মেঘালয় রাজ্যে বৃষ্টি হবে এমন ধারণা বোধ করি ছিলো না পাউবোর ঠিকাদার, পিআইসি ও প্রকৌশলীদের। আর ধারণাতীত এই কা-টিই ঘটেছে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার। সামান্য বৃষ্টি হয়েছে আমাদের অঞ্চলেও। ফল হয়েছে পাহাড়ি ঢল নেমে অগভীর নদী পেরিয়ে পানির তোড় নেমেছে হাওর অভিমুখে। বাঁধ আটকাতে পারতো এই পানি। কিন্তু আদৌ যে বাঁধের কাজই হয় নি আবার কোন কোন হাওরে পাউবোর বাঁধ নির্মাণের কোন প্রকল্পই নেই। আপাতত যে খবর পাওয়া গেছে তাতে ধর্মপাশার চন্দ্রসোনারথাল হাওর, তাহিপুরের সমসার, সন্যাসী, এরালিয়া, কোনা, গনিয়াকুড়ি হাওরের প্রায় আড়াই হাজার একর পানির সদ্য গজানো ধানের চারা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। দ্রুত পানি না কমলে চারাগাছ পঁচে নষ্ট হয়ে যাবে। আরও বৃষ্টি কিংবা পাহাড়ি ঢল নামলে ক্ষতির পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যাবে। অথচ সরকার নির্ধারিত সময়সীমা অনুসারে ২৮ ফেব্রুয়ারির মাধ্যে হাওর রক্ষার অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার কথা। এই সময় শেষ হতে বাকি রয়েছে আর মাত্র ২ দিন। কিন্তু প্রকাশিত খবর অনুযায়ী অনেক হাওরে বাঁধ সংস্কার কিংবা নির্মাণে কোন কাজই শুরু হয় নি। শেষের দিকে তড়িঘড়ি কয়ে সামান্য কিছু মাটি ফেলে বরাদ্দের টাকা পকেটস্থ করার অপেক্ষায় থাকেন ঠিকাদার, পিআইসি ও পাউবো প্রকৌশলীরা। প্রতি বছরই এমন ঘটে। সম্ভবত সরকারি উন্নয়ন কাজের আর কোথাও এমন হরিলুট হওয়ার নজির নেই। কিন্তু অবাক বিষয় হলো এজন্য কখনও পাউবোর কাউকে কোন ধরনের জবাবদিহিতার সন্মুখিন হতে হয় নি। গত বছর পাউবোর উদাসীনতা ও দুর্নীতির কারণে জেলার বহু হাওরের সোনাফলা জমি জলমগ্ন হয়েছে। গণমাধ্যম ও হাওর পাড়ের কৃষকরা মাতম করেছে। লোকদেখানো তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন জেলা প্রশাসন। ওই পর্যন্তই। বছর পেরিয়ে গিয়ে আরেকটি ফসল মৌসুম এসে গেছে কিন্তু তদন্ত কমিটির কোন প্রতিবেদন মিলে নি। সম্ভবত ওই তদন্ত কমিটি কোন কাজই করে নি। বোরো প্রধান সুনামগঞ্জের কৃষকদের সারা বছরের স্বপ্নের এমন ভরাডুবির শেষ কবে হবে?
প্রতিটি উপজেলায় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে একটি করে বাঁধের কাজ তদারকির কমিটি আছে। জেলায়ও রয়েছে অনুরূপ কমিটি। ওই কমিটি নিয়মিত সভাও করে। রয়েছেন সংসদ সদস্যগণ, উপজেলা চেয়ারম্যারগণ, ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ। অধুনা যুক্ত হয়েছেন জেলা পরিষদ সদস্যগণ। এত এত কমিটি ও ব্যক্তি থাকতে কেন বাঁধ নির্মাণে ধারাবাহিক দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে, এর পিছনের মাজেজা কী সেটি কৃষকরা জানতে চান। সরকার যখন সর্বত্র সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তখন কৃষক সমাজের জন্য তথা জেলার অর্থনীতির জন্য বিপর্যয়কর এমন বিষয় নিয়ে নিরব থাকার অবকাশ নেই। এবার কেন ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হতে চললেও বাঁধের কাজ কোথাও কোথাও শুরু হয় নি তার কারণ অনুসন্ধানে উচ্চ পর্যায়ের মনোযোগ আকর্ষণের দাবি রাখে। আমরা চাইব প্রতিটি পিআইসি ও ঠিকাদাররা এবং অবশ্যই পাউবোর দায়িত্বশীল প্রকৌশলীগণকে উপযুক্ত জবাব দিতে হবে এই ব্যর্থতার জন্য। নতুবা সুশাসনের শ্লোগানের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট বাড়তেই থাকবে।
তাহিরপুরের কয়েকটি হাওরে নাকি পাউবো বাঁধ নির্মাণের জন্য কোন প্রকল্প গ্রহণ করেন না। অথচ হাওরগুলো সর্বদাই ঝুঁকির মধ্যে থাকে। এবার আগাম পানি কবলিত হওয়ার মধ্য দিয়ে হাওরগুলোর দুরবস্থা সকলের সামনে চলে আসল। আমরা আশা করি পাউবো এই হাওরগুলোকে প্রকল্পভুক্ত করে বরাদ্দের চাহিদা আগামী বছর দাখিল করবেন। আপৎকালীন সময়ে এই বছর উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এই হাওরগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি আমাদের।

