১৪২৪ সনটি সর্বাবস্থায় প্রাণের স্পন্দনে মুখরিত থাকুক

বৃহত্তর ভাটি অঞ্চলে আজ নববর্ষ এসেছে নিদারুণ এক অভাবের মধ্য দিয়ে। বুধবার ঢাকার এক গোলটেবিল বৈঠকে ফসলহানির পরিমাণ টাকার অংকে ৬ হাজার কোটি টাকা বলা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা  দুই কোটি উল্লেখ করা হয়েছে। বলাবাহুল্য এই বিশাল ক্ষতির বোঝা নিয়ে আজকে নতুন যে সূর্যোদয় হচ্ছে সেটি ভাটি অঞ্চলের ফসলহারা মানুষের মনে তেমন কোন আলোড়ন তুলছে না। বর্ণিত গোলটেবিল বৈঠকে এই ফসলহানির জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা হয়েছে।  ক্ষতিগ্রস্ত ভাটি অঞ্চলের প্রধান অঞ্চল আমাদের সুনামগঞ্জ জেলা। যে ক্ষয়-ক্ষতির পরিসংখ্যান বলা হচ্ছে তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই জেলার। সুনামগঞ্জের কৃষকরা অকালে আংশিক নির্মিত অথবা একেবারেই নির্মাণ না করা পুরনো বাঁধ ভেঙ্গে ফসল হানির জন্য ব্যাপক প্রাকৃতিক দুর্যোগের চাইতেও ঠিকাদার, পিআইসি ও পাউবোর দুর্নীতিকে বেশি করে দায়ী করছেন। কেন দায়ী করছেন তার সবিস্তৃত ব্যাখ্যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন তথ্য আসছে। প্রকাশিত তথ্যের আলোকে দুর্নীতি দমন কমিশন এই হাওর দুর্নীতির তদন্ত করবেন বলে সংবাদ পাওয়া গেছে। বহু হতাশার মধ্যে এইটি আশার সঞ্চার করবে সকলের মনে।
ফসলহারা কৃষক না হয় খেয়ে না খেয়ে এলাকায় থেকে বা স্থানান্তরে গিয়ে মরার মতো বেঁচে থাকবে। তাদের জন্য সরকারি বরাদ্দ আসা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। আরও আসবে। কিন্তু এই কৃষকদের গোয়ালের গরু-ছাগলগুলোর অবস্থা কী হবে? তাদের জন্য তো কোন ত্রাণের ব্যবস্থা নেই। এবার অবস্থা এমন হয়েছে যে, গরুর জন্য একমুঠো খড় সংগ্রহ করতে পারে নি কেউ। না খেয়ে গরুগুলো মরবে এমন আশংকা থেকে এবং অনিবার্য অভাবের তাড়নায় কৃষকরা গরুগুলো বিক্রির জন্য বাজারে তোলা শুরু করেছেন। বাজারের অবস্থা বুঝে অকস্মাৎ দাম কমে গেছে  অবোধ এইসব প্রাণীর। জলের দামে বিক্রি করছেন প্রিয় গরুগুলোকে কৃষকরা। গবাদি পশু বিক্রির এই ধারা অব্যাহত থাকবে সামনের কয়েক মাস। যারা ক্ষয়-ক্ষতি নির্ধারণ করেছেন তারা কি গবাদিপশুর এই বিষয়টি নিজেদের হিসাবে অন্তর্ভূক্ত করেছেন? করলে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুন হয়ে যাবে সন্দেহ নেই।
কতিপয় দুর্নীতিবাজ ঠিকাদার বা পিআইসি সদস্য এবং পাউবোর গুটিকয়েক প্রকৌশলী হৃদয়হীনভাবে মাঠের সোনাফলা ফসল উদরস্ত করে ফেললেও সরকার তার পীড়িত নাগরিকদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় না। সরকার ইতোমধ্যে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত হাওর অঞ্চলের কেউ না খেয়ে মারা যাবে না (দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মোফাজ্জেল হোসেন চৌধুরী মায়া বুধবার মিঠামইন উপজেলায় এমন ঘোষণা দিয়েছেন)। আমাদের অতিপ্রিয় মহামান্য রাষ্ট্রপতি স্বয়ং আসছেন পীড়িত হাওরবাসীর কষ্ট লাঘবে। তিনি আমাদের মতোই হাওরের সন্তান। তিনি হাওরের কষ্ট অনুভব করবেন নিজে থেকেই। তাঁকে কিছুই বুঝাতে হবে না। আমরা তাঁকে স্বাগত জানাই।
বছরের শেষদিন গতকাল শহরের আলফাত চত্ত্বরে কৃষকদের পক্ষে সমাবেশ হয়েছে। ঘেরাও অভিযান হয়েছে পাউবো অভিমুখে। সমাবেশের বক্তারা হাওর দুর্নীতির বিচার চেয়েছেন। দাবি পেশ করেছেন কৃষকদের বাঁচানোর জন্য করণীয় সম্পর্কে। একটি বছরের বিদায় আর নতুন আরেকটি বছরের শুরু এইভাবেই এই হাওরপাড়ে সরব ছিলো। মুখরতা প্রাণের লক্ষণ। স্তুব্ধতা হলো একেবারেই নিষ্প্রাণ। আমরা সর্বত্র প্রাণের স্পন্দন চাই। কি আনন্দে কি দুর্যোগে সবসময়। মানুষ জাগে পুলকে আবার মানুষই জাগে বিমর্ষতা কাটাতে। ১৪২৪ সনটি সর্বাবস্থায় প্রাণের এই স্পন্দনে মুখরিত থাকুক।