স্বপন কুমার দেব
নোয়ারা এলিয়াতে আগমন
গাড়ী চলছে নোয়ারা এলিয়ার (NUWARA ELYA) উদ্দেশ্যে। মাহেন্দ্র জয়বর্ধনে জানান দিলেন কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাবেন। দেহ মনে বেশ উত্তেজনা। প্রচ্যের স্কটল্যান্ড বা ইংল্যান্ড বলে কথা। গাড়ী আরো উপরে উঠছে। রাস্তার দু’পাশে নয়নাভিরাম চা বাগান। মাঝে মাঝে ছোট ছোট গঞ্জের মতো স্থানে দোকানপাট, সবজির পসরা। কেন জানি মনে পড়ে শিলং শহরের কথা। ভারতের মেঘালয়ের রাজধানী শিলং শহর আমার দেখা সুন্দরতম একটি শৈল শহর। যেমন আয়তনে বড় তেমনি নয়ন মনোহর। ছোটবেলা থেকে বড়বেলা অনেকবার শিলং গিয়েছি। কিন্তু দেখার আনন্দ একবিন্দু কমেনি। ১৯৭১ এর স্মৃতি বিজড়িত শিলং এখনও নিশ্চয়ই আগের মতোই আছে। এক সময়ে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের প্রচুর বাঙালির বসবাস ছিলো শিলং এ। এখন নেই। যাই হোক সেটি ভিন্ন আরেকটি দিক। শিলং এ গুচ্ছ গুচ্ছ ক্রিসানথিমাম ফুল, চড়াই-উৎরাই, অগনিত বাগান, বাতাসের শন্ শন্ আওয়াজ, পাহাড়ী ছড়া আর ঝরনার বয়ে যাওয়া গতিবেগের বিচিত্র শব্দ। একপাড়া থেকে আরেকপাড়া সর্বত্র পাহাড়ী উঁচু-নিচু রাস্তা। পাইন উড্ আর সরল গাছের সমাহার। রাতের আলোকমালায় অপূর্ব রূপে আবির্ভূত শিলংকে ভুলা যায় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নজরুল ইসলাম শিলং এর গভীর প্রেমে পড়েছিলেন। কবিগুরু রচনা করেন ‘শেষের কবিতা’ নামের এক কাব্যময় প্রেমের উপন্যাস। আর জাতীয় কবির হাতে রচিত হয় অতি সুন্দর প্রেমের গল্প ‘শিউলি মালা’। দুটিই বিচ্ছেদের। বিচ্ছেদই প্রেমের মেলোড্রামা। গাড়ী ঢুকে গেছে নোয়ারা এলিয়াতে। দুপুর বেলাতেই অন্ধকার। ছোট খাটো শহর। লোকজন কম। যারা রাস্তাঘাটে আছেন তারা গরম কাপড়, রেইনকোট কিংবা ছাতা মাথায় ঘুরাঘুরি করছেন। অনেকটা শিলং এর মতোই লাগছে। তবে শিলং এর একটা মিশ্রন ভাব আছে। কিন্তু নোয়ারা এলিয়াতে সবই যেন সাহেব সুবোদের আস্তানা। মাহেন্দ্র গাড়ী ঘুরাতে ঘুরাতে একটা সরু রাস্তা দিয়ে বেশ কিছু উপরে উঠে একেবারে হোটেল চত্বরে এসে থামলেন। বেশ বড় লন। একাধিক গাড়ী পার্ক করানো আছে। এছাড়া আছে বড় একটি গ্যারেজ। হোটেলটি বেশ উঁচুতে থাকায় অনেকেই দাঁড়িয়ে চারিদিকের নয়নাভিরাম দৃশ্য উপভোগ করছেন। খচখচ ফটো উঠছে। মেঘমালা পাশ দিয়ে ঘুরে যায়। যেন চেরাপুঞ্জির মতো। মাহেন্দ্র তাগিদ দিলে আমরা হোটেলে চেক ইন করলাম। হোটেল নূতন হলেও কায়দা পুরানো। বড় রুমে কাঠের মেঝে। এক পাশের বিরাট আকারের জানালা দিয়ে অনেক দূর অব্দি ছবির মতো শহর দৃশ্যমান। দুপুরেই যেন সন্ধ্যা নামবে। তাই তাড়াতাড়ি লাঞ্চ খেয়ে নীচে নেমে আসি। মাহেন্দ্রও খাওয়া দাওয়া শেষে রেডী। আমরা রওয়ানা দিলাম সীতা দেবীর মন্দিরের উদ্দেশ্যে। এটি শহর থেকে ৫ কি.মি দূরে। বলা যায় শহরতলী। জায়গাটি পরিচিত ‘সীতা এলিয়া’ নামে। মন্দিরের ১ কি.মি আগে বিখ্যাত বোটানিক্যাল গার্ডেন। অশোকবনকে কেন্দ্র করে মন্দিরটি গড়ে উঠে। পৌরাণিক মহাকাব্য রামায়নের বর্ণনা অনুযায়ী লংকার রাজা রাবণের রাজ্যে অন্তর্গত এই অশোক বন। রাবণ যখন সীতাদেবীকে অপহরণ করে নিয়ে এসে নিজের বিলাস বহুল রাজ প্রাসাদে রাখতে চান তখন সীতা দেবী তা প্রত্যাখ্যান
