সাইদুর রহমান আসাদ
শাল্লা উপজেলার হবিবপুর ইউনিয়নের নারায়ণপুর গ্রামের বাসিন্দা সংকর সরকার (২২)। বাবা মারা গেছেন ১৪ বছর আগে। পরিবারে মা ও ৩ বোন নিয়ে ৪ সদস্যের সংসার। পিতাহীন সংসারে অনেক কষ্ট করে ২ বোনকে বিয়ে দিয়েছেন। ভেবেছিলেন ছোট বোন রুম্পা রানী দাসকে পড়াশুনা করিয়ে ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে নিজে সংসার পাতবেন। কিন্তু গত বছরের ১৮ এপ্রিল হাওরে ফসলের জমিতে যাওয়ার পথে বজ্রপাতে মারা যান তিনি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে বর্তমানে পরিবারটি পথে বসার উপক্রম হয়েছে।
সংকর সরকারের বোন জামাই রাতুল দাস বললেন, আমার শ^াশুড়ির নাম রেবা রানী দাস। শ^শুর মারা গেছেন প্রায় ১৪ বছর হলো। একমাত্র ছেলেকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে ছিলেন। কিন্তু সে ছেলেও গেল বছর বজ্রপাতে মারা গেছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তাদের এখন পথে বসার উপক্রম হয়েছে।
বর্তমানে ২ সদস্যের পরিবারটি কীভাবে চলে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি মোটর সাইকেল চালাই। আমারও ২ ছেলে মেয়ে রয়েছে। কষ্ট হলেও আমিই তাদের দেখাশোনা করি।
রেবা রানী দাস বলেন, আমার ছেলে থাকতে অভাব বুঝিনি। পরিবারের সকল খরচ সেই বহন করতো। সে মারা যাওয়ার পর কিছু জমি-জমা ছিলো সেগুলো বন্ধক দিয়ে পরিবার চলতেছে। আমার বড় মেয়ের জামাইও দেখাশুনা করে। এখন আমায় নিয়ে চিন্তা করি না। ঘরে থাকা মেয়েকে নিয়েই চিন্তা। বিয়ের বয়স হয়েছে। ওর ভবিষৎ কী?
সংকর সরকারের ছোট বোন রুম্পা রানী দাস শাল্লা ডিগ্রী কলেজ থেকে এবার এইসএসসি পাস করেছেন। এতোদিন ভাই সংকর তার পড়াশুনার খরচ যুগিয়েছে। এখন তাঁর অনুপস্থিতিতে অভাব অনটনের জন্য আর পড়াশুনা করতে চায় না সে।
রুম্পা রানী দাস বলেন, আমার বাবা ছোট বেলায় মারা গেছেন। পরে সংসারের হাল আমার একমাত্র ভাই ধরেছে। আমার ভাই পড়াশুনা না করে আমাকে পড়াশুনা করিয়েছে। নিজে অন্যের জমিতে কাজ করে সংসার চালিয়েছে। এখন সংসারেই চলে না পড়াশুনা করবো কিভাবে।
জেলা দুর্যোগ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্রে জানা যায়, গেল ৩ বছরে সুনামগঞ্জে ৩৭ জন বজ্রপাতে মারা গেছেন। সবাই সাধারণ কৃষক। এই কৃষি কাজ করতে গিয়েই বজ্রপাতে মারা গেছেন তারা। এরমাঝে সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন দিরাই উপজেলায় ১২ জন। জামালগঞ্জ উপজেলায় মারা গেছেন ৯ জন। এছাড়াও ধর্মপাশা উপজেলায় ৮ জন, দোয়ারাবাজার উপজেলায় ৭ জন, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ২ জন, তাহিরপুর উপজেলায় ২ জন, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় ২ জন, ছাতক উপজেলায় ৩ জন, জগন্নাথপুর উপজেলায় ১ জন, বিশ^ম্ভরপুর উপজেলায় ১ জন ও শাল্লা উপজেলায় ১ জন বজ্রপাতে মারা গেছেন।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার পাঁচগুইয়া হাওরে ধান কাটার সময় ফরিদ মিয়া (৩৫) নামের এক কৃষক মারা যান। ফরিদ উপজেলার পাথারিয়া ইউনিয়নের গাজীনগর গ্রামের আমিরুল ইসলামের ছেলে। তার স্ত্রীসহ ৫ ছেলে-মেয়ে রয়েছে। ফরিদ মারা যাওয়ায় তার তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া বড় ছেলে পাবেল এখন আর বিদ্যালয়ে যায় না। অর্থনৈতিক টানাপোড়ায় সংসার চলছে তাদের।
