১০ দিনে হেঁটে বাড়ি এসেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা জজ মিয়া

আকরাম উদ্দিন
সদর উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের ফেনিবিল গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফুর রহমান (জজ মিয়া)। মুক্তিযোদ্ধা জজ মিয়া নামে এলাকায় পরিচিতি বেশি। তাঁর বয়স ৭৬ বছর। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন তিনি। স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা লুৎফুর রহমান। তিনি দীর্ঘ ৮ বছর যাবত অসুস্থ হয়ে পড়ে আছেন বিছানায়। ঘর ও বাড়ির আঙিনা একমাত্র সময় কাটানোর জায়গা তাঁর। সুঠাম দেহের অধিকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফুর রহমানকে দেখলে মনে হয় তিনি এখনও সুস্থ আছেন। আসলে শরীরের ভেতরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগে। বর্তমানে তিনি ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত। সোমবার বিকালে বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফুর রহমানের বাড়িতে যাই। গ্রামীণ পরিবেশের বাড়ি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বেষ্টিত। বিশুদ্ধ বাতাস, কোলাহলমুক্ত ও নিরব নিস্তদ্ধ। সাংবাদিক হিসাবে দীর্ঘদিন আগের পরিচয় থাকায় হাস্যোজ্জ্বল মুখে ডাক দিলেন। ঘরে গিয়ে বসলাম। তিনিও বিছানা ছেড়ে উঠে বসলেন। কিছুক্ষণ পর আমি বললাম শুনব মুক্তিযুদ্ধের গল্প। মৃদু হাসলেন। বললেন ধীরে ধীরে সবই মন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এখন আর স্মরণে আসে না।
প্রেরণার উৎস :
তখন ১৯৭১ সাল। আমি ভৈরবে হাজী আছমত
উল্লাহ মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র। এই সময়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রধান ছিলাম। সারা দেশের বাঙালিরা জোট হতে শুরু করেছে। আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টিও দেশের পক্ষে কাজ করেছে। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে (সোওরাওয়ার্দী উদ্যান) জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে আমি সেখানে উপস্থিত হই। দেখি লাখ লাখ মানুষের ঢল। সবাই আবেগাপ্লুত বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনবে। মনোযোগ সহকারে এই ভাষণ আমি শ্রবণ করি। যুদ্ধে যেতে আমি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। ভাষণের কথা মনে পড়লেই আমার শরীরের রক্ত যেন গরম হয়ে উঠে। হানাদার বাহিনীকে মেরে দেশ ছাড়াব আর কবে আমাদের স্বাধীন দেশ হবে এই অপেক্ষায় ছিলাম।
আমার মায়ের কান্না :
এদিকে মা আওয়াল চাঁন ও বাবা রমজান আলী শিকদার আমাকে দেখার জন্য কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছেন। তখন আমার মামা আব্দুল খালিক চলে আসলেন ভৈরবে। আমি সব কথা শুনে বাড়ি ফিরে আসি। প্রায় ১০দিন যাবত পায়ে হেঁটে হেঁটে একদিন দুপুরে চলে আসলাম বিশ্বম্ভরপুরে। আসার সময় কাঁচি হাতে, মাথায় গামছা বেঁধে কৃষক সেজে এসেছি। নইলে গুলি করে আমাদেরকে মেরে ফেলবে হানাদার বাহিনী। বিশ্বম্ভরপুর এসে মানুষজন না পেয়ে একটি নৌকায় মামু ভাগ্না মিলে রাত্রি যাপন করি। পরদিন চলে আসি নিজ বাড়িতে। এসে মাকে সান্তনা দিলাম। মা বললেন আমার জেলায় মুক্তিযুদ্ধ কর। আমি সকল মুক্তিযোদ্ধার সেবা করব। যেমন বলেছেন মা তেমনই সংকটকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ভরণপোষণ করেছেন। মায়ের দোয়া নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে চলে গেলাম।
যুদ্ধে অংশগ্রহণ :
আমি আগরতলায় চলে যাই। সেখান থেকে পরে আমি শিলং হয়ে ইকো-১ এ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। বালাট এসে দেখি গোলাম রব্বানী বেইজ কমান্ডার। তখন আমিও বেইজ কমান্ডারের দায়িত্ব পাই। বালাটে সব সময় যাঁর দেখা পেয়েছি এবং যিনি আমাকে সাহস যুগিয়েছেন তিনি হলেন মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক শ্রদ্ধেয় হোসেন বখত। আলফাত মুক্তার সাহেবকেও পেয়েছি। এই বালাটে কয়েক বার দেখা হয়েছে বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ সাহেবের সাথে। আরও কয়েকজন সংগঠক ছিলেন। এ সময় আমাদের সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর সালাহ উদ্দিন। পরে ছিলেন মেজর মোতালিব। পরবর্তীতে ই-কোম্পানীর টুআইসিও ছিলাম আমি। যুদ্ধ করতে বালাট থেকে ফিরে আসি আমার এলাকা নলুয়া গ্রামে।
যুুদ্ধ শুরু :
প্রথমে আমার যুদ্ধ ক্ষেত্র নলুয়া গ্রাম। এই নলুয়া গ্রামের উপর দিয়ে শত শত গোলা বারুদ উড়ে যেতো। নিরাপদে যুদ্ধ করতে পরিখা খনন করার কাজ শুরু করি। কয়েক দিনের মধ্যে দীর্ঘ পরিখা খননের কাজ শেষ করি। আমরা বেরীগাঁও হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করি। বাঘমারা, ভৈষারপাড়, সৈয়দপুর এলাকা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের আওতায়। এ সময় আমার সহযোদ্ধা ছিলেন সাচনার আব্দুল লতিফ, প্লাটুন কমান্ডার হোসেন মিয়া, আব্দুল আলী, মালাইগাঁওয়ের সাদত আলী, রামনগরের আব্দুল হক, ছড়ারপাড়ের আব্দুল হামিদসহ অনেকে। যুদ্ধকালীন সময়ে ইসলামপুর এলাকায় পাক হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হই। এই সময় সাধারণ মানুষ অনেক মারা যায়। আমরা রাজাকার দেখে দেখে অস্ত্রের আঘাতে বা লাঠি দিয়ে আবার কোনো কোনো রাজাকারকে গুলি করে মেরে ফেলি। এখান থেকে আবার বিশ্বম্ভরপুর এলাকার ধনপুর, চীনাকান্দিসহ বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ করে ফিরে আসি নলুয়া গ্রামে। এভাবে মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস কেটে যায়।
কেমন বাংলাদেশ প্রত্যাশা :
বঙ্গবন্ধু চেয়েছেন দুর্নীতিমুক্ত একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ। দেশ স্বাধীনের পর আজ আমাদের দেখতে হয়েছে দুর্নীতির মহোৎসব, চিকিৎসায় ঘুষ, চাকুরিতে ঘুষ, শিক্ষায় ঘুষ, অফিস আদালতে যেন ঘুষ আর ঘুষ। ঘুষ দেয়া নেয়া যেন চাকুরির একটি অংশ হয়ে গেছে। রাস্তাঘাট দখল, খাল দখল, নদী দখল শুরু হয়েছে সর্বত্র। জননেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন উদ্যোগ নিয়েছেন, আমাদের একটা আশা হয়েছে। এ দেশ হবে ঘুষ, দুর্নীতি ও দখলদারিত্ব মুক্ত। দেশের মানুষের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। এটার বাস্তাবায়ন হবেই হবে ইন্শা আল্লাহ।