হাওরে নুতন করে সড়ক নির্মাণ না করার মন্ত্রীসভার সিদ্ধান্তটিকে আমরা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছি। গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রীসভার বৈঠকে হাওরে নতুন করে আর কোনো সড়ক না বানানোর কথা বলে দরকার হলে এলিভেটেড সড়ক বা উড়াল সড়ক নির্মাণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। হাওরের চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য সমুন্নত রাখতে এই সিদ্ধান্তটি ভালো ভূমিকা রাখবে বলে আমরা মনে করি। হাওরের ফসলরক্ষার জন্য বছর বছর যে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয় সেগুলো ধীরে ধীরে হাওরের ভৌগোলিক চরিত্র নষ্ট করে দিচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এসব অস্থায়ী বাঁধের কিছু অংশ বর্ষা মৌসুমে কেটে দেয়া হয় হাওরে পানি প্রবেশ করার জন্য। আবার এমনিতেই বাঁধের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাটি হাওরে পতিত হয়। এতে হাওরের যে প্রাকৃতিক গামলাকৃতি সেটি বিনষ্ট হচ্ছে। হাওরের বহু জায়গা অনাহুতভাবে উঁচু হয়ে পড়ছে। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অস্থায়ী বেড়িবাঁধ দিয়ে পাহাড়ি ঢল ও আকষ্মিক বন্যার হাত থেকে হাওরকে চূড়ান্তভাবে বাঁচানো যায় না। যেসব বছর এরকম ঢল হয় সে বছরগুলোতে বাঁধগুলোর অকার্যকারিতা চোখে পড়ে। যেমন এবারও পাহাড়ি ঢলের প্রাথমিক চাপ সামলাতেই ব্যর্থ হয়েছে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধগুলো। বাঁধে দুর্নীতি হয় সত্য,বাঁধ নির্মাণ কাজ কিছু ব্যক্তির পকেট ভারী করার নৈমিত্তিক ব্যবস্থা হিসাবেও বেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমাদের অভ্যাসের মধ্যে যেভাবে দুর্নীতি শিকড় গেঁড়ে বসেছে তাতে এই ভয়াবহ দুর্নীতিগ্রস্ততা সহসা দূর হওয়ার কোনো লক্ষণ দৃশ্যমান নয়। দুর্নীতি বিষয়টি আমাদের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার সাথে ওতপ্রোত হয়ে গেছে। ক্ষেত্র বিশেষে দুর্নীতির পরিমাণের হ্রাস/বৃদ্ধি ঘটে মাত্র। সুতরাং ভবিষ্যতে ক্রমাগত এই অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণের নামে সরকারি তহবিলের শত কোটি টাকার অপচয় করে যাওয়ার কী অর্থ থাকতে পারে আমরা বুঝতে অক্ষম।
তবে হাওর রক্ষায় বাঁধকে একেবারে বাদ দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। আসল কাজ হলো হাওরে বাঁধ দিতে হবে তবে এসব বাঁধে পানির চাপ কমাতে হবে। অর্থাৎ হাওরের পরিবর্তে যাতে ঢলের পানি অন্যত্র প্রবাহিত হতে পারে সেই ব্যবস্থা করাটাই হলো আসল। সকলেই একমত যে, এজন্য ব্যাপক ও পরিকল্পিতভাবে নদী খনন করতে হবে। হাওর অঞ্চলের পানি পাহাড় থেকে উৎপন্ন নদী থেকে সুরমা ও অন্যান্য নদী দিয়ে মেঘনায় প্রবাহিত হয়। পানির এই গতিপথকে গভীর, প্রশ্স্ত করতে হবে যাতে পাহাড়ি ঢল হাওরে ঢুকার বদলে মেঘনামুখী হওয়ার পথ পেয়ে যায়। তাহলে হাওরমুখী পানির চাপ কম থাকবে আর এতে করে বাঁধের উপর পানির চাপ কম থাকবে। এতে প্রচলিত অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণে সরকারি ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পাবে। তবে নদী খনন কাজ বেশ ব্যয় ও সময়সাপেক্ষ। এটি এমন নয় যে এক বছর নদী খনন করলেই বছর বছর নাব্যতা বজায় থাকবে। পলি-বালি পড়ে নদীর নাব্যতা কমবে। তাই নদী খননের বিষয়টি হতে হবে ধারাবাহিক অর্থাৎ যখন প্রয়োজন তখনই নদী খননের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
হাওরের উল্লেখযোগ্য ফসল হানির পর সরকার হাওর নিয়ে আবারও নতুন করে চিন্তা শুরু করেছেন। হাওরে সড়ক নির্মাণ না করার সিদ্ধান্ত এরই বহিঃপ্রকাশ। আমরা আশা করি হাওর রক্ষায় সরকার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করবেন। এই মহাপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও স্বচ্ছতা অনুসরণ করতে হবে। হাওর এলাকা দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার অন্যতম আধার। হাওরের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোরও অনেক সুযোগ রয়েছে। সুতরাং দেশের অমূল্য হাওরসম্পদকে বাঁচাতে সরকার নিশ্চয়ই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দিকেই এগোবেন যার আলামত আমরা গত মন্ত্রীসভার বৈঠকেই দৃশ্যমান বুঝতে পারছি।

