হাওরের পানিতে ইউরেনিয়াম নির্গমন – অনুমাননির্ভর প্রচারণার উদ্দেশ্য কী ?

হাওরের মাছ, হাঁসের মড়ক নিয়ে এবার এক ধরনের সুচতুর প্রচারণা শুরু হয়েছে। এই ধরনের প্রচারণা দুর্ভাগ্যজনক ও হাওরবাসীর সাথে অসংগত আচরণ বলেই আমাদের কাছে মনে হয়েছে। মাঠের শতভাগ কাঁচা ধান ডুবে গেছে এবার। ধান গাছ পঁচে হাওরের পানিতে এমোনিয়া গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে জলজ প্রাণী বিশেষ করে মাছ মারা যাওয়ার খবর আসছে বিভিন্ন হাওর থেকে। সরকারের মৎস্য অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞদল জেলার বিভিন্ন হাওরের পানি পরীক্ষা করে মাছ মরার জন্য উপরে বর্নিত তথ্যের উল্লেখ করেছেন। এর বাইরে আর কোন বিশেষজ্ঞ মতামত নেই। এর মাঝে শুরু হয়েছে নতুন এক সুক্ষ প্রচারণা যেটি শুরু করেছে ঢাকার একটি জাতীয় পত্রিকা এবং এখন এটি লুফে নিয়েছে প্রতিক্রিয়াশীল মহল। ইংরেজি দৈনিকটি মেঘালয় রাজ্যের রানীকর নদীর তীরে উন্মুক্ত ইউরেনিয়াম আহরণ ক্ষেত্র থেকে নির্গত বর্জ্য ওই নদী দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ এবং এজন্যই মাছের মড়ক লাগার একটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটিতে কোন ধরনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নীরিক্ষা বা গবেষণাজাত তথ্যের উল্লেখ নেই যাতে করে নিশ্চিত করে বলা যেতে পারে বাংলাদেশের হাওরে ইউরেনিয়াম বর্জ্য ঢুকছে।  রানীকর নদীটি বাংলাদেশের তাহিরপুর সীমান্ত সংলগ্ন টাঙ্গুয়ার হাওর ও জাদুকাটা নদীর অদূরে অবস্থিত। ওখানকার স্থানীয় খাসি অধিবাসীরা রানীকর নদী দূষণের জন্য ইউরেনিয়াম বর্জ্যকে দায়ী করছেন এমন একটি সংবাদ প্রকাশ হয়েছে মেঘালয় রাজ্যের একটি ইংরেজি দৈনিকে। এর বাইরে বর্ণিত অভিযোগের স্বপক্ষে আর কোন প্রমাণ বা নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। এই প্রচারণাটিকে এখন ব্যাপকভাবে লুফে নিয়েছে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যারা সস্তা ভারত বিরোধিতার নামে মাঠ গরম করেন তারা। বিশেষ করে তাদের পক্ষ হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বহু ব্যক্তি ওই সংবাদকে উপলক্ষ্য করে নোংরা খেলায় মেতে উঠেছেন। তারা সংবাদটির পূর্ণাঙ্গ বাংলা অনুবাদের পরিবর্তে খ-িত মনগড়া বাংলা ভাষ্য ফেসবুকের মাধ্যমে ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা শুরু করেছে। এরা হাওরের বর্তমান মাছের মড়কের জন্য মেঘালয় রাজ্যের ইউরেনিয়াম বর্জ্য নির্গমনকে নিশ্চিত সত্য বলে প্রোপাগা-া শুরু করেছে। এতে করে হাওরবাসী ব্যাপকভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং হাওর দূষণের প্রকৃত কারণটি আড়াল হয়ে পড়ছে। আমরা মনে করি এই ধরনের উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণার ফলে আমাদের দুর্যোগটি একটি ভিন্ন খাতে চলে যাবে যেখানে বিশেষ কোন গোষ্ঠী ফায়দা হাসিলের সুযোগ পাবে। এ বিষয়ে হাওরবাসীকে সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেকে অনেক এজেন্ডা বাস্তবায়নে কৌশলী ভূমিকায় নিয়োজিত রয়েছেন। উপমহাদেশে ভারত ও চীনের পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টি এক্ষেত্রে সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য। একটি এলাকার দুর্যোগও হয়ে উঠতে পারে ওই প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ, হাওরের মড়ক নিয়ে এক ধরনের অনুমান নির্ভর প্রচারণা দেখে অনেকে তাই মনে করছেন। ইউরেনিয়াম রেডিয়েশন কিংবা এর বর্জ্য নিগর্মন একটি সাংঘাতিক মহা বিপর্যয় তৈরিকারী ঘটনা । মানুষ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রতিবেশে এর দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর প্রভাব বজায় থাকে। এরকম স্পর্শকাতর বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে কোন ধরনের প্রচার চালানোকে সম্পূর্ণভাবে অনৈতিক মনে করা হয়। সরকারের উচিৎ কাজ হবে মেঘালয় রাজ্যের কথিত ইউরেনিয়াম বর্জ্য বাংলাদেশের হাওরে প্রবেশ করছে কিনা তা দ্রুত খতিয়ে দেখে জাতিকে অবহিত করা। নতুবা গুজবের ডালপালা গজাতে থাকবে আর এ থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার চেষ্টা করবে মতলববাজরা। আর সত্যিকার অর্থেই যদি ওরকম কোনকিছু থাকে তাহলে তো সর্বনাশ ঠেকাতে আরও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।