হামলাকারীদের টার্গেট ছিল লুটপাট

বিশেষ প্রতিনিধি
শাল্লার হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম নোয়াগাঁওয়ে হামলাকারীদের টার্গেট ছিল অর্থ, স্বর্ণালংকার ও মন্দিরের মূল্যবান জিনিষপত্র লুটপাট। হামলাকারীরা ঘটনার সময় ৮৮ বাড়িতে ঢুকেই স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়েছে। ভাংচুরের চেয়ে সম্পদ লুটের লক্ষ্যই ছিল বেশি তাদের। প্রতিটি বাড়ির স্টিল ও কাঠের আলমিরা, শোকেস ভেঙে টাকা ও মূল্যবান দ্রব্যাদি লুটে নিয়েছে হামলাকারীরা।
গ্রামের ভানু রঞ্জন দাস বললেন, ঘরের শোকেসে ৯০ হাজার টাকা রাখা ছিল, হামলাকারীরা শোকেসের ড্রয়ারের তালা ভেঙে টাকা নিয়েছে এবং ওখানে রাখা আমার মেয়ের স্বর্ণালংকার নিয়ে যায়।
গ্রামের ফুলতারা রানী দাস বললেন, হামলাকারীরা গ্রামে ঢোকার পর দৌঁড়ে পালানোর সময় কিছুদূর গিয়ে আবার ফিরতে চেয়েছিলাম ওয়ারড্রপের ড্রয়ারে রাখা টাকা ও স্বর্ণের অলংকারগুলো নেবার জন্য। কিন্তু ততক্ষণে ওরা বাড়ির পাশে চলে আসায় ঘরে ফেরার সাহস পাইনি। রাতে এসে দেখেছি, ঘরের ভেড়ায় দায়ের কোপ, ওয়ারড্রপটি ভেঙে তছনছ, ড্রয়ারে ১০ হাজার টাকা ছিল, নিয়ে গেছে। কানের দুল ও গলার স্বর্ণের চেইন ছিল এগুলোও নিয়ে গেছে। কয়েকটা ভালো শাড়িও নিয়েছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎ চন্দ্র দাস ঘরের ভেতরেই ছিলেন। দু’দফায় আক্রমণ করে ঘরের দরজা ভেঙে হামলাকারীরা ঘরে ঢুকে তার। বয়স্ক এই মুক্তিযোদ্ধার গাঁয়ে থাকা মুজিব কোর্ট নিয়ে প্রথমে ব্যাঙ্গাত্মক মন্তব্য করে হামলাকারীরা। পরে তাকে টানা হেঁছড়া শুরু করে। এক পর্যায়ে টাকা-পয়সা সোনা দানা যা আছে বের করে দেবার কথা বলে ওরা। তিনি শোকেস থেকে ১০ হাজার টাকা বের করে দেন। টাকা পেয়ে ফিরে যায় হামলাকারীরা।
ঝুমন দাস আপনের স্ত্রী সুইটি রানী দাসও বাড়ি ছাড়েননি। তিনি বাঁশের টাইলে (ধান রাখার পাত্র) লুকিয়ে ছিলেন। হামলাকারীরা ফেরার সময় তার শাড়ির আঁচলের অংশ দেখে আবার ঘুরে গিয়ে চুলে ধরে বের করে তাকে। একজন বলে ওঠে ঝুমনের স্ত্রী। মার মালাউনের বাচ্চারে, পরে আরেকজন এসে তার ঘাড়ে রোল দিয়ে আঘাত করে। সুইটি মাফ করে দেবার জন্য বলেন। দু’জন চিৎকার দিয়ে তখন বলে কানের দুল ও গলার চেইন দেবার কথা বলে। সুইটি কানের দুলে হাত দিতে চাইলে, ওরা সময় দেয়নি নিজেরাই খুলে নেয়। পরে সুইটি শোকেস থেকে ১০ হাজার টাকা খুলে দেন। টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে ফিরে যায় তারা।
গ্রামের অসিম চক্রবর্তী বললেন, আমার বাড়ির বিষ্ণু মন্দিরে ঢুকে মাটির মূর্তি ভেঙেছে। শত শত বছর আগের কষ্টি পাথরের মূর্তি নিয়ে গেছে।
গ্রামের বাসিন্দা ইউপি চেয়ারম্যন বিবেকানন্দ মজুমদার বকুল বললেন, কেবল এই দুই তিন পরিবার নয়। সকলের ঘরের ভেতরেই চলেছে তা-ব। ঘর যতটানা ভাংচুর করেছে, ঘরের ভেতরের আলমিরা, শোকেস তার চেয়ে বেশি ভাংচুর হয়েছে। সকল বাড়িতে ঢুকেই ঘরের বাইরের কিছু ভাংচুর করেছে, ঘরের ভেতরে ভাংচুর করেছে বেশি। কাঠের, স্টিলের ওয়ারড্রপ, আলমিরা, শোকেস একটিও ভাঙার বাকী নেই। ভেঙে তছনছ করে লুটপাট করেছে হামলাকারীরা।
শাল্লা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলামিন চৌধুরী বললেন, হামলাকারীরা যেসব বাড়িতে ভাংচুর করেছে, সেই ৮৮ বাড়িতে গিয়েই দেখেছি টাকা, পয়সা, স্বর্ণাংলংকার এবং মূল্যবান জিনিস সকল বাড়ি থেকেই লুট হয়েছে। আলমিরা, শোকেস যাদের ছিল, সবারটাই ভেঙে লুটপাট চালিয়েছে তারা। যাওয়ার সময় হামলাকারীরা ফেসবুক লাইভে বলে গেছে এক কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি করে গেলাম। এই লাইভের ভিডিও ফুটেজ গ্রামের অনেকের কাছেই আছে। এই কথাগুলো ফেসবুক লাইভে বলার সময় দেশবাসীকে দেখারও আহ্বান জানিয়ে গেছে হামলাকারীরা।
জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য বিরোধী আন্দোলনের নেতা মাওলানা মামুনুল হকের সমর্থকরা বুধবার হামলা, লুটপাট ও ভাংচুর করেছে নোয়াগাঁও গ্রামের ৮৮ টি বাড়িতে। এসময় গ্রামের ৫ টি মন্দির ভাংচুর করা হয়। নোয়াগাঁও গ্রামের ঝুমন দাস আপন নামের এক তরুণের ফেসবুক আইডি থেকে মাওলানা মামনুল হককে কটাক্ষ করে কথিত স্ট্যাটাসের প্রতিক্রিয়ায় বুধবার সকাল ৮ টা থেকে ১০ টার মধ্যে এই তা-ব চালানো হয়।
গত সোমবার সুনামগঞ্জের দিরাই স্টেডিয়ামে হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক বক্তব্য দেন। এসময় ধর্মীয় উস্কানীমূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন মামুনুল হকসহ হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতারা।