিকার সূত্রেই রাধারমণ তা পেয়েছেন। উল্লেখ্য যে, রাধারমণ দত্তের গ্রাম কেশবপুর তাঁর পূর্বপুরুষদের নামানুসারে। তাছাড়া তাঁর পূর্বপুরুষদের নামের সঙ্গে মিল রয়েছে সিলেট অঞ্চলের বালিশিয়া, সতরসতী, জগন্নাথপুর, প্রভাকরপুর, কেশবপুর, দত্তবিসনা, লাখাই, মিরাশি প্রভৃতি গ্রামের।
রাধামাধব দত্তের কনিষ্ঠ পুত্র রাধারমণের পুরো নাম রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থ। তিনি সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামে আনুমানিক ১৮৩৪ সালে (১২৪১ বঙ্গাব্দে) জন্মগ্রহণ করেন। আবার কারো কারো মতে ১৮৩৩ সালে (১২৪০ বঙ্গাব্দে) তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তবে অতিসম্প্রতি কেশবপুর গ্রামের রাধারমণ দত্তের ভিটা খননকালে পিতলের তৈরি একটি প্রাচীন শীলমোহর পাওয়া গেছে যাতে লিখা আছেÑ
সন ১২৪১ তাং
শ্রীরাধাকিসব দত্ত
পাঁচ তারিক শ্রীরাধা
মাধব দত্ত আতু
য়াজান।
রাধাকিসব (রাধাকেশব) নামে রাধামাধব দত্তের কোন পুত্রের নাম তাঁদের বংশতালিকায় পাওয়া যায়নি। রাধারমণের পিতৃদত্ত নাম রাধাকিসব বা রাধাকেশব হতে পারে। গুরুদত্ত (গুরু প্রদত্ত) নাম হতে পারে রাধারমণ। রাধারমণের অনুজ কেউ ছিলেন না। কাজেই ১২৪১ বঙ্গাব্দ ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দ তাঁর জন্মসাল বলে গ্রহণ করা যুক্তিযুক্ত। যা হতে পারে যেকোন মাসের ৫ তারিখ। তাঁর মায়ের নাম সুবর্ণা দেবী। স্ত্রীর নাম গুণময়ী দেবী। তিনি ৪ পুত্র সন্তানের জনক ছিলেন। রাসবিহারী, নদীয়াবিহারী, বিপিনবিহারী ও রসিকবিহারী।
রাধারমণ দত্ত ১২৫০ বঙ্গাব্দে শৈশবেই পিতৃহারা হন। তাই ছোটবেলা থেকেই বিচ্ছেদকাতর মনের অধিকারী রাধারমণ দত্ত সঙ্গীতে আত্মমগ্ন হয়ে মুক্তি খুঁজতেন। তিনি ১২৭৫ বঙ্গাব্দে মৌলভীবাজারের আধপাশা গ্রামে শ্রীচৈতন্যদেবের অন্যতম পার্ষদ সেন শিবানন্দের বংশীয় নন্দকুমার সেন অধিকারীর তনয়া গুণময়ী দেবীকে বিয়ে করেন। তিনি ঈশ্বরলাভের পদ্ধতি জানার জন্য বিভিন্ন সাধকের উপদেশসহ শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণবসহ বিভিন্ন মতবাদের অধ্যয়ন করেছেন। কিন্তু তার উত্তর খুঁজে পাননি। পরবর্তীতে তিনি মৌলভীবাজারের নিকটবর্তী, ঢেউপাশা গ্রামের সাধক রঘুনাথ গোস্বামীর কাছে ধর্মীয় দীক্ষা নেন। দীক্ষাগ্রহণের পর তাঁর ভাবান্তর হয় এবং তিনি সংসারের প্রতি বিরাগ অনুভব করেন। কৃষ্ণপ্রেমে বিভোর রাধারমণের হৃদয় কন্দরের শুষ্ক সুপ্ত প্রেম নির্ঝরিণী পরিপূর্ণ ও জাগ্রত হয়ে উঠে। ঠিক তখনি তাঁর তিন পুত্র ও স্ত্রী গুণময়ী দেবীর অকাল প্রয়াণে তিনি সংসার থেকে বিভক্ত হয়ে পড়েন। বিষয়বাসনা ত্যাগ করে বাড়ির অদূরে নলুয়া হাওরের পাশে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন সেখানেই সাধনায় মগ্ন হন। তার গানেও এর সমর্থন মেলে,
‘অরণ্য জঙ্গলার মাঝে বাধিয়াছি ঘর
ভাই নাই বান্ধব নাই কে লইব খবর।’
তিনি ধ্যানমগ্ন অবস্থায় গীতরচনা করতেন। ভক্তবৃন্দ গীত স্মৃতিতে ধরে রাখতেন। কেউ কেউ তা অক্ষরে প্রকাশ করে কালের ধুলোয় হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছেন।
যা আজ প্রজন্মান্তরে মানুষের কাছে পৌঁছে চেতনাবোধকে শাণিত করছে। রাধারমণ বৈষ্ণব তত্ত্বানুসারে প্রার্থনা, গৌরাঙ্গ বিষয়ক পদ, গুরুভক্তি বিষয়ক পদ, কৃষ্ণলীলার বিভিন্ন পর্যায়, গোষ্ঠ, পূর্বরাগ, অনুরাগ, আক্ষেপানুরাগ, দৌত, অভিসার, বাসকসজ্জা, খ-িতা, মান, বিরহ, মিলন নিয়ে তিনি পদ রচনা করেছেন। তাছাড়া বৈষ্ণব পঞ্চরসের মহাভাবের, অকৈতব কৃষ্ণপ্রেমের ও নাম মাহাত্ম্যের গীতিরূপ রচনায় তিনি কুশলতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি তাঁর সাধনস্থানে ১৩২২ বঙ্গাব্দে ২৬ কার্তিক শুক্রবার, ১৯১৫ সালে, কারো মতে ১৯০৭, ১৯১৬ সালে ইহধাম ত্যাগ করেন। তাঁর ইচ্ছেমত তাঁকে দাহ করা হয়নি। বৈষ্ণবমতে সমাহিত করা হয়। এইজন্য তাঁকে বৈষ্ণবকবিও বলা হয়।
তাছাড়া সাধনপ্রণালী হিসেব করলেও তাকে বৈষ্ণবকবি বলাই ভাল। তবে তিনি বৈষ্ণব না বাউল কবি তা অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিতর্ক। তবে শান্তিনিকেতনের প-িত অধ্যাপক ক্ষিতিমোহন সেন শাস্ত্রীর অভিমতÑবাউলেরা একটা স্বতন্ত্র ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়। এদিক বিবেচনা করলে রাধারমণ দত্ত সে শ্রেণির বাউল নয়। তবে রাধারমণ দত্ত তাঁর একাধিক গানেও নিজেকে বাউল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
দীনহীন বাউলে কয় কথা মিছে নয়
চন্দ্রবলীর কুঞ্জে তুমি গেছিলা নিশ্চয়
রাধারমণ বাউলে বলে আমার সবের আশা পূর্ণ হইল না ॥
আবার অন্যত্র তিনি বলেছেনÑ
আমার শাশুড়ি ননদী ঘরে ভয় বাসি মনে
ওরে কীসের সমন আমারÑযাইতাম গৌরার সনে ॥
রাধারমণ বাউল বলে গুরুর চরণে
ওরে গুরুপদে প্রাণ সঁপিতাম এই বাসনা মনে ॥
তিনি নিজেকে বাউল বলেই পরিচয় দিয়েছেন। সেই হিসেবে তাঁকে বাউলকবি হিসেবে মেনে নিতে আপত্তি থাকার কথা নয়।
তবে তাঁর গানে ও সুরে বৈষ্ণব ভাবধারাই বেশি প্রকটিত।
আবার তাঁর গানে মেলে,
‘মুর্শিদ বলি নৌকা ছাড় তুফান দেখি ভয় করিও না
মুর্শিদ নামে ভাসলে তরী অকুলে ডুবিবে না।’
আবার তিনি তাঁর গানে উল্লেখ করেছেন,
‘গোসাই রাধারমণ বলে এইবার এইবার
দুর্লভ মানুষ্য জনম না হইব আর।’
অন্য একটি গানে বলেছেন,
‘সখি কি করি উপায় যার লাগি বৈরাগী হইলাম তারে পাই কোথায়।’
তিনি সহজিয়া ধারায় উল্লেখ করেছেন,
‘অকুলে ভাসাইয়া তরী ও রইলাম রে লুকাইয়া
ভব নদীর ঢেউ দেখিয়া ও গুরু প্রাণ ওঠে কান্দিয়া।’
তবে তিনি মানবিক সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, বিরহ-মিলন নিয়েও গান রচনা করেছেন। গ্রামীণ পরিবেশে জলাভূমি, হাওর, নদীর প্রাধান্য তাঁর গানের বৃহৎ অংশ জুড়ে আছে। ‘ভব নদীর পার’ তাঁর গানে বারবার উচ্চারিত হয়েছে। তাছাড়া নিসর্গ, যেমন ফুল, লতা, নদী-নালা, হাওর, পাখি, গাছ-গাছালি সবই তাঁর গানে প্রকাশ পেয়েছে। তাছাড়া স্বদেশ সচেতনতা ও রাজনীতিতেও তাঁর গান লক্ষ করা যায়। যেমনÑ
বিলাতের কর্ত্তা জিনি মন হইবি স্বাধীন
মনরে হবিগঞ্জ, নবিগঞ্জ, কলিকাতা, তেলিগঞ্জরে
আশুগঞ্জের লাইনের ভিতরে মন আমার
