বজ্রপাতে মৃত্যু/ জলবায়ু তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হোক

বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছেই। এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত বজ্রপাতের কারণে প্রতিবছর বহু প্রান্তিক মানুষের মৃত্যু ঘটে এই দেশে। প্রাণহানির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হাওরাঞ্চলের গরিব জেলে, কৃষক ও পথচারী। প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর মধ্যে এক ভূমিকম্প ছাড়া এখন সবচাইতে বেশি প্রাণঘাতী এই বজ্রপাত। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মোকাবিলায় এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদ্ধতির উদ্ভাবন সম্ভব হয়নি। বন্যা, ঘুর্ণিঝড় প্রভৃতির আগাম সংকেত পাওয়ায় এখন বহু লোকের প্রাণ ও সম্পদ বাঁচানো সম্ভব হয়। কিন্তু বজ্রপাত শুরু হয় যখন তখন। অবশ্য মেঘলা আকাশ দেখলে বাইরে না বেরোলে এই বিপদ থেকে বাঁচা যায়। কিন্তু সমস্যা হলো, বজ্রপাতের ঝুঁকিবহুল সময় টানা তিন মাসেরও বেশি হওয়ার কারণে বাইরে না বেরোনোর এই সতর্কতা ব্যবস্থাটি বাস্তবে প্রয়োগ ঘটানো খুব কঠিন। কারণ গরিব জেলে-কৃষকদের পেটের তাগিদে বাইরে বেরোতেই হবে। দেখা যায়, বজ্রপাতে মৃত্যুর প্রায় সবগুলোতেই মারা যান এইসব গরিব মানুষ জন। তাল গাছ লাগানো, বজ্রনিরোধক টাওয়ার ও দ- স্থাপন, হাওরে ছাউনি নির্মাণ; এ ধরনের বেশ কিছু কর্মসূচি সরকার গ্রহণ করেছিলেন বজ্রপাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে। তালগাছ রোপন প্রকল্পে বহু টাকা খরচ করার পর সরকারের মনে হয়েছে এই প্রকল্প দিয়ে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়। একদিকে রোপিত তালগাছ যতেœর অভাবে মারা পড়ে, অন্যদিকে তালগাছ বড় হয়ে বজ্রপাত রোধী হতে সময় লাগে অন্তত ত্রিশ বছর। হাওরে কিছু বজ্রনিরোধক দ- ও ছাউনি স্থাপন করা হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা নেহায়েৎই অপ্রতুল। ফলে শ্রমজীবী-জেলে-কৃষকদের হাওরে পায় বিনা প্রতিরোধেই কাজ করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে আড়াই শ’র বেশি মানুষ বজ্রপাতে মারা যায়। বৈষ্ণিক জলবায়ুর পরিবর্তন বিশেষ করে উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ার কারণে বজ্রপাতের পরিমাণ বেড়েছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের যে ঝুঁকি তা মোকাবিলার সাথে বজ্রপাতের ঝুঁকি হ্রাসের সরাসরি সম্পর্ক বিদ্যমান। আমরা বৈষ্ণিক জলবায়ু তহবিল থেকে যে অর্থ পাই তা কীভাবে খরচ হয় তা জানি না। এই তহবিল নিয়ে রয়েছে বিশাল প্রশ্ন। যেসব প্রতিষ্ঠান এই তহবিলের হিস্যা পায় তাদের কাজকর্ম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কোনো ধারণা নেই। জলবায়ু তহবিল দিয়ে জলবায়ুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুু পরিস্থিতির উন্নতির জন্য ব্যয় নিয়েও প্রচুর বিতর্কের অবকাশ রয়েছে।
দুঃখজনক হলো, বজ্রপাতে যে প্রান্তিক পরিবারের মানুষগুলো মারা যায়, ওই জলবায়ু তহবিল থেকে তাদের কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়া হয় না। অথচ ওই মানুষগুলোই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতের প্রধান শিকার এবং ন্যায্যত ওই তহবিলের প্রধান হকদারও তাঁরা। যারা মারা যান তারা নিজেদের পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বজ্রপাতে প্রাণ হারানোর মধ্য দিয়ে ওই পরিবারটিও অকূল দুঃখের সাগরে ভেসে যায়। পরিবেশ ও জলবায়ু সহ মানবাধিকার নিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করেন এবং বড় অংকের তহবিলের অধিকারী হন তাদের কাউকে এই ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি উঠাতে দেখা যায় না। এটি প্রচলিত আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার নিষ্ঠুরতার নির্দেশক। একজন মানুষের জীবনের কোনো দাম নেই যে পরিবেশে আমরা এখন সেই ধরনের দুঃসহ পরিবেশে বসবাস করছি। এর পরিবর্তন হওয়া কাম্য।
শনিবার বজ্রপাতে জেলার বিশ্বম্ভরপুরে ২ বালু শ্রমিক ও দিরাইয়ে এক জেলের মুত্যু হয়েছে। এই মৌসুমে একাধিক বজ্রপাতের ঘটনায় আরও বেশ কয়েক জনের প্রাণ হানি ঘটেছে। প্রতি বছরই এরকম অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু ঘটনা আমরা অসহায়ভাবে প্রত্যক্ষ করি। কোনো প্রণোদনা দিয়ে মৃত্যুর প্রতিদান দেয়া সম্ভব নয়। তবে মৃতের জীবিত পরিবারবর্গের জন্য কিছু করাটা হলো প্রকৃত মানবধর্ম। তাই প্রতিটি মৃত্যুর জন্য বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিল থেকে সংশ্লিষ্টদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য আমরা দাবি জানাই।