৫ বছরের মাথায় সেতু ভেঙে পড়ার দায় কার?

নির্মাণের ৫ বছরের মাথায় একটি সেতু ভেঙে পড়ে। কেন ভেঙে পড়ে তার কারণ না খোঁজে সেখানে আরেকটি সেতু নির্মাণের কথা বলেন দায়িত্বশীলরা। কিন্তু বলেন না ভেঙে পড়া সেতুটির জীবনকাল কত বছর ছিল আর কোন ত্রুটির জন্য ভেঙে গেল এত তাড়াতাড়ি। মূলত আমাদের দেশে সেরকম কোন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়নি যেখানে ন্যূনতম জীবনকাল অতিক্রমের আগেই কোন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কাউকে দায়ী করা যেতে পারে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, দোয়ারাবাজার উপজেলার মান্নারগাঁও ইউনিয়নের পুটিপশি-নূরপুর সড়কে নির্মিত কালভার্ট সেতুটি নির্মাণের ৫ বছরের মাথায় ভেঙে পড়ে। একজন ঠিকাদার জানিয়েছেন ওই সেতু নির্মাণে তৎকালে ২০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল। সেতুটি নির্মাণের সময় এর সমীক্ষা ও নকশা হয়। নির্মাণকালে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদারকি করেছেন। আর একটি সেতুর জীবনকাল নিশ্চয়ই মাত্র ৫ বছর হতে পারে না। তাহলে কেন সেতুটি ভেঙে পড়ল, এজন্য নকশা বা নির্মাণ কাজের ত্রুটি ছিল কি-না, এসব প্রশ্ন সামনে আনা হচ্ছে না। অর্থাৎ নির্মাণ কাজে সংশ্লিষ্টরা একধরনের দায়মুক্তি ভোগ করে থাকেন। এই দায়মুক্তির কারণেই কাজের মান বজায় রাখা সম্ভব হয় না। নতুবা বাংলাদেশের নির্মাণ কাজে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হয় তার সদ্ব্যবহার সম্ভব হলে কোন স্থাপনাই নির্ধারিত মেয়াদের আগে ভেঙে পড়ার কথা নয়।
মঙ্গলবারের একনেক সভায় বারবার প্রকল্প সংশোধনের বিষয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী। অর্থাৎ এইভাবে প্রকল্প সংশোধন করে ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতাতে তিনি চরম বিরক্ত হয়ে উঠেছেন। ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি সবসময় যে প্রয়োজনের খাতিরে হয় এমনটি নয় বলেই ধারণা। ছোটখাট নির্মাণের ব্যাপারেও বারবার সংশোধিত প্রাক্কলন তৈরির কথা সুবিদিত। এইভাবে বারবার অহেতুক ব্যয় বাড়াতে আমাদের যত আগ্রহ ঠিক ততই অনাগ্রহ কাজের মান বজায় রাখতে। আর এ কারণেই নির্মাণ চলা কালেই ভেঙে পড়ে সেতু। ভবন ধসে পড়ে কয়েক বছরের মাথায়। ঠিক যেমন দোয়ারাবাজারের পুটিপশি-নূরপুর সড়কের কালভার্ট সেতুটি ভেঙে পড়ল। জনগণের টাকার এমন অপচয় বোধ করি আমাদের দেশেই সম্ভব। কয়েকদিন আগে টিআই প্রকাশিত বৈশি^ক দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশ আগের মান অতিক্রম করতে পারেনি। পৃথিবীর শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ১৩ তম অবস্থানে। দুর্নীতির এমন রমরমা অবস্থাতে অবশ্য একটি ছোট্ট সেতু নিয়ে কথা ভলা প-শ্রমই বটে। কিন্তু এতে আমাদের জাতিগত মান-মর্যাদা কোন তলানীতে গিয়ে ঠেকছে সে বোধ নেই কারও।
দোয়ারাবাজারের উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বলেছেন, ভেঙে পড়া সেতুর জায়গায় এখন নতুন করে একটি গার্ডার সেতু নির্মাণ করা হবে। এমন প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে। কালভার্ট সেতু কিংবা গার্ডার সেতু হোক, সেতু এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করে সঠিক নকশা তৈরি করে এর স্থায়িত্বকাল ঠিক করে দিতে হবে। ঠিকাদার ও তদারকী প্রকৌশলীদের এজন্য জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করতে হবে যে, নির্দিষ্ট মেয়াদের আগে সেতুর ক্ষতি হলে তারা দায়ী থাকবেন। এই জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত সেতুর বদলে যত সেতুই নির্মাণ করা হোক না কেন তার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা কঠিনই হবে বৈকি। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশ দেশটি অতি মাত্রার ধনি দেশ নয়। আমাদের সম্পদ সীমিত। এই সীমিত সম্পদের যথাযথ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কাক্সিক্ষত জাতীয় উন্নয়ন সাধন করা সম্ভব। তা না করে যেমন ইচ্ছা তেমন হরিলুট করতে থাকলে টিআই সূচকে বারবারই আমরা শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হতে থাকব। দুনীতিতে উন্নতি করা আমাদের কাম্য নয়। আমরা কামনা করি নীতি-নৈতিকতার উন্নয়নের মাধ্যমে সোনার বাংলাদেশ গঠন হোক।