এমএ মান্নান
বাঙালি জাতির শোকের মাস, বেদনার মাস আগস্ট। এই মাসেই ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে রচিত হয়েছিল বাঙালির ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। বাঙালি জাতি এই দিনটিকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করে। কতিপয় চক্রান্তকারী সেনাসদস্য ১৯৭৫ সালের এই দিনে নৃশংসভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। দেশের বাইরে থাকায় ঘাতকদের হাত থেকে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর খবর শুনে ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসন লন্ডনের এক বাঙালি সাংবাদিকের কাছে লেখা শোকবাণীতে বলেন, ‘এটা আপনাদের কাছে অবশ্যই এক বিরাট ন্যাশনাল ট্রাজেডি। আমার কাছে এক পরম শোকাবহ পার্সোনাল ট্রাজেডি’। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার গঠন করার পর ১৯৯৭ সালের ১ মার্চ বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারকার্য শুরু হয়। অবশেষে নানা ঘাত-প্রতিঘাত, বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে ৩৪ বছর পর ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি ১২ জনের মধ্যে ৫ ঘাতকের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। ঘাতকদের একজন বিদেশে পলাতক অবস্থায় মারা যায় এবং ৬ জন বিদেশে পলাতক রয়েছে।
উপনিবেশ দখলদারদের হাত থেকে একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সেই সব মহানায়ক ব্যক্তিকে জাতির জনক উপাধিতে ভূষিত করে। যেমন জর্জ ওয়াশিংটন যুক্তরাষ্ট্রের, সুন ইয়াট-সেন চীনের, সাম নুজমা নামিবিয়ার, জুলিয়াস নিরেরে তানজানিয়ার, জোমো কেনিয়াত্তা কেনিয়ার, ফিদেল ক্যাস্ত্রো কিউবার, মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক তুরস্কের, ড. আহমেদ সুকর্ন ইন্দোনেশিয়ার, টেংকু আবদুল রহমান মালয়েশিয়ার এবং মহাত্মা গান্ধী ভারতের জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃত। ঠিক তেমনি বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু। তিনি বাঙালির বন্ধু, বাঙালি জাতির পিতা। যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিউজ উইক’ পত্রিকা বলেছে, ‘শেখ মুজিব রাজনীতির কবি’। ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে জোট নিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনে কিউবার নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রো বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় পর্বত দেখিনি, শেখ মুজিবকে দেখলাম। ব্যক্তিত্বে ও সাহসে এই মানুষটি হিমালয়। আমি হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম’।
একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সাড়ে সাত কোটি স্বাধীনতাকামী বাঙালির হৃদয়ে, শরণার্থীর জীবন সংগ্রামে ও লক্ষ নিবেদিত প্রাণ মুক্তিযোদ্ধার হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু ছিলেন আকাঙ্খিত বাংলাদেশের প্রতীক। পাকবাহিনী ও দোসরদের ‘অপারেশন সার্চ লাইটের’ অন্ধকার দিনগুলিতে, অগ্নিপরীক্ষার সময়ে এক কোটি বাঙালি শরণার্থী ও লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধা, যারা ভবিষ্যতে জাতিকে সৃষ্টি করবে, পরাধীনতা থেকে মুক্তি আনবে তাদের কাছে বঙ্গবন্ধুই ছিলেন প্রেরণার প্রতীক। শুধু বাংলাদেশ নয় সমগ্র বিশ্বে তিনি একটি সংক্ষিপ্ত নামে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। সেটি হলো বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন পশ্চিমা গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে এসে শোষিতের গণতন্ত্রের বাস্তবায়ন। জাতীয়তাবাদী চেতনার ভিত্তির উপর সেক্যুলার গণতন্ত্র তিনি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।
‘৭৪-এর ১৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিলে দলীয় নীতি-আদর্শ সমুন্নত রাখতে দলের নেতা-কর্মীদের জনসম্পৃক্ততা বজায় রাখতে সকলের উদ্দেশ্যে কর্তব্য-কর্ম নির্দেশ করে তিনি বলেছিলেন, ‘আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধি চাই’। ‘রাষ্টের চারটি আদর্শ-গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র এবং একই সাথে দলের চারটি আদর্শ- নেতৃত্ব, মেনিফ্যাস্টো, নিঃস্বার্থ কর্মী ও সংগঠন’ সমুন্নত রাখতে তিনি আরো বলেছিলেন, ‘দল শক্তিশালী করতে দল থেকে আবর্জনা দূর করতে হবে। সামনে এগুতে হলে স্বচ্ছ-পরিস্কার পন্থা অবলম্বন করতে হবে। বিরোধী দলের সাথে কৌশলী হতে হবে। দলীয় কর্মসূচি যখন জনসাধারণ গ্রহণ করে, তখন তা আর দলীয় থাকে না, জাতীয় সম্পদে রূপান্তরিত হয়। স্বাধীনতা সংগ্রাম করে আমরা স্বাধীন হয়েছি, এখন আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করতে হবে। দল বা মানুষ মরতে পারে কিন্তু নীতি আদর্শ মরে না কোনদিন। যারা নীতি আদর্শ পরিপন্থী কাজ করে তাদের চিহ্নিত করতে হবে, তাদের জন্য রাস্তা খোলা আছে। কিছু লোক আছে যারা মধু-মক্ষিকার মতো আওয়ামী লীগে ভিড় জমায়। ন্যায় নীতি ও আদর্শ সামনে রেখে কাজ করতে হবে। তিনটি জিনিস ভীতিকর-কুমীর, সাপ ও মোনাফেক। গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করে অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপ বরদাস্ত করা যাবে না। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের কর্তব্য, বাংলার মানুষকে সুখী করতে হবে; দুর্নীতি উৎখাত করতে হবে; অর্থনৈতিক মুক্তি আনতে হবে; বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে হবে। রাজনীতিতে যারা সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করে তাদের অন্তর ছোটো, তারা নীচ।
যে মানুষকে ভালোবাসে সে কখনো সাম্প্রদায়িক হতে পারে না। আত্মসম্মান বিকিয়ে কারো কাছ থেকে বন্ধুত্ব নয়। দেশকে এগিয়ে নিতে পজিটিভ রাজনীতি করতে হবে এবং জাতীয় ঐক্য নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশকে সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা সোনার বাংলায় পরিণত করতে হবে’। গর্ব করে তিনি বলতেন, ‘আমার বাংলা রূপসী বাংলা, আমার বাংলা সোনার বাংলা’। আজ বঙ্গবন্ধু আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তাঁর আদর্শ, চেতনা, নির্দেশাবলী আজও আমাদের পথ দেখায়।
জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে ‘রূপকল্প ২০২১’ নামে তথ্য প্রযুক্তি ভিত্তিক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়াই ছিল এর মূল লক্ষ্য। ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় নির্বাচনে ‘রূপকল্প ২০৪১’ এর মাধ্যমে মধ্যম আয়ের দেশের পর্যায় পেরিয়ে শান্তিপূর্ণ, সুখী-সমৃদ্ধ উন্নত জনপদে পরিণত করার ঘোষণা দেন তিনি। শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার মাধ্যমে দেশে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ক্ষুধা, দারিদ্র্য, দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন সমাজ ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়াই ছিল তাঁর লক্ষ্য।
বৈশ্বিক প্রতিকূলতা সত্বেও আমাদের আর্থ-সামাজিক খাতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হচ্ছে। উন্নতি হয়েছে সামাজিক বিভিন্ন সূচকে। চলতি অর্থবছরে জিডিপি ছয় শতাংশের বৃত্ত ভেঙে সাত শতাংশের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। আয়বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ এখন নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। স্বল্প উন্নত দেশগুলোর মধ্যে সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে আমরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করেছি। বিশেষ করে দারিদ্র হারের ব্যবধান হ্রাস, অপুষ্ট শিশুদের আধিক্য কমানো, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় লিঙ্গ সমতা অর্জন, পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশু মৃত্যুহার হ্রাস, এইচআইভি, যক্ষ্মাসহ বিভিন্ন রোগব্যাধি দমনে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছি। এছাড়াও প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি, শিশু ও মাতৃ মৃত্যুহার হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধি ও সংক্রামক ব্যাধি হ্রাসের ক্ষেত্রে লক্ষণীয় অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।
দেশের ৪৫৪৭ টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৩২১ টি পৌরসভা এবং সিটি কর্পোরেশনের ৪০৭ টি ওয়ার্ডে ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্থাপিত ই-সেবাকেন্দ্র ও ১০২ টিরও অধিক সরকারি বেসরকারি সেবাকেন্দ্র থেকে নাগরিকদের সেবা দেয়া হচ্ছে। মানবসম্পদ উন্নয়নে ই-শিক্ষা, শিক্ষাক্ষেত্রে আইসিটি মাস্টার প্ল্যান (২০১২-২১), মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও মাদ্রাসা শিক্ষায় আবশ্যিক আইটি বিষয়ে পাঠদান, ৪,৫০০ প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২৩,৩৩১ টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ৫,৫০০ টি মাদ্রাসায় মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ৩,১৭২টি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় কম্পিউটার ল্যাব, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদ্রাসা এবং কারিগরী শিক্ষাবোর্ডে ৩০০ টিরও বেশি বই ও ১০০ টি সহায়ক বই-ই-বুকে রূপান্তর করে ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়েছে। শিক্ষক বাতায়নে দক্ষ শিক্ষকদের দ্বারা ইংরেজী, গণিত, বিজ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে ৬২ হাজার মডেল কন্টেন্ট তৈরী করা হয়েছে। ৮ বছরে আইসিটি খাতের বরাদ্দ ৩.৫২ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে; ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে যা বাজেটের ২.৪৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সরকারের অঙ্গিকারের প্রতিফলন। কৃষি খাতে ভর্তুকি, স্বল্পসুদে ঋণ, উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ, সার সহজলভ্যকরণ, কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড বিতরণ, কৃষি বিপণন ও প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র স্থাপন, শস্য বহুমুখীকরণ কার্যক্রম জোদরার করা হয়েছে। এ বছর কৃষিতে উৎপাদন বেড়েছে ২.৬ শতাংশ। মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে সরকার সরাসরি কৃষকের নিকট নগদ সহায়তা ও অন্যান্য প্রণোদনা পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বাংলাদেশের ভাসমান সবজি চাষ পদ্ধতিকে Globally Important Agricultural Heritage System হিসেবে ঘোষণা করেছে। আমাদের খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা ২০ লক্ষ ৪০ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। খাদ্য ব্যবস্থা উন্নয়নের পাশাপাশি খাদ্য ঘাটতি এলাকাকে উদ্বৃত্ত এলাকায় পরিণত করতে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা (মে ২০১৬) ১৪ হাজার ৫৩৯ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ৩৭১ কিলোওয়াট। দেশের জনসংখ্যার ৭৬ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। নবায়ন যোগ্য জ্বালানি হতে ৪৩০ মেগাওয়াট এবং ভারত থেকে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানী করা হচ্ছে। বিদ্যুতের উৎপাদন বর্তমান চাহিদার তুলনায় বেশি। কিন্তু বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন অনুপযুক্ততার কারণে ক্ষমতার ৭০ শতাংশ ভোক্তা পর্যায়ে সরবরাহ করা যায়। এ লক্ষ্যে সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন ৯৭৮৯ সার্কিট কিলোমিটার ও ৩ লক্ষ ২৭ হাজার কিলোমিটারে উন্নীত করা হয়েছে এবং আরো কার্যক্রম চলমান রয়েছে। (মার্চ ২০১৬)
সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার প্রাপ্ত খাত সড়ক ও যোগাযোগের কাজও দূরন্ত গতিতে এগিয়ে চলছে। দেশের টাকায় পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ চলছে। সারা দেশের সাথে তাল মিলিয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার সমীক্ষা ও নকশা প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
সুনামগঞ্জ-সিলেট মহাসড়কের সকল সেতু ইতোমধ্যেই প্রশস্ত করে নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। সুনমগঞ্জে সুরমা নদীতে আবদুজ জহুর সেতু নির্মাণের ফলে জেলার উত্তরাঞ্চলের ৪ উপজেলার সাথে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত হয়েছে। ছাতকে সুরমা নদীর অর্ধসমাপ্ত ব্রিজের কাজ সমাপ্তকরণ ও জগন্নাথপুরের রাণীগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর উপর ব্রিজ নির্মিত হচ্ছে। ফলে সুনামগঞ্জ-ঢাকা সড়কপথের দূরত্ব প্রায় ৬০ কি.মি. কমে যাবে। কৃষির উন্নয়নে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় দ.এশিয়ার বৃহত্তম মিছাখালী রাবার ড্যাম নির্মিত হয়েছে। নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বিদ্যুৎ সাবস্টেশন, শিক্ষার উন্নয়নের জন্য স্কুল কলেজ জাতীয়করণ, স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রেও উন্নয়নের অগ্রযাত্রা চলমান রয়েছে।
দেশে এখন যথাক্রমে মোবাইল ও ইন্টারনেটের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি ২০ লক্ষ ও ৬ কোটি ২০ লক্ষ। ৫ হাজার ২৭৫ টি ডিজিটাল সেন্টার, জেলা, উপজেলা, বিভাগ, দপ্তর, অধিদপ্তরসহ ২৫ হাজারেরও বেশি ওয়েবসাইট (এপ্রিল ২০১৬) জাতীয় তথ্য বাতায়নে যোগ হয়েছে। সাইবার অপরাধ নিরাপত্তায় ও অপরাধমূলক কাজে তথ্য প্রযু্িক্ত ব্যবহার রোধে শেষ হয়েছে সিম/রিম রেজিস্ট্রেশনের কাজ। শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে বিনামূল্যে বই বিতরণ, উপবৃত্তি, সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ করা হয়েছে ৩৪ হাজার ৮৯৫ জন শিক্ষক। প্রাথমিক শিক্ষায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ এবং ৬ষ্ঠ থেকে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত ৩৮ লক্ষ ১৬ হাজার শিক্ষার্থীকে বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। উপকারভোগীর ৭৫ শতাংশ ছাত্রী। স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়নের জন্য ১৩ হাজার ১২৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক, সকল জেলায় ও ৪৮২ টি উপজেলা হাসপাতালে মোবাইলে ফোনে স্বাস্থ্য সেবা কর্মসূচী এবং ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন’ নামে ২৪ ঘন্টা বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান কর্মসূচি চালু রয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র্র্র্র ঋণ, হোস্টেল কাম ট্রেনিং সেন্টার, তথ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা শিশুদিবাযতœ কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। ৬৪ জেলায় ১ লক্ষ ২০ হাজার কর্মজীবি ল্যাকটেটিং মাকে ভাতা প্রদান, ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের মাধ্যমে নির্যাতিত নারীদের সেবা প্রদান, বায়ু দূষণ হ্রাসে ৪ হাজার ইটভাটায় আধুনিক প্রযুক্তি, ১ হাজারের উপর শিল্প কারখানায় ইটিপি স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগে বাস্তবায়িত হচ্ছে “একটি বাড়ি একটি খামার” সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, কমিউনিটি ক্লিনিক ও শিশু বিকাশ, নারীর ক্ষমতায়ন, আশ্রয়ণ, শিক্ষা সহায়তা, ডিজিটাল বাংলাদেশ পরিবেশ সুরক্ষা ও বিনিয়োগ বিকাশ। এগুলোর সফল বাস্তবায়নের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে রচিত হবে নতুন দিগন্ত।
এসব অর্জন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদশী ও বলিষ্ট নেতৃত্বের সুফল। সম্প্রতি ‘ফরচুন ম্যাগাজিন’ বিশ্বকে বদলে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন এমন ৫০ জন বিশ্বনেতার নাম প্রকাশ করেছে। এখানেও আমাদের প্রধানমন্ত্রী সগৌরবে স্থান লাভ করেছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের ৭০ তম অধিবেশনে বাংলাদেশসহ ১৯৩ টি সদস্য দেশ ২০১৫ পরবর্তী উন্নয়ন এজেন্ডা হিসেবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুমোদন করে। এতে ১৭ টি অভিষ্ট লক্ষ্য ও ১৬৯ টি লক্ষ্যমাত্রা যুক্ত করা হয়েছে। এসব অভিষ্ট লক্ষ্য ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে বাংলাদেশ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব কারো সাথে বিদ্বেষ নয়’ পররাষ্ট্র নীতির আলোকে বিশ্বের বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংগঠনে বাংলাদেশের ভূমিকা বরাবরই প্রশংসনীয়।
স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশকে কেউ কেউ তলাবিহীন ঝুড়ি নামে আখ্যায়িত করেছিলেন। অনেকে এও বলেছিলেন বাংলাদেশ স্বাধীন অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারবে না। সেই বাংলাদেশ আজ বাংলার মানুষের অপরিসীম প্রাণশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং প্রতিকূল অবস্থা থেকে উত্তরণের সক্ষমতার কারণে বিশ্ববাসীর কাছে উন্নয়নের বিস্ময়ে পরিণত হয়েছে। স্থিতিশীল রাজনৈতিক ও অথনৈতিক কর্ম পরিবেশ এবং চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমের ধারাবহিকতা রক্ষা করতে পারলেই আমরা আরো অনেকদুর এগিয়ে যাব। একই সঙ্গে সমতা ভিত্তিক সমাজ-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আয়ের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার জন্য সামাজিক নিরাপত্তার কর্মসূচির দিকে নজর দেয়া হয়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরেই বাংলাদেশ কাঙ্খিত স্বাধীনতা ও মুক্তির স্বাদ পেয়েছে। তাঁর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ট নেতৃত্বে দেশ আজ সুদৃঢ় অবস্থানে পৌঁছেছে। জনগণের সমর্থন ও অংশগ্রহণ, যুবশক্তির কর্মোদ্যোগে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে উন্নয়নের সু-উচ্চ শিখরে।
তথ্যসূত্র:
১. অসমাপ্ত আত্মজীবনী- শেখ মুজিবুর রহমান
২. জাতির জনক- শেখ হাসিনা সম্পাদিত
৩. অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা (২০১৬-১৭)
৪. ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে অগ্রযাত্রা: হালচিত্র ২০১৬ (অর্থ বিভাগ,
অর্থ মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার)।
লেখক: প্রতিমন্ত্রী, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকার।


