৬ উদ্যোমী তরুণের গল্প

আসাদ মনি
শহরতলীর লালপুর গ্রামের ৬ তরুণ। বৈশিক মহামারি করোনাকালে পুরোপুরি বেকার হয়ে পড়েন। ভাবতে থাকেন কি করা যায়। এই ভাবনাতেই তাদের কয়েক মাস চলে যায়। পরে অল্প পুঁজি নিয়ে শুরু করেন সূর্যমুখী ফুলের চাষ। গড়ে ওঠে বাগান। নাম দিয়েছেন ‘স্বপ্ন ছোঁয়া সানফ্লাওয়ার গার্ডেন’। এখন তাদের বাগানে দর্শনাথীদের উপছে পড়া ভিড়। প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার টাকা আয় করছেন আগত দর্শনাথীদের কাছে টিকেট বিক্রি করে। এই ৬ তরুণ হলেন নজরুল ইসলাম, রেজাউল করিম, রুকনউদ্দিন, ফরহাদ আহমদ, পারভেজ আহমদ ও রুবেল হোসেন।
গৌরারং ইউনিয়নের লালপুর গ্রামের স্বাধীন বাজারের পাশে প্রায় ৬০ শতাংশ জমিতে এই বাগান করেছেন তারা। জমি তৈরি ও বীজ কেনা বাবদ খরচ হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। বাগানের ভেতরে বাচ্চাদের দোলনা ও অন্যান্য আসবাবপত্র দিয়ে সাজাতে খরচ হয়েছে আরও ২৫ হাজার টাকা। এই দু’য়ের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে তাদের ‘স্বপ্ন ছোঁয়া সানফ্লাওয়ার গার্ডেন ’। এতে মোট খরচ হয়েছে ৫০ হাজার টাকা।
বাগানে প্রতিটি চারায় ফুল ফুটায় পুরো জমি জুড়ে তৈরি হয়েছে অভাবনীয় এক সৌন্দর্য। সূর্যের দিকে মুখ করে ফুটে থাকা ঘন ফুলের সমারোহ সৌন্দর্যপ্রেমী মানুষদের সড়ক থেকে বাগানে টেনে আনছে।
সরজমিনে দেখা যায়, এই ৬ তরুণ গেল বছরের ডিসেম্বরে জমি তৈরি করে সূর্যমুখী ফুলের বীজ বপন করেন। এখন পুরো বাগানে হলুদের আগুন। শিমুলবাগান, শহীদ সিরাজ লেক, টাঙ্গুয়ার হাওর ও বারেকের টিলায় যাওয়ার রাস্তায় পড়ে বাগানটি। এসব জায়গায় ঘুরতে যাওয়া পর্যটকেরা যাত্রা পথে বাগানে নেমে ছবি তুলছেন, সেলফি তুলছেন, ঘুরে বেড়াচ্ছেন।


এদিকে সূর্যমুখী বাগানের ছবিতে এখন ফেসবুক সয়লাব। অনেকেই নিজের বা বন্ধু-বান্ধব সমেত ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছেন। এইসব পোস্ট দেখে বাগানটি দেখতে আগ্রহী লোকের সংখ্যা বাড়ছে। একজনের কাছ থেকে আরেকজন খবর পেয়ে অনেকেই এখন আসছেন সূর্যমুখীর অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে।
সড়কের পাশে সিএনজি, মোটর সাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখা যায় গত শুক্রবার বিকালে। এক সিএনজি ড্রাইভার জানালেন, স্বাধীন বাজারের সূর্যমুখী বাগানের কল্যানে আমাদের ট্রিপ বেড়ে গেছে।
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের বনানী পাড়ার বাসিন্দা মো. সোহেল আহমদ বলেন, খুব ভালো লেগেছে এসে। আমার বাচ্চাকে নিয়ে এসেছি। তারা বইয়ে সূর্যমুখী ফুলের ছবি দেখেছে। এখন বাস্তবে দেখছে।
শিমুলবাগানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এসেছেন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুদ্র। সঙ্গে আরও কয়েকজন বন্ধু রয়েছে তার। সাময়িক যাত্রা বিরতি ঘটালেন তারা এখানে। তাঁরা জানান, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করা মানুষের স্বভাবগত বৈশিষ্ট। যাত্রা পথে হলুদবর্ণের ফুল আমাদের কাছে টেনে নিয়েছে। স্মৃতি ধরে রাখতে সূর্যমুখির সংস্পর্শে গিয়ে কিছু ছবি উঠেছি। বাগানটি খুবই সুন্দর। ভাল লেগেছে আমাদের।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার সদরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রাবেয়া আক্তার বলেন, আমি বন্ধুদের সঙ্গে সূর্যমুখী বাগানে বেড়াতে এসেছি। আমরা আগে এমন একটা সময় পার করেছি, যে সবাই ঘরে বন্ধি ছিলাম। অতিথিতের সব ভুলে যেতে চাই। তাই এখন ঘুরতে এসেছি। এই বাগানে এসে আমার খুব ভালো লেগেছে। এতো সুন্দর একটা বিকাল পার করতে পারবো আগে কল্পনা করিনি।
তিনি অন্যদের উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনারা যদি সুন্দর সময় পার করতে চান, তাহলে এই বাগানে আসতে পারেন।
জামালগঞ্জ উপজেলার জালালাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুমি আক্তার বলেন, স্বাধীন বাজারের পাশে এতো সুন্দর প্রকৃতির নিসর্গের ছোঁয়া আগে জানতাম না। এখানে এসে বুক ভরে নিঃশ^াস নিতে পারছি। শুধু আমি না এখানে অনেক পর্যটকেরা এসেছেন। সবাই প্রকৃতির সঙ্গে মিশে গেছেন। আসলে আমাদের সুনামগঞ্জের বাসিদের জন্য এটা একটি মিনি পার্ক বলা যায়।
বাগানের মালিক নজরুল ইসলাম বললেন, আমি একজন শিক্ষার্থী। পড়ালেখার পাশাপাশি চাইছিলাম কিছু একটা করি। পরে আমরা ৬ জন বন্ধু বসে চিন্তা করলাম কি করা যায়। তখন আমাদের মাথায় আইডিয়া আসলো সূর্যমুখী ফুলের বাগান করার।
তিনি বলেন, ৩ মাসের উপরে আমরা অনেক পরিশ্রম করেছি। কৃষি অধিদপ্তর থেকে আমাদের সহযোগিতা করেছে। এখন ফুল ফুটেছে। অনেক দর্শনার্থী আসছেন। তাদের কাছ থেকে ১০ টাকা করে নিচ্ছি। প্রতিদিন দু’শ থেকে ছ’শ দর্শনার্থী হয় বাগানে। এতে একদিনে সর্বোচ্চ ৬ হাজার টাকা আয়ও হয় আমাদের।
বাগানের মালিক মো. ফরহাদ আহমদ বলেন, আমি ছোটখাটো একজন ব্যবসায়ী। করোনাকালীন সময়ে ব্যবসায় লোকসান। কি করি এই নিয়ে চিন্তায় পড়ে যাই। তখন মাথায় এই পরিকল্পনা আসে। এখন বাগানে প্রায় সব গাছেই ফুল চলে এসেছে। দর্শনার্থীও আসছেন। আমাদের আয়ও হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাগানটি আমরা অনেক সুন্দর করে সাজিয়েছি। একটা ব্রীজ করেছি। বাগানের ভেতরে বাচ্চাদের দোলনা, ছবি তুলার ফ্রেম, বসার ব্যবস্থা করেছি।
গৌরারং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফুল মিয়া বলেন, আমার বাড়ি লালপুর। এই বাগানটি হয়েছে লালপুরে। আমাদের তরুণরা খুব সুন্দর একটি পরিবেশের সৃষ্টি করেছে এখানে। সুনামগঞ্জে কোনো বিনোদনের জায়গা নেই। তারা বিনোদনের একটি জায়গা তৈরি করে মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে মেশার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বেকার তরুণরা এভাবে নিজেরা উদ্যোক্তা হলে সমাজ থেকে মাদক বিদায় নেবে। এসব তরুণদের পাশে ভবিষ্যতেও থাকবেন বলে জানান তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক মো. ফরিদুল হাসান বলেন, এই ৬ জনকে সূর্যমুখী বাগান করার জন্য আমরা প্রণোদনা দিয়েছি। এখন তারা সফলতা পেয়েছে। যারা এরকম উদ্যোগ নিবে তাদের পাশে আমরা থাকবো।