ঘোরাবি কতদিন
তাছাড়া নৈতিক অধপতনেও তিনি গেয়েছেনÑ
দেখলাম দেশের এই দুর্দশা,
ঘরে ঘরে চুরের (চোর) বাসা ॥
রাধারমণ দত্তের অসংখ্য গান বাংলার আনাচে-কানাচে গীত হচ্ছে যার সঠিক হিসাব এখনও শেষ হয়নি। তবে এ পর্যন্ত ১০২৩ টি গানের প্রকাশিত হিসাব পাওয়া গেছে। রাধারমণের গান নিয়ে প্রথমেই যিনি সংগ্রহের কাজে ব্রতী হন অধ্যাপক যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য (১৯০৫-১৯৯০)। তিনি ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের ৫ পৌষ ৫৭টি গান সংগ্রহ করেন। তারপর গুরুসদয় দত্ত (১৮৮২-১৯৪১) তিনি ১৯৩৯ সালে ৩ সেপ্টেম্বর ৪২৩টি গান সংগ্রহ করে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের কাছে জমা দেন। তাছাড়া রাধারমণ গানের উপর ব্যাপক আলোচনা,চর্চা ও গবেষণা করেছেন এবং ধামাইল গান নিয়ে প্রকাশনা, সম্পাদনা করেছেন মোহাম্মদ মনসুর উদ্দীন, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন, মোহাম্মদ আজিজুল হক চুন্নু, আবদুল গফফার দত্তচৌধুরী, চৌধুরী গোলাম আকবর, মোহাম্মদ আবদুল হাই, মোহাম্মদ আসদ্দর আলী, নন্দলাল শর্মা, অমিতবিজয় চৌধুরী, তারেক আহমেদ চৌধুরী, মোহাম্মদ সুভাষউদ্দিন, মোহাম্মদ আলী খান, নৃপেন্দ্রলাল দাশ, ড. মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী, মোহাম্মদ নূরুল হক, ফজলুর রহমান, জাহান আরা খাতুন, মতিয়ার চৌধুরী, ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, শামসুল কবীর কয়েস, রব্বানী চৌধুরী, জুবায়ের আহমেদ হামজা, মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন, অনিল সেন, ড. তপন বাগচী প্রমুখ।
ধামাইল কবিদের এই মহান সৃষ্টিকে লালন করতে ‘হাওরপারের ধামাইল (হাপাধা)’ বাংলাদেশসহ অন্যান্য সংগঠনও নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যাতে অনেকেই যুক্ত হয়েছে তাঁদের প্রেমের মহিমায়। শুধু তাই নয় অনন্ত প্রেমের মহিমায় পরিপূর্ণ লোক সাহিত্যের সজীব উপাদান ধামাইল গান আবারো পূর্বের মত ঐতিহ্য ফিরে পেতে অনেকেই সংকল্প করে মিলিত হয়েছে হাওরপারের ধামাইল (হাপাধা) বাংলাদেশের পতাকা তলে। ভাটির কাদা মাটির মানুষের কোমল মননে আবারও জাগিয়ে তুলতে ধামাইল গানের চেতনা বোধ। প্রকৃতির শত বৈরীতার মাঝে বেঁচে থাকা কৃষিজীবীদের বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে ধামাইল গান যেভাবে বিনি সুঁতায় মালা গেঁথে ঐক্য ধরে রাখে,তা ফিরে পেতে ক্ষুদ্র প্রয়াস ‘ধামাইল আসর’ হয়তবা অনেকের হাস্য-রসের গাল-গল্পের বিষয় হতে পারে তার পরও যদি ধামাইল আসর সুশীল সমাজ গঠনে এতটুকু অবদান রাখে তবেই হবে তার সার্থকতা। তাই বিধাতার অনন্য সৃষ্টি ধামাইল শিল্পীদের অন্তরের অন্তস্থল থেকে ভালবাসা দিয়ে তার উপযুক্ত আসন তৈরির কাজে ব্রতী হওয়া উচিত। পরিশেষে বলা যায় রাধারমণ অসীম ভাবালোকের কবি। অলৌকিক সৌন্দর্যের কবি, রহস্যের কবি।
লেখক: হাওর গবেষক, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, হাওরপারের ধামাইল (হাপাধা) বাংলাদেশ।