ফরিদ মিয়ার স্ত্রী রুমী বেগম বললেন, গতবছর হাওরে গিয়েছিলেন তিনি। সঙ্গে ২ টি গরু ছিলো। অকস্মাৎ বজ্রপাতে তিনি মারা যান। ২ টি গরুও মরে যায়। এখন মানুষের কাছে বলে কয়ে সহায়তা নিয়ে সংসার চালাচ্ছি। অভাবের জন্য সন্তানদের বিদ্যালয়ে না পাঠিয়ে কাজে পাঠাই বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
সংসার কীভাবে চলে? প্রশ্নেও জবাবে তিনি বলেন, আমার ভাই একজন ওমান থাকে। সেখান থেকে কিছু টাকা পাঠায়। সে টাকা দিয়েই কোনমতে সংসার চালাই। নিজের জায়গা জমি নেই। অন্যের জমিতে ছোট একটা ঘর বানিয়ে থাকি। এখন সে ঘরটাও ভেঙে যাচ্ছে। একটু বৃষ্টি হলেই ৫ সন্তানকে নিয়ে খাটের তলায় আশ্রয় নেই।
গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর একই উপজেলার পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের ইসলামপুর (নতুনপাড়া) গ্রামের বাসিন্দা রইব্বা মিয়ার ছেলে মিঠু মিয়া (২৮) বজ্রপাতে মারা যান। দক্ষিণ সুনামগঞ্জের দেখার হাওরে মাছ ধরতে গিয়ে তিনি বজ্রপাতে নিহত হন। তার পরিবারেও ২ বোন ও ১ ভাই রয়েছে। তার মৃত্যুতে ছোট ভাই দুদু মিয়া (২২) ঢাকায় গার্মেন্সে চাকরি করে সংসারের হাল ধরেছেন। দুই বোনের মাঝে পারভিন বেগমের বিয়ে হয়েছে পাশের গ্রাম উসলপুর জামখলায়। সবার ছোট মেয়ে চন্দনা আক্তার কে নিয়ে মা সাবিয়া বেগম গ্রামের বাড়িতে থাকেন।
মিঠু মিয়া’র ছোট বোন চন্দনা আক্তার বললেন, আমার মায়ের অসুখ। টাকার জন্য চিকিৎসা করাতে পারছি না। বড় ভাই গত বছর মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা গেছেন। এরপর থেকে আরেক ভাই ঢাকায় কাজ করে কোনমতে সংসার চালাচ্ছেন। এখন এই এক ভাইয়ের রোজগার দিয়েই সংসার চলছে।
জগন্নাথপুর উপজেলায় বাউধরন গ্রামের তবারক মিয়ার ছেলে শিপন মিয়া (৩৩) হাওরে গরু ছড়াতো। সারা গ্রামের গরু সে-এই দেখাশুনা করতো। বিনিময়ে গ্রামবাসি যা দিতো তাই দিয়ে চলতো তার সংসার। অন্যান্য দিনের মতো গেল বছরের ১৮ এপ্রিল মাঠে গরু নিয়ে বের হয়েছিলো সে। পরে সেখানেই বজ্রপাতে সে মারা যায়। বর্তমানে তার স্ত্রী, ১ ছেলে ও ১ মেয়ে রয়েছে। বড় মেয়ের বয়স আড়াই বছর। সে মারা যাওয়ার ৩ মাস পর আরেকটি ছেলে জন্ম নিয়েছে। বর্তমানে পরিবারটি আর্থিক সংকটে রয়েছে। এদিকে শিপন মিয়া’র বড় আরও ৩ ভাই থাকলেও সকলেরই অভাব অনটনের সংসার। শিপন মিয়ার স্ত্রী শেফালি বেগম কে সহযোগিতা করার ক্ষমতা নেই বলে জানিয়েছেন তারা।
শিপন মিয়ার বড় ভাই ফুলসাদ মিয়া বলেন, আমাদের অভাবের সংসার। একবেলা খেলে আরেকবেলা উপোস থাকতে হয়। তাই আমরা তাদের সহায়তা করতে পারি না।
শিপন মিয়া’র স্ত্রী শেফালি বেগম বলেন, ভিটায় যে ঘর ছিলো সেটা ভেঙে গেছে। বৃষ্টি হলে দৌঁড়ে আরেকজনের ঘরে আশ্রয় নেই। মানুষের কাছ থেকে লিললা -খয়রাতি (সহায়তা) এনে ছেলে মেয়ের মুখে ভাত দেই। মানুষ যা দেয় তাই দিয়ে সংসার চালাই। না দিলে উপুস থাকি।
এদিকে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে যারা মারা গেছেন তারা সবাই কৃষক। জমিতে ফসল ফলাতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা গেছেন তারা। অনেকের পরিবারের একমাত্র উর্পাজনক্ষম ব্যক্তি চলে যাওয়ায় নিঃস্ব হয়েছেন। বর্তমানে তারা অসহায় অবস্থায় দিন পার করছেন। এদের পরিবারের পূর্নবাসন ও অর্থনেতিক সংকট দূর করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দীর্ঘকালীন পরিকল্পনা নেয়া প্রয়োজন।
হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য সচিব অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, এই কয়েক বছরে হাওরে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। অথচ ৫০ বছর আগেও বজ্রপাতে এতো মৃত্যু ছিলো না।
প্রকৃতিকে ধ্বংস করে উন্নয়নের পাশাপাশি মোবাইল টাওয়ারগুলো একটি থেকে আরেকটির সঠিক দূরত্ব না থাকায় বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক সময় বজ্রপাতে প্রচুর পরিমানে বিদ্যুৎ মোবাইল টাওয়ারের মাধ্যমে ভূগর্ভে চলে যায়। কিন্তু দুটি মোবাইল টাওয়াররের সঠিক দূরত্বে না থাকলে বজ্রপাতের থেকে সৃষ্ট বিদ্যুৎ হাওরের খোলা জায়গায় পড়ে যায়। এতে সাধারণ কৃষক মারা যায়।
সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির সহসভাপতি অ্যাড. খলিল রহমান বললেন, হাওরে বজ্রপাতে যারা মারা গেছেন তারা এলাকার ছোট কৃষক, অনেকে শ্রমিক। তাদের উপরেই নির্ভরশীল ছিলো পরিবার। আমরা দেখেছি তাদের পাশে সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক ২০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেয়া হয়েছে। আমরা মনে করি এই ২০ হাজার টাকা সহায়তা যথেষ্ট নয়। তারা যেহেতু আমাদের খাদ্য যোগান দেন তাই তাদের পরিবারকে নিয়ে সরকারে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেয়া প্রয়োজন। এজন্য তাদের সন্তানদের পড়াশুনার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। পাশাপাশি বজ্রপাত রোধে শুধু সভা সেমিনার নয় বরং কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান তিনি।
জেলা দুর্যোগ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, যারা বজ্রপাতে মারা গেছেন তাদের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। যদিও অনেক পরিবারের উপর্জনক্ষম একমাত্র ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে এই ২০ হাজার টাকা কিছুই না। এতে অনেকে অর্থনৈতিক সংকটে থাকলেও তাদেরকে এরচেয়ে বেশি সহযোগিতা করা আমাদের সুযোগ নেই।
সুনামগঞ্জ ৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলীয় হুইপ পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ এমপি বলেন, এটার জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ নেই। দুর্যোগ মন্ত্রণালয় থেকে যেটা দেয়া হয় এর বাইরে সহায়তা করার কোনো সুযোগ নেই। সরকারিভাবেও নিয়মিত ভাতা প্রদানের কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে স্থানীয় ইউনিয়ন থেকে সরকারি সহায়তা ভিজিএফ কার্ডের চাল বা ৩০ কেজি চাল দেয়ার কার্ড চেয়ারম্যান ব্যবস্থা করে দিলে তাদের জন্য ভালো হয়।


