শহীদনূর আহমেদ
সুনামগঞ্জের গ্রামাঞ্চলে একসময় যাত্রাপালা, বাউলগানসহ নানা চিত্তবিনোদনের আয়োজন হত। মরমি সাধক ও কবিদের প্রচেষ্টায় কোথাও কোথাও গড়ে উঠেছিল স্থায়ী-অস্থায়ী চিত্ত বিনোদন কেন্দ্র। জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নে বীরগাঁও গ্রামে স্থানীয় কিছু সংস্কৃতিসেবী ও লোক কবিদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বীরগাঁও পল্লী চিত্ত বিনোদন কেন্দ্র। কিন্তু দেখভাল ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে গ্রামীণ এই চিত্ত বিনোদন কেন্দ্রটির এখন বেহাল অবস্থা।
জানা যায়, পূর্ববীরগাঁও ইউনিয়নের মরমী কবি বাউল মছরু পাগলা, বাউল তছকির আলী, সাবেক চেয়ারম্যান আক্কাছ আলী, সংস্কৃতিসেবী মশফিক উদ্দিন, মোজাহেদ আলীসহ কিছু ব্যক্তির উদ্যোগে ও উপজেলা পরিষদের বরাদ্দের টাকা দিয়ে প্রায় ২৫ বছর আগে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল বীরগাঁও চিত্ত বিনোদন কেন্দ্রটি। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ ও সদর উপজেলা তখন একটি উপজেলা ছিল। তৎকালীন সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেওয়ান জয়নুল জাকেরীনের আর্থিক অনুদানে প্রতিষ্ঠিত এই বিনোদন কেন্দ্রটিই ছিল এলাকার মানুষের চিত্ত বিনোদনের প্রধান কেন্দ্র। এই প্রতিষ্ঠানে বাউলা, ভাটিয়ালি, যাত্রাপালা, নাটকের চর্চা হতো। এই বিনোদন কেন্দ্রে এসে বাউল আসরে গান গেয়েছেন বাউল সম্রাট শাহ্ আব্দুল করিমও।
এই বিনোদন কেন্দ্রের অন্যতম দেখভালকারী ছিলেন মরমি কবি বাউল মছরু পাগলা। তিনিই এখানে আসর জমিয়ে রাখতেন। গানের ঘর নামে ইউনিয়নের বাসিন্দারা এক নামে এখনও চিনেন এই কেন্দ্রটিকে।
মরমি গানের আসরের এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটির দেখভালকারী বাউল মছরু পাগলা ১৯৯৮ সালের ১০ নভেম্বর মারা যাওয়ার কিছুদিন পর থেকেই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে এই বিনোদন কেন্দ্রটি।
ভবনটির টিনের চাল উড়ে গেছে। নেই কোন দরজা-জানালা। দেয়ালে ফাটল ধরেছে। দূর থেকে দেখলে ভূতুরে বাড়ি মনে হয়। ভবনের ভিতরে রাখা হয়েছে জেলেদের মাছ ধরার জাল। বিকেলে এই পরিত্যক্ত ভবনে বসে মাদকসেবীদের আড্ডা। বসে জোয়া খেলার আসর।
এলাকার সংস্কৃতিকর্মীরা এই বিনোদন কেন্দ্রটির সংস্কার দাবি করেছেন। পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নের মাষ্টার অনীল নাট্যগোষ্ঠীর নাট্য পরিচালক মো. খালেকুজ্জামান বলেন, ‘গানের ঘরে এক সময় জমজমাট আসর হতো। এখানে বাউলা গান ও নাটকের মহড়া হত। বাউল মছরু পাগলা ও তসকীর আলীসহ অনেক লোককবিদের গানের আসর জমতো এই কেন্দ্রে। বাউল সম্রাট শাহ্ আব্দুল করিম অনেকবার এসেছেন এই সংস্কৃতি কেন্দ্রের আসরে। অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন যাবৎ পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। এটি সংস্কার জরুরি।’
পূর্ববীরগাঁও ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. নূর কালাম বলেন, ‘বীরগাঁও পল্লী চিত্তবিনোদন কেন্দ্রের অনেক ঐতিহ্য ছিল। দেখভাল ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কেন্দ্রটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এর সংস্কার কাজে অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন । আমরা বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্য অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান মহোদয়কে অবহিত করবো’।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল কালাম বলেন,‘ এলাকাবাসী রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিলে কেন্দ্রটির সংস্কার করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে’।


