হাওর ভাবনার ফলাফল প্রসঙ্গে

ডুবির ফলে শতভাগ বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ৫ মাস পেরিয়ে গেলেও আমরা এখন অব্ধি আলাপ-আলোচনার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছি, এটি দুর্ভাগ্যজনক। সামনের মৌসুমের জন্য একটি টেকসই হাওর ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির দেখা মেলে নি। এই অবস্থা বজায় থাকলে আর তিন মাস পর যখন হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ/সংস্কার শুরু করার সময় হবে তখন দেখা যাবে সেই পুরনো নিয়মেই সব চলছে। ব্যক্তির পরিবর্তন হয়তো ঘটবে নানা ক্ষেত্রে, লুটপাটের ভাগ-বাটোয়ারার পকেটও বদলাবে সত্য, কিন্তু ফলাফল সেই একইরকমের থাকবে। প্রকৃতি একটু রুষ্ট হলেই আমাদের কোটি কোটি টাকার তথাকথিত বাঁধ পানির তোড়ে ভেসে যাবে আর সাথে করে ভাসিয়ে নিবে এই জেলার ২৫ লক্ষ মানুষের স্বপ্ন-সাধও। মঙ্গলবার জেলার ধর্মপাশা উপজেলার প্রত্যন্ত ও হাওর বেষ্টিত মধ্যনগরে একটি বেসরকারি সংগঠন বাহারী নাম দিয়ে একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছিলেন যেখানে পদস্ত সরকারি কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। আমরা বুঝতে অপারগ, হাওরের উন্নয়নের জন্য কি হাওরের ভিতরে যেয়ে অনেক টাকা খরচ করে একটি সভা করার খুব প্রয়োজনীয়তা রয়েছে? সুনামগঞ্জসহ ভাটি অঞ্চলের হাওরের কী সমস্যা, এ থেকে পরিত্রাণের পথ কী, তা কি কারও অজানা? তাহলে কেন এইসব অনাবশ্যক প্রয়াস? আসল কাজ হলো অন্তত সামনের মৌসুমটি যাতে কোন ধরনের প্রতিকূলতা ছাড়া কৃষকরা ধান ঘরে তোলতে পারেন সেই ব্যবস্থা করা। অথচ এই জায়গায় দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি কারও নজরে পড়ছে না। পিআইসি গঠন, ঠিকাদারী প্রথা, কাজ শুরু ও শেষ করার মেয়াদ, তদারকী ব্যবস্থা এমনসব বিষয়ে পরিবর্তনের কোন কর্তৃপক্ষীয় ঘোষণা এখনও আসে নি। প্রচলিত নিয়মেই যদি এবারও কাজ শুরু হয় তাহলে আশ্চর্যের কিছু থাকবে না। কারণ আবারও ফসল বিপর্যয় হলে আবারও হাওরকেন্দ্রিক ভদ্রস্থ কর্মসূচীগুলো করার মওকা পাওয়া যাবে। কৃষকের কপাল তো প্রকৃতির সাথেই বাঁধা রয়েছে এই অঞ্চলে সেই সুদূর ঐতিহাসিক কাল থেকেই।
যারা হাওরের সমস্যার সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করছেন তাদের প্রতি আমাদের সবিনয় অনুরোধ, আপনারা সকলে সরকারকে এমন জায়গায় নিয়ে আসুন যাতে ভাগ্যাহত বোরো চাষীরা চোখের তারায় আশার ঝিলিক দেখতে পান। হাওরের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার সাথে আশু সমাধানের লক্ষ্যে স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা একই সাথে বাস্তবায়ন করা জরুরি। হাওরের ফসল বিপর্যয় ঘটায় এবার দেশের খাদ্য মজুদ পরিস্থিতিতে কেমন নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে চাল কেনার জন্য গলধঘর্ম হয়ে বিদেশ ছুটাছুটি করাই এর প্রমাণ। হাওর তথা কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের ফসল উৎপাদনকে সবধরনের ঝুঁকি থেকে মুক্ত করতে না পারলে তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়বে অপরাপর সব উন্নয়নের বালুর বাঁধ, এই সত্য মনে রাখতে হবে সকলকে। তাই আর কোন লোক দেখানো কিছু নয়, কাজের কাজ কিছু করুন সকলে মিলে। এই করার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো নিজের অস্তিত্বকে রক্ষা করা। আর যদি এই জায়গায় আমরা ব্যর্থ হই, এবারও হাওরের ফসল ডুবে যায় তাহলে এর দায় বহন করতে হবে সকলকেই।