‘বিপদ খালি মাইনসের নায়, গরুর’ও লাগিও’

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের লাখো মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বিশেষ করে শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষেরা মহাদুর্ভোগে রয়েছেন। করোনার মধ্যে লাগাতার দু’দফা বন্যা যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’এর মত অবস্থা। এবারের বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হবে শুনে মহাদুশ্চিন্তায় পড়েছেন জেলার লাখো শ্রমজীবী মানুষ।
বিশ^ম্ভরপুরের দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়নের সোনাপুর নতুন হাটির রমেন্দ্র বর্মণ (৪৫) জানালেন, ১৪ দিন আগে আসা বন্যার পানি আসলে চৌখির উপর বাঁশের মাচা বেঁধে টিনের চুলো বসিয়ে কোনরকমে দিনে একবার খেয়ে ৫ দিন ছিলেন। শনিবার থেকে আবার ঘরে কোমর সমান পানি।
দিনমজুর রমেন্দ্র বর্মণ বললেন, ‘কাম কইরা খাই, কাম নাই, হাতে টেকাও নাই, সম্পত্তি বলতে বাড়ি আর ৪ টা গরু, গরু তইয়া ইস্কুল (আশ্রয় কেন্দ্রে) গেলে রাইত (রাতে) গরু চোরে লইয়া যাইবগি। এর লাগি পানিত ঔ আছে গরু, আমরা বাশ দিয়া চৌকি উচা (উঁচু) কইরা কোনভাবে আছি, কাইল থাকি আইজ (রোববার) পর্যন্ত চিড়া খাইয়া আছি।
জামালগঞ্জের রহিমাপুরের প্রজেশ দে বললেন, ‘গাঁওয়ের কেউয়ের ঘরঔ ভাসাইল নাই। কে কার বাড়ি গিয়া উঠবো। কেউর ঘরও কোমর, কেউর হাটু, কেউর ঘণ্টা সমান পানি। বিপদ মাইনসের লাগি আইছে নায়, গরুর’ও লাগিও।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানালেন, গরুসহ গৃহপালিত পশু-পাখি নিয়ে অনেকেই আশ্রয় কেন্দ্রে ওঠেছে। জামালগঞ্জের আলা উদ্দিন মোমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭০০ হাঁস নিয়ে ওঠেছে কেবল এক পরিবারই। আশ্রয় কেন্দ্রে আসা অন্যদেরও হাঁস মুরগী আছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ জানিয়েছেন, সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে, যেহেতু বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হবার আশঙ্খা রয়েছে, আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি রাখতে হবে। রাতেও আশ্রয়কেন্দ্র খোলা থাকার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
তিনি জানান, জেলায় ২৫৬ টি আশ্রয়কেন্দ্র রোববার দুপুর পর্যন্ত খোলা হয়েছে। ৫২৭৬ জন মানুষ ওঠেছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। পানিবন্দি ৭০ হাজার ৩২০ টি পরিবার। রোববার পর্যন্ত নগদ ৮ লাখ টাকা, ৩৪৫ মে.টন চাল ২০০০ পেকেট শুকনো খাবার ও শিশু খাদ্য বন্যার্তদের বিতরণের জন্য উপজেলায় উপজেলায় ও সংশ্লিষ্ট পৌরসভায় দেওয়া হয়েছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সবিবুর রহমান জানিয়েছেন, রোববার বিকাল ৩ টায় সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ পয়েন্টে পানি বিপদ সীমার ২৬৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ৪৮ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ও ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি বেশি হয়েছে। সুনামগঞ্জে ২৪ ঘণ্টায় ১৫০ মিলিমিটার এবং চেরাপুঞ্জিতে গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ২৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
প্রসঙ্গত. গত ২৮ ও ২৯ জুন ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলে সুনামগঞ্জের নদ নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে জেলার দোয়ারা, ছাতক, সুনামগঞ্জ সদর, বিশ^ম্ভরপুর, জামালগঞ্জ ও তাহিরপুর বন্যা কবলিত হয়। ওই বন্যার পানি নি¤œাঞ্চলের ঘরবাড়ি থেকে নামতে না নামতেই আবারও এসব উপজেলায় লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।