বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ৫ মামলার একটির বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আরেকটি প্রাথমিক তদন্ত শেষে মামলা গ্রহণ করা হয়েছে। অন্য ৩ টি’র অনুসন্ধান কাজ চলছে। রোববার যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার নূর হোসেন এই তথ্য জানিয়েছেন।
বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে ১৯৭১’এর মুক্তিযুদ্ধে সংগঠিত পেরুয়া-শ্যামারচর হত্যাযজ্ঞে জড়িত ১১ অপরাধীর বিরুদ্ধে। গত ১৭ জুন এই মামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। ওই দিন রাজধানীর ধানমন্ডিতে সংস্থাটির কার্যালয়ে এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক মো. আবদুল হান্নান খান।
তিনি ওইদিন জানিয়েছিলেন, তদন্ত সংস্থার ৭১ তম প্রতিবেদন এটি। জানানো হয়, এই মামলার ১১ আসামীর মধ্যে ৬ জন গ্রেফতার হয়েছে। বাকি ৫ জন পলাতক রয়েছে। গ্রেফতারকৃত ছয় জন হলেন, সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার দৌলতপুরের যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মোহাম্মদ জুবায়ের মনির (৬২), একই উপজেলার ঘুংগিয়ারগাঁও এলাকার সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন (৬২), শশারকান্দা এলাকার মো. সিদ্দিকুর রহমান (৬১), উজানগাঁও এলাকার মো. তোতা মিয়া টেইলার (৮১), দিরাই উপজেলার শ্যামারচর পশ্চিম দৌলতপুর এলাকার মো. আব্দুল জলিল (৭১) এবং মো. আব্দুর রশিদ (৬০)। পলাতক ৫ জনের নাম প্রকাশ করা হয়নি।
এই ১১ জনের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের ১২ মার্চ থেকে তদন্ত শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় আটক, নির্যাতন, লুটপাট, অপহরণ, ধর্ষণ, গণহত্যা ও অগ্নিসংযোগসহ মোট ৪টি অভিযোগ আনা হয় তাদের বিরুদ্ধে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ৩৪ জনকে হত্যা, কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা, আনুমানিক ৩০ টি বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, ৩১ জনকে অপহরণ ও ১৪ জনকে নির্যাতন।
আসামীদের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের ২১ মার্চ তদন্ত শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন নূর হোসেন। তদন্ত শেষে আসামীদের বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগ তিনটি ভলিয়মে মোট ১৫০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে ৩৩ জনকে।
প্রসঙ্গত. মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে সুনামগঞ্জ জেলায় পাকহায়েনা ও তাদের সহযোগী বাঙালি দালালরা যে কয়েকটি বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করেছিল, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল দিরাই উপজেলার পেরুয়া শ্যামারচর হত্যাযজ্ঞ। এখানে অসংখ্য নিরীহ বাঙালি গণহত্যার শিকার হন। এরমধ্যে ২০ জনের পরিচয় মিলেছিল। কয়েক’শ ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। নির্যাতনের শিকার হন অসংখ্য মা-বোন। এই এলাকার ৫ জন বীরাঙ্গনা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন। এই ধংসযজ্ঞে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এলাকার সম্ভ্রান্ত পরিবার হিসাবে পরিচিত ‘পেরুয়া বড়বাড়ি’। পেরুয়া বড়বাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খার করে দেওয়া হয়েছিল। এই বাড়ির হেমচন্দ্র রায় এবং চিত্তরঞ্জন রায় গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন। এই গণহত্যা এবং পৈশাচিক নির্যাতনের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী কয়েকজন এখনো জীবিত রয়েছেন। এই ঘটনায় গত বছরের মে মাসে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়। মামলার তদন্ত কার্যক্রম গত বছরের ২ জুন থেকে শুরু করেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
গত বছরের ২২ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুই প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম ও রেজিয়া সুলতানা সরেজমিনে এসে দিনভর স্থানীয় লোকজনের স্বাক্ষ্য গ্রহণ করেছিলেন।
১৯৭১’এর মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি লোমহর্ষক ঘটনা সংগঠিত হয়েছিল, জামালগঞ্জের দক্ষিণ কামলাবাজ, কাজীরগাঁও এবং কালীপুরে। ওখানকার হত্যাযজ্ঞ, খুন, ধর্ষণ এবং লুটপাটে জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্তের কাজ শেষ করে মামলা গ্রহণ করেছে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল। শীঘ্রই এই মামলার ব্যাপক তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার দায়িত্বশীলরা।
২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল উপজেলার সদরকান্দির শহীদ মুক্তিযোদ্ধা গণি মুন্সির ছেলে আব্দুল জলিল বাদী হয়ে জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান উপজেলার লক্ষীপুর গ্রামের সামসুল আলম ঝুনু মিয়া, একই গ্রামের মজনু মিয়া ও এনাম উদ্দিনসহ ১৫-২০ জনকে বিবাদী করে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করেন। এই অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রাথমিকভাবে তদন্ত শেষে মামলা গ্রহণ করে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তা এএসপি নূর হোসেন (রোববার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯) জানালেন, সুনামগঞ্জে খুন, ধর্ষণ, গণহত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ ৫ টি লোমহর্ষক যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনালে অভিযোগ দায়ের হয়েছিল। এরমধ্যে শ্যামারচর গণহত্যার অভিযোগটি মামলা হিসাবে গ্রহণ করে। তদন্ত কার্যক্রম শেষ করা হয়েছে। ১১ আসামীর বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। ৬ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। বিচারিক স্বার্থে অন্য ৫ জনের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। এই মামলার বিচার কার্যক্রম শীঘ্রই শুরু হবে। জামালগঞ্জের অভিযোগটি গ্রহণ করে প্রাথমিক তদন্ত শেষে মামলা হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে। শীঘ্রই ব্যাপক তদন্তের কাজ শুরু হবে। নথিপত্র সংগ্রহের কাজ চলছে। তিনি জানান, তাহিরপুর ও সুনামগঞ্জ সদরের দুটি অভিযোগ অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। যেহেতু অভিযোগ এখনো আমলে নেওয়া হয় নি তাই এই বিষয়ে বিস্তারিত জানানো ঠিক হবে না।


