সাইদুর রহমান আসাদ
শিল্প- সংস্কৃতির সুতিকাগার সুনামগঞ্জ। যে সুনামগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বৈষ্ণব কবি রাধারমন দত্ত, মরমী কবি দেওয়ান হাছন রাজা, জ্ঞানের সাগর বাউল দুর্বীন শাহ, বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিমসহ শত শত গুণী শিল্পী। এসব গুণী শিল্পীদের সৃষ্টি সঠিক সংগ্রহের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছেএ আরেক লোককবির সৃষ্টি সম্প্রতি মানুষের মুখে মুখে রয়েছে। যার গান নিয়ে প্রথম দিকে জনমনে দ্বিমত তৈরি হয়েছিলো।
‘আইলারে নয়া জামাই আসমানের তারা, বিছানা বিছাইয়া দেও শাইল ধানের নেরা। জামাই বও, জামাই বও।’ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গানটি ভাইরাল হওয়ার পর গানের রচয়িতা নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা যায়। পরে জানা যায় একুশে পদকপ্রাপ্ত সংগীত শিল্পী রামকানাই ও সুষমা দাশের মা দিব্যময়ী দাশ নয়া জামাই’এর গানের রচয়িতা।
গানের সহজ সুন্দর কথাগুলো শুনলেই বুঝা যায় এটা সুনামগঞ্জের আঞ্চলিক গান। এ গান সুনামগঞ্জের হারিয়ে যাওয়া শত বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য ধারণ করছে। গানের এই লাইনগুলো এখন দেশজুড়ে অসংখ্য মানুষের মুখে মুখে। এই নয়া জামাই, মানে নতুন বর, বরের বসার জন্য শাইল ধানের নেরায় (নেরা মানে খড়) বিছানা বিছিয়ে দেয়া হচ্ছে। এ সময়কেই গানে তুলে ধরা হয়েছে।
গানের রচয়িতা দিব্যময়ি দাশ’র বাড়ি শাল্লা থানার হবিবপুর ইউনিয়নের পুটকা গ্রামে। তাঁর স্বামী রসিক লাল দাশও গান লিখতেন এবং গাইতেন । তাঁরা পরে দিরাই উপজেলার চরনারচর ইউনিয়নের পেরুয়া গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তাদের দুই সন্তান পন্ডিত রামকানাই দাশ ও শিল্পী সুষমা দাশ বাংলাদেশের সংগীতের সর্বোচ্চ সম্মান ‘একুশে পদক’ পেয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুনামগঞ্জে হাওরে আগে শাইল ধানের আবাদ হতো। কয়েক জাতের শাইল ধানের মধ্যে ছিলো ইন্দ্রশাইল, কাকশাইল, ময়না শাইল, কামিনীশাইল, মোটাশাইল, কার্তিক শাইল প্রভৃতি। উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড ধান আসেনি তখন। বৈশাখ- জৈষ্ঠ্য মাসে শাইল ধান কাটার পর খড় যতœ করে রাখা হতো। এই খড় দিয়ে ঘর তৈরি করা হতো, মেহমানদের বিছানা পেতে দেয়া, গরুর খাবার, ধান সিদ্ধ দেয়া সহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হতো। গোলায় ধান তুলার পর শুরু হতো খড় দিয়ে ঘর বানানোর কাজ। অনেকে পুরাতন ঘরের চালে নতুন করে খড় দিতো। কারণ পরেই বর্ষা। বর্ষার প্রবল বর্ষণের হাত থেকে বাঁচতে খড় ছিলো মানুষের প্রধান উপকরণ। এজন্য যেদিন ঘর ছানি হতো, বাড়িতে ভালো খাবারের আয়োজন করা হতো। যার সত্যতা পাওয়া যায় বিলুপ্ত প্রায় বিভিন্ন প্রবাদ বাক্যে। ‘চাল ছানির কামলা চাচা দিলায় না, মায় দিছইন মোরগ জব আইয়া চাচা খাইলা না।’
শাল্লার বাহাড়া ইউনিয়নের আঙ্গারোয়া নোয়াগাঁও গ্রামের বড় কৃষক মাখন লাল দাস বললেন, ‘আগে খড়ই মানুষের একমাত্র প্রয়োজনীয় জিনিস ছিলো। টিনের ঘর ছিলো না। মানুষ খড় দিয়ে ঘর বানাইছে। আমাদের বাপ দাদাদের বড়বড় খড়ের ঘর ছিলো। ছোট বেলায় দেখছি যেদিন ঘর ছানি হতো সেদিন বাড়িতে থাকতো উৎসবের মতো ভাব। যারা ঘরের ছানি দিছে তাদের জন্য মোরগ জবাই ও ডিমের সালুন পাক করা হতো।’
দক্ষিণ সুনামগঞ্জের বড় কৃষক অরুণ বৈদ্য অপু বললেন, আমাদের বড় বাংলা ঘর ছিলো। স্মার্ট ফোন বা বিনোদনের কিছু ছিলো না তখন। বৈশাখে আবাদকৃত শাইল ধান ঘরে তুলার পরে সবাই বেকার থাকতো। চারদিকে পানি থাকার কারণে কোথাও যাওয়ারও সুযোগ ছিলো না। এসব গ্রামের তরুণরা বাংলা ঘরে এসে আড্ডা দিতো। বাংলা ঘরের মেঝেতে খড়ের বিচানা পেতে দেয়া হতো। বাড়িতে মেহমান আসলেও বাংলা ঘরে জায়গা করে দেয়া হতো। ২০- ৩০ জন মেহমান এক সঙ্গে থাকতে পারতো। কোনো অনুবিধা হতো না।
হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য সচিব অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালকদার বললেন, সুনামগঞ্জে আগে সবাই শাইল ধান আবাদ করতো। শাইল ধানের নেরা মানে খড়। এ খড়ের বহুমাত্রিক ব্যবহার ছিলো সুনামগঞ্জে। বিশেষ করে হাওরের উজান এলাকায় মেহমানদের বিছানা করা হতো শাইল ধানের নেরা দিয়ে। অনেকে এর উপরে কাপড় বা কাঁতা পেতে দিতো। নতুন জামাইয়ের বসার আসনে দেয়া হতো খড়। যুগের পরিবর্তনে এখন সবকিছুতেই আধুনিকতার ছোঁয়া। মানুষ বেড়েছে। তাই কৃষিতেও উন্নতর জাতের বীজের উদ্ভাবন হয়েছে। তবে আমাদের লোকজ সংস্কৃতিকে ভুললে চলবে না। লোকজ সংস্কৃতিকে ধারণ করেই আমাদের এগোতে হবে।
এদিকে কৃষকরা বলছেন, শাইল ধানসহ দেশীয় ধানের ফলন কম ও সে অনুযায়ী দাম না পাওয়ায় উচ্চ ফলনশীল ধান চাষ করেন তারা। ফলন কম হলেও দেশীয় ধানের চাল হাইব্রিড ধানের চাল থেকে সুস্বাদু। এজন্য ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে সে তুলনায় দাম নেই এই ধানের।
তাহিরপুরের শনির হাওরপাড়ের বড় কৃষক গোলাম সরোয়ার লিটন। তিনি এবার ৪০ কেয়ার (৩০ শতাংশে ১ কেয়ার) জমিতে ধান চাষ করেছেন। দেশীয় ধানের উৎপাদন কম হওয়ায় এবার উচ্চ ফলনশীল ধান চাষ করেছেন তিনি।
গোলাম সারোয়ার লিটন বললেন, এক সময়ে হাওরে ৯৫ ভাগ জমিতে দেশীয় জাতের ধান চাষ হতো। এই ধানের চাষাবাদের ক্রান্তিকাল ধরা যায় গত ২০ বছরের সময় কালকে। এখন শাইল ধানের কোনো চাষ হয় না হাওরে। যেহেতু এ ধানের চালের বাজারে চাহিদা রয়েছে তাই অন্য ধানের থেকে দাম বেশি হলে কৃষকরা আগ্রহ পেতো চাষ করা। কিন্তু কৃষক বান্ধব সে বাজার তৈরি হচ্ছে না। আর প্রযুক্তি উন্নত হওয়ায় খড়ের ব্যবহারও কমে গেছে। এখন শুধু গরুর খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয় খড়।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ফরিদুল হাসান বললেন, এবার শাইল জাতের কোনো বোরো ধান সুনামগঞ্জে আবাদ হয়নি। আগে হয়েছে প্রচুর। কারণ শাইল ধান আবাদ করলে জমিতে ধান কম হয়। তাই কৃষক ধীরে ধীরে উচ্চ ফলনশীল ধানের দিকে জোকে পড়েছে।
- দ.সুনামগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিকদের সাথে ইউএনও’র মতবিনিময়
- বিকাশ প্রতারক চক্রের নারীসহ ৩ সদস্য আটক