করেন। সীতাদেবী পার্শ্ববর্তী অশোক বৃক্ষের তলে থাকতে রাজী হলে উনাকে সেই বাগানে অশোক বৃক্ষের নীচে বেদী তৈরী করে দিলে তিনি সেখানে অবস্থান করতে শুরু করেন। সেই থেকে পুরো উদ্যানের নামকরন হয় অশোক বন বা অশোক বাটিকা। রাবণ মন্দ এবং দুষ্ট হলেও উনার স্ত্রী দেবী মন্দাকিনী ছিলেন অত্যন্ত ভালো একজন মহিলা। তিনি অশোক বনে এসে সীতা দেবীর সঙ্গে দেখা করতেন। আর হনুমানও এখানেই সীতাদেবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রামের দেয়া আংটি দেখিয়ে নিজ পরিচয়ের বিশ্বাস যোগ্যতা অর্জন করেন। রাম রাবণের যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত সীতা অশোক বনেই ছিলেন। এখান থেকেই উনাকে উদ্ধার করা হয়। যুদ্ধের সময় হনুমান অশোক বনে অবস্থিত রাবণের প্রমোদ ভবন ধ্বংস করে দেন। ৫.কি.মি দেখতে দেখতে শেষ। আমরা পৌঁছে গেলাম মন্দিরের সামনে। গাড়ী থেকে নেমে সিঁড়ি দিয়ে বেশ নীচে মন্দির। মন্দিরটি মাঝামাঝি আকৃতির। ঠিক লাগোয়া পেছনেই অশোক বন। হ্যাঁ বাস্তবেই অশোক বন। পাহাড়ী টিলার মত অনেক জায়গা নিয়ে বিস্তৃত। প্রচুর বৃক্ষরাজি। সম্ভবত: অশোক গাছ। মন্দিরটি প্রাচীন নয়। যারা মন্দির তৈরীর উদ্যোগ নিয়েছিলেন তারা প্রথমে একটি ট্রাস্ট গঠন করেন। অত:পর মন্দির তৈরীর কাজ শুরু করেন। প্রকৃতপক্ষে মন্দিরটি অশোকবনেরই একটি অংশ। উদ্যোক্তারা ঠিক যে জায়গায় সীতাকে, রাবণ বন্দী করে রেখেছিলেন সেই সঠিক জায়গাটি চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। তাদের দাবি মতে সেই স্থানেই মন্দির নির্মিত হয়েছে। মন্দিরে একাধিক মূর্তি আছে সীতাদেবীর। এছাড়া রাম লক্ষ্মণ এবং হনুমানের মূর্তিও আছে। স্থাপত্য শৈলী দক্ষিণ ভারতীয় মন্দিরগুলির মতো। পুরোহিত কর্মী সবাই তামিল। ট্রস্টি বোর্ড মন্দির পরিচালনা করেন। মন্দিরের গা ছুঁয়ে একটি বহতা পাহাড়ী ঝরনা। কথিত আছে, সীতা দেবী এই ঝরনার জলে ¯œান করতেন এবং সর্বক্ষণই স্বামী রামের পূজো করতেন। প্রার্থনা করতেন রামচন্দ যেন অতি সত্ত্বর উনাকে এই বন্দীশালা থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যান। মন্দির সম্প্রসারণের জন্য লাগোয়া অনেক খালি জায়গা সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। অনেক পর্যটক সারা দিনই মন্দির পরিদর্শন করতে আসেন। এই অশোক বনকে ঘিরে রাম রাবনের বিরাট যুদ্ধ হয়। রচিত হয় মহাকাব্য রামায়ণ। সীতা উদ্ধার হলেও সীতাদেবীর জীবনে আর সুখ আসেনি। দেশে ফিরে গেলে নানা কথা উঠে রাবণের বন্দী শালায় অবস্থান নিয়ে। সীতা অগ্নি পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হলেও রাজ প্রাসাদ ত্যাগ করতে হয়। দুই পুত্র লব ও কুশকে নিয়ে মুনির আশ্রমে বসবাস করতে থাকেন। রামের অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়াকে যুদ্ধ করে আটকে দেন লব ও কুশ। বিরাট মহাকাব্য রামায়ণ অতি প্রাচীন হলেও আধুনিক জীবন যাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ঘন্টাখানেক সীতা দেবীর মন্দির পরিদর্শন শেষ করে আবার রওয়ানা দিলাম নোয়ারা এলিয়ায়। ইতোমধ্যে বিকেলেই সন্ধ্যা নেমে গেছে। চারিদিকে বাতি জ্বলে উঠেছে। বৃষ্টি পড়ছে। নোয়ারা এলিয়াতে চলে এলাম সামান্য সময়ে। শহর আলো ঝলমলে। আমরা এদিক সেদিক ঘুরে ঘুরে শহর দেখতে থাকি। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড দেখিনি। কিন্তু ছবি দেখেছি। ছবির দেখার মতোই এই শহর। সীতা মন্দির থেকে আসার সময় একটা বড় লেক পেরিয়ে এসেছিলাম। লেকে নৌকা বিহার চলছিল। পাড়ে পাড়ে মেলা। লেকের ওপাড়ে সাজানো ঘরবাড়ী আর বাগান। শহর পরিক্রমা করতে করতে একসময়ে সত্যিই সন্ধ্যা হয়ে যায়। এবার হোটেলে ফিরতে হবে। ভাবলাম রাতে খাবার জন্য কিছু শুকনো খাবার কিনে নিয়ে যাই। মাহেন্দ্র’র উপদেশ মতো কারগিলে ঢুকলাম। এই কারগিল পাক-ভারত যুদ্ধে কাষ্মীরের কারগিল নয়। এই ‘কারগিল’ হলো শ্রীলংকার একটি চেইন শপ বা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। শ্রীলংকার প্রায় সব শহরে কারগিলের শাখা আছে। আমাদের দেশের ‘স্বপ্ন’ চেইন শপের মতো। কারগিলে ঢুকে ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকি। থরে থরে সাজানো জিনিসপত্র। যার যার পছন্দ মতো ক্রেতারা ট্রলিতে তুলে নিচ্ছেন। আমাদের দেশের মতো একই রকম কায়দা-কানুন। আমরা নিলাম ছোট একটি পাউরুটি আর ছোট একটি বাটার বা মাখনের প্যাকেট। প্রথমদিকের এক সংখ্যায় শ্রীলংকান রুপীর মূল্যমান প্রসঙ্গে এ বিষয়ে উল্লেখ করেছিলাম। পাউরুটির যে সাইজ তা আমাদের দেশে মূল্য হবে ত্রিশ থেকে পয়ত্রিশ টাকা। আর মাখন হবে নব্বই টাকা। কাউন্টারে গিয়ে যখন জমা দিলাম সেলসম্যান চেক্ করে মূল্য জানিয়ে দিলেন পাঁচশত শ্রীলংকান রুপী। আমরা ইতোমধ্যে দামদর সম্পর্কে অনেকটা জেনে গেছি। কাজেই এতটা হতবাক বা আশ্চর্য না হলেও কিছুটা তো হয়েছি। কি আর করা যায়। বাজার সদাই নিয়ে আবার গাড়ীতে উঠে রওয়ানা দিলাম হোটেল পানে। এদিকে রাত আর ঠান্ডা দুটোই ক্রমশ: বাড়ছে। (চলবে)
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী ও কথা সাহিত্যিক
- হাওরের পানিতে ইউরেনিয়াম নির্গমন – অনুমাননির্ভর প্রচারণার উদ্দেশ্য কী ?
- ছাতকে কবরস্থানের রাস্তায় দেয়াল নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সভা


