রেল লাইনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ জেলা সদরে রেললাইন সম্প্রসারণের দাবিটি স্বপ্নের জগৎ ছাড়িয়ে অবশেষে বাস্তবতার দিকে যাত্রা শুরু করেছে। রেল মন্ত্রণালয় জেলা সদর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য সরকারের নিকট প্রতিবেদন দাখিল করেছে। প্রাথমিকভাবে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ৭ কোটি ৫৬ লাখ ৮৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৩০ জুন ২০১৮ তারিখের মধ্যে এই সমীক্ষা শেষ করার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাব সরকার অনুমোদন করলে এই কাজ নতুন বছরের প্রথম দিন থেকে (১ জানুয়ারি ২০১৭ থেকে) শুরু করা হবে।
সুনামগঞ্জ জেলার সামাজিক, প্রাকৃতিক, ভৌগোলিক বিস্তৃত ইতিহাস ও বিবরণ জানিয়ে এখানে রেললাইন সম্প্রসারণ অর্থনীতি ও জনসেবার আলোকে প্রয়োজনীয় উল্লেখ করে রেল মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনায় সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রস্তাবনায় ছাতক থেকে আন্ধারীগাঁও, আন্ধারীগাঁও থেকে শিবপুর, শিবপুর থেকে শ্রীপুর, শ্রীপুর থেকে রেঞ্জের বাজার এবং রেঞ্জের বাজার থেকে সুনামগঞ্জ সদর পর্যন্ত ৫টি সেকশন নির্ধারণ করা হয়েছে।     
জেলা সদরের পাঠানবাড়ী-হাসননগর এলাকায় রেলস্টেশন স্থাপনের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। উল্লেখিত পথে রেললাইনের দৈর্ঘ্য ২৭ কিলোমিটার বলে প্রাথমিকভাবে স্থির করা হয়েছে।
সমীক্ষায় রেললাইনের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া ও ক্ষতিপূরণ পদ্ধতি নির্ণয়সহ এর জন্য কত টাকা খরচ হবে তার সুপারিশ ওঠে আসবে। অর্থাৎ ছাতক থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত ২৭ কিলোমিটার রেললাইন সম্প্রসারণে সর্বমোট কত টাকা খরচ হবে তার একটি বিস্তারিত প্রাক্কলন তৈরি করা হবে সমীক্ষা প্রতিবেদনে।
প্রসঙ্গত. শিল্পনগরী ছাতক থেকে সুনামগঞ্জ জেলা শহরের সঙ্গে রেল  যোগাযোগ স্থাপনের জন্য দুই দিক থেকে চেষ্টা চলছে। জেলার ছাতক থেকে রেলওয়ের লাইন বর্ধিত করে শহরের মাইজবাড়ী-বদিপুর বা হাছননগর-পাঠানবাড়ী পর্যন্ত এবং নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থেকে সুনামগঞ্জের বৈঠাখালি পর্যন্ত। কিন্তু  কোনটিই হচ্ছে না।
ছাতক থেকে সুনামগঞ্জ জেলা শহরের সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপনের দাবি জানিয়ে সম্প্রতি পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)’এর চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক ইতিপূর্বে রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ডিজিকে আধাসরকারি পত্র দিয়েছিলেন।
ড. মোহাম্মদ সাদিক তাঁর দেয়া আধাসরকারি পত্রে উল্লেখ করেছিলেন, ‘সুনামগঞ্জের একটি উপজেলা শহরে রেল যোগাযোগ চালু রয়েছে। অথচ জেলা শহরকে রেল যোগাযোগের আওতায় আনার দাবি আমলে নেওয়াই হচ্ছে না’। তিনি ছাতক থেকে আমবাড়ী হয়ে আসা সড়কের পাশ দিয়েই রেললাইন বর্ধিত করা যায় উল্লেখ করে গণমানুষের এই দাবিকে গুরুত্ব  দেবার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
এর আগে দিরাই-শাল্লার সংসদ সদস্য, আইন-বিচার সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত  রেলমন্ত্রী থাকা অবস্থায়  ২০১১ সালের ২২ ডিসেম্বর সিলেট সার্কিট হাউসে বৃহত্তর সিলেটের সংসদ সদস্য, রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বলেছিলেন, ‘সুনামগঞ্জে রেললাইন সম্প্রসারিত হবে। ছাতক-সুনামগঞ্জ এবং  মোহনগঞ্জ-ধরমপাশা রেললাইন স্থাপনের পরিকল্পনা বর্তমান সরকারের আমলেই শেষ হবে। এটা হলে হাওরের মানুষের যোগাযোগ বিড়ম্বনা অনেকটাই কমে যাবে।’
ঐ সভায় রেলপথের দাবি জানিয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান এমপি এবং মুহিবুর রহমান মানিক এমপি।
জানা যায়, সুনামগঞ্জ জেলা শহরকে রেল যোগাযোগের আওতায় আনার দাবি উঠেছিল ১৯৬১ সালে। সুনামগঞ্জের সবজী, পাথর ও মাছ কম খরচে রাজধানী ঢাকায় পৌঁছানো এবং একমাত্র সড়কের বিকল্প হিসাবে রেলওয়ে লাইন চালু করণের দাবি ওঠেছিল। জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে সুনামগঞ্জ শহরের হাসননগরের বাসিন্দা তৎকালীন সিলেট ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলর সদস্য রাবেয়া লেইছ ১৯৬১ সালে প্রথম ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলর সভায় এই দাবি তুলেছিলেন।
২০১১ সালে সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির তৎকালীন সভাপতি অ্যাড. রবিউল লেইস রোকেস জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে জেলা আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে একটি স্মারকলিপিও প্রদান করেন।
এরপরই সুনামগঞ্জে রেললাইন স্থাপন নিয়ে জাতীয় সংসদে কথা বলেন সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ্। পরে তিনি এই বিষয়ে রেলমন্ত্রীকে ডিও লেটারও দেন।
গত জুলাই মাসে রাজধানীতে জেলা প্রশাসকদের ৪ দিন ব্যাপি সম্মেলনে ছাতক থেকে সুনামগঞ্জ জেলা শহর পর্যন্ত রেল লাইন সম্প্রসারণের দাবির বিষয়ে রেলমন্ত্রী ও রেল সচিবকে আধাসরকারি পত্র দেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম।
পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)’র চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেন,‘আমি রেলওয়ে সচিব ও ডিজিকে একাধিকবার দেখা করে এই বিষয়ে অনুরোধ করেছি, আধাসরকারি পত্র দিয়েছি। আমার অনুরোধপত্রে আমি বলেছি,‘ছাতক থেকে রেললাইন বর্ধিত করে সুনামগঞ্জের মাইজবাড়ী-বদিপুর এলাকায় স্টেশন করা কঠিন কোন কাজ নয়। রেলমন্ত্রণালয় এই উন্নয়ন কাজটি তালিকাভুক্ত করেছে এবং সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। আমরা আশা করছি দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে সুনামগঞ্জবাসীর স্বপ্নের রেল লাইনের কাজ শুরু হবে’